সংসদে সশস্ত্র হামলার পরিকল্পনাকারী জঙ্গি উসামার জামায়াতে যোগদান নিয়ে তীব্র সমালোচনা

সংসদে সশস্ত্র হামলার পরিকল্পনাকারী জঙ্গি উসামার জামায়াতে যোগদান নিয়ে তীব্র সমালোচনা
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের সদস্য এবং জাতীয় সংসদ ভবনে সশস্ত্র হামলার পরিকল্পনার অভিযোগে আলোচিত উগ্রপন্থি বক্তা আলী হাসান উসামা জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দিয়েছেন।

গতকাল ১৭ই জানুয়ারি, শনিবার জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুক হালিম ও এহসানুল মাহবুব জোবায়েরের উপস্থিতিতে তিনি দলের সহযোগী সদস্য ফরম পূরণ করেন।

বিষয়টি নিশ্চিত করে এহসানুল মাহবুব জোবায়ের বলেন, আলী হোসেন উসামা জামায়াতের সহযোগী সদস্য ফরম পূরণ করেছেন। বিস্তারিত পরে জানানো হবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসামার জামায়াতে যোগনাদের বিষয়টি নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন সচেতন অনেক নেটিজেনই। এমন ভয়ঙ্কর এক জঙ্গিকে এভাবে জামায়াতের মত উগ্রবাদী সংগঠন বরণ করে নেবে- এটাকে আবার ‘স্বাভাবিক’ বলছেন অনেকেই।

গ্রেপ্তার হওয়া আলী হাসান উসামা

আলী হাসান উসামা দীর্ঘদিন ধরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারিতে ছিলেন। ওয়াজ-মাহফিলে ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে উগ্রবাদ ছড়ানো, জিহাদের পক্ষে বক্তব্য দেওয়া এবং গাজওয়াতুল হিন্দের মাধ্যমে ভারতে সশস্ত্র হামলা চালিয়ে দখলের উস্কানি দেওয়া, উগ্রবাদী বই লেখাসহ তরুণদের জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ করার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।

২০২১ সালের ৫ই মে রাতে সংসদ ভবনে সশস্ত্র হামলা করতে যাওয়ায় আনসার আল ইসলামের সদস্য মোহাম্মদ আল সাকিবকে সিটিটিসি গ্রেপ্তার করলে জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানান—উসামার নির্দেশে হামলার পরিকল্পনা হচ্ছিল।

এই হামলার জন্য সাকিবকে মোট ৩১৩ জন সদস্যকে একত্রিত করার নির্দেশনা দেন উসামা। বদর যুদ্ধের আদলে এই হামলা চালানোর পরিকল্পনা করেন তিনি।। ফেসবুকে গোপন একটি গ্রুপও খোলা হয় এজন্য। পরিকল্পনা অনুযায়ী, সাকিব কয়েকজন সহযোগীসহ সংসদ ভবন এলাকায়ও যান। তাদের সঙ্গে ছিল ধারালো অস্ত্র। উদ্দেশ্য ছিল সংসদ ভবনে ঢুকতে বাধাদানকারী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপর প্রথমে হামলা করা হবে। যদি এতে তারা জয়লাভ করে, তাহলে সংসদ ভবনে প্রবেশ করে দখল নেবেন।

কিন্তু গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে আগে থেকেই বিষয়টি জানতে পেরে সাকিবকে সংসদ ভবন এলাকার মানিক মিয়া এভিনিউ থেকে ধারালো অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তার সহযোগী কয়েকজন পালিয়ে যান। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সাকিবের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী সে রাতেই অভিযান চালিয়ে রাজবাড়ী থেকে আলী হাসান উসামাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তার মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ ও সামাজিক যোগাযোগ অ্যাকাউন্টের ফরেনসিক বিশ্লেষণে ভারতীয় জঙ্গিদের সঙ্গে তার যোগাযোগের তথ্য পাওয়া যায়।

পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম থেকে গ্রেপ্তার হওয়া নজিবুল্লাহ নামে এক জঙ্গির ডিভাইসেও উসামার সঙ্গে যোগাযোগের ছবি ও তথ্য পাওয়া যায়।

তখন সিটিটিসি জানিয়েছিল, উসামা টেলিগ্রাম ও সিগন্যাল অ্যাপে একাধিক জঙ্গি গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন এবং নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবে কাজ করতেন।

