রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা অব্যাহত রাখার মধ্যেই রাশিয়া, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রথম ত্রিপক্ষীয় শান্তি আলোচনা কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি ছাড়াই শেষ হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে অনুষ্ঠিত দুই দিনের এই আলোচনার সমাপ্তির পরও রাশিয়ার বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইউক্রেনে হতাহত হয়েছেন বহু মানুষ।
শনিবার ভোর পর্যন্ত চালানো রুশ হামলায় অন্তত একজন নিহত এবং ৩৫ জন আহত হয়েছেন বলে ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা এ হামলাকে “নৃশংস” আখ্যা দিয়ে বলেন, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের নির্দেশে চালানো এই আক্রমণ “শুধু আমাদের জনগণের ওপর নয়, আলোচনার টেবিলের ওপরও আঘাত হেনেছে।”
২০২২ সালে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর এটিই ছিল রাশিয়া, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রথম সরাসরি ত্রিপক্ষীয় বৈঠক। আলোচনার মূল লক্ষ্য ছিল যুদ্ধ অবসানের সম্ভাব্য কাঠামো নির্ধারণ।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানান, আলোচনায় যুদ্ধ শেষ করার প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের তদারকি ও নিরাপত্তা নিশ্চয়তার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সমঝোতা হয়েছে। তিনি বলেন, সব পক্ষই নিজ নিজ রাজধানীতে আলোচনা তুলে ধরবে এবং পরবর্তী পদক্ষেপের বিষয়ে নেতাদের সঙ্গে সমন্বয় করবে। সামরিক প্রতিনিধিরা সম্ভাব্য পরবর্তী বৈঠকের জন্য বিভিন্ন ইস্যুর একটি তালিকাও চিহ্নিত করেছেন। পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে আগামী সপ্তাহেই নতুন করে আলোচনা হতে পারে বলে জানান তিনি।
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা রিয়া জানায়, মস্কোও ত্রিপক্ষীয় সংলাপ অব্যাহত রাখতে আগ্রহী। পরে যুক্তরাষ্ট্রের এক অজ্ঞাতনামা কর্মকর্তা নিশ্চিত করেন, পরবর্তী দফার আলোচনা আগামী ১ ফেব্রুয়ারি শুরু হবে।
এদিকে রুশ হামলার পর কিয়েভের মেয়র ভিটালি ক্লিচকো জানান, রাজধানীতে একজন নিহত এবং চারজন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে তিনজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। হামলায় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কিয়েভের প্রায় ছয় হাজার ভবনে তাপ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। খারকিভের মেয়র ইহোর তেরেখভ জানান, সেখানে ৩১ জন আহত হয়েছেন। একটি প্রসূতি হাসপাতাল এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য ব্যবহৃত একটি হোস্টেল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইউক্রেনে বর্তমানে তাপমাত্রা অনেক এলাকায় মাইনাস ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে এসেছে। প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি বলেন, রুশ হামলার প্রধান লক্ষ্য ছিল দেশের জ্বালানি অবকাঠামো।
আলোচনার দ্বিতীয় দিনে সিবিহা বলেন, রাতভর চালানো এই “বর্বর” হামলা প্রমাণ করে যে পুতিনের স্থান শান্তি আলোচনার টেবিলে নয়, বরং বিশেষ ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায়।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত সপ্তাহে দাবি করেছিলেন, পুতিন তার প্রস্তাবিত ‘বোর্ড অব পিস’-এ যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন। তবে রাশিয়ার পক্ষ থেকে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়নি।
বর্তমানে ইউক্রেনের প্রায় ২০ শতাংশ ভূখণ্ড, বিশেষ করে পূর্বাঞ্চলীয় ডনবাসের অংশবিশেষ, রাশিয়ার দখলে রয়েছে। মস্কো ইউক্রেনকে আরও বড় অংশ ছেড়ে দেওয়ার দাবি জানালেও কিয়েভ তা স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। দাভোসে দেওয়া বক্তব্যে জেলেনস্কি বলেন, “সমস্যার মূল বিষয় হলো ভূমি। এই প্রশ্নটির এখনো সমাধান হয়নি।”
তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতে কোনো চুক্তি হলে ইউক্রেনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিয়ে তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছেছেন। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি এবং বলেন, চুক্তিটি স্বাক্ষরের আগে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস ও ইউক্রেনের পার্লামেন্টে অনুমোদন লাগবে।
আবুধাবিতে আলোচনা শুরুর একদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার মস্কোয় পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। চার ঘণ্টার বৈঠক শেষে ক্রেমলিনের উপদেষ্টা ইউরি উশাকভ বলেন, পুতিন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পথে ইউক্রেন সংকট সমাধানে রাশিয়ার “আন্তরিক প্রতিশ্রুতি” পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তবে তিনি ইঙ্গিত দেন, ভূখণ্ডগত প্রশ্নের সমাধান ছাড়া দীর্ঘস্থায়ী সমঝোতা সম্ভব নয়।
উল্লেখ্য, গত আগস্টে আলাস্কার অ্যাঙ্কোরেজে ট্রাম্প ও পুতিনের বৈঠকে ডনবাস অঞ্চল রাশিয়ার অধীনে রাখা এবং ২০১৪ সালে অবৈধভাবে দখল করা ক্রিমিয়ার নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার বিষয়ে একটি সমঝোতার কথা বলা হয়েছিল। তবে জেলেনস্কি স্পষ্টভাবে ডনবাস ছেড়ে দেওয়ার সম্ভাবনা নাকচ করেছেন।
ইউক্রেনীয় প্রতিনিধি দলের প্রধান রুস্তেম উমেরভ আলোচনার প্রথম দিনের পর বলেন, এই বৈঠকে রাশিয়ার যুদ্ধ অবসান এবং মর্যাদাপূর্ণ ও স্থায়ী শান্তির দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য আলোচনার কাঠামো নিয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