সিটিটিসির কর্মকর্তারা আরও জানিয়েছেন, উসামার সঙ্গে বাংলাদেশের আনসার আল ইসলামের প্রধান আল ইমরান, তামিম আল আদনানী এবং জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদের নেতা মাইনুলেরও যোগাযোগ থাকার তথ্য মিলেছে। জিজ্ঞাসাবাদে উসামা বেশিরভাগ তথ্য এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন বলে জানা গেছে।

তিনি যেসব বই লিখেছেন তার সেগুলোতেও উগ্রবাদী মতাদর্শ প্রচার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব বইয়ের প্রকাশকদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও সেসময় জানিয়েছিলো পুলিশ।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশে সক্রিয় জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে আল-কায়েদার অনুসারী আনসার আল ইসলাম অন্যতম। আগে এই সংগঠনটি ‘আনসারুল্লাহ বাংলা টিম’ নামে পরিচিত ছিল। ২০১৩ সাল থেকে মুক্তমনা ব্লগার, লেখক, প্রকাশক, ভিন্নমতাবলম্বী ও ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের টার্গেট কিলিং করে আলোচনায় আসা আনসারুল্লাহ বাংলা টিমকে ২০১৫ সালের ২৫শে মে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পরে নাম বদলে নিষিদ্ধ এই সংগঠনের সদস্যরা ‘আনসার আল ইসলাম’ নামে তাদের কর্মকাণ্ড চালাতে থাকে।

২০১৭ সালের ৬ই মার্চ আনসার আল ইসলামকেও নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। নিষিদ্ধ এই সংগঠনের সদস্যরা ২০১৬ সালের ২৫শে এপ্রিল সমকামী বিষয়ক ম্যাগাজিন ‘রূপবান’-এর সম্পাদক ইউএস এইডের কর্মকর্তা জুলহাজ মান্নান ও নাট্যকর্মী মাহাবুব তনয়কে গলা কেটে ও কুপিয়ে হত্যা করে।

কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট সূত্রে জানা যায়, আনসার আল ইসলামের সদস্যরা আগে আরেক জঙ্গি নেতা জসিম উদ্দিন রাহমানীকে আধ্যাত্মিক গুরু হিসেবে অনুসরণ করেন। নিজেদের সদস্যদের মধ্যে তারা জসিম উদ্দিন রাহমানীর ওয়াজ ও বক্তব্য এবং জিহাদের সপক্ষে বিকৃত ব্যাখ্যা প্রচার করতেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়া অনেক জঙ্গিই রাহমানীর বক্তব্যে অনুপ্রাণিত হয়ে জঙ্গিবাদে জড়ান বলে স্বীকার করেন।

২০১৩ সালের আগস্টে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে কাশিমপুর কারাগারে ছিলেন রাহমানী। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই দাঙ্গার পর তাকে কারাগার থেকে রাজকীয় সম্বর্ধনা দিয়ে বের করে আনে জুলাই জঙ্গিরা। রাহমানী কারাগারে থাকায় পরবর্তীতে আলী হাসান উসামাকেই ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবে মেনে আসছিলেন আনসার আল ইসলামের জঙ্গি সদস্যরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সিলেটের বাসিন্দা আলী হাসান উসামা রাজবাড়ী জেলায় একটি মাদ্রাসা তৈরি করে সেখানেই বসবাস করছিলেন। রাজবাড়ী থেকেই বিভিন্ন ওয়াজে জিহাদের ডাক দেওয়ার পাশাপাশি ইউটিউবে উগ্রবাদী মতাদর্শ ছড়াতেন। উসামা যে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন, তার উপদেষ্টা হলেন কুখ্যাত জঙ্গি ও হেফাজত নেতা মুফতি হারুন ইজহার এবং মাওলানা মাহমুদুল হাসান গুণবী। উভয়ের বিরুদ্ধেই জঙ্গিবাদে মদত, সম্পৃক্ততা, বোমা তৈরি, ও উগ্রবাদী প্রচারণা চালানোর তথ্য-প্রমাণ রয়েছে। জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ততায় হারুন ইজহার একাধিকবার গ্রেপ্তার হন।

Visited 49 times, 1 visit(s) today