নিজস্ব প্রতিবেদক
চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালী-বাকলিয়া) আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী ড. একেএম ফজলুল হকের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছে। নির্বাচন কমিশন (ইসি) ১২ জানুয়ারি ২০২৬-এ তার আপিল খারিজ করে মনোনয়নপত্র বাতিল করেছে। রিটার্নিং অফিসারের প্রাথমিক যাচাইয়ে (৪ জানুয়ারি) দ্বৈত নাগরিকত্বের অস্পষ্টতা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা না দেওয়ায় মনোনয়ন বাতিল হয়। ফজলুল হক দাবি করেছিলেন যে, তিনি ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫-এ মার্কিন নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন, কিন্তু প্রমাণসহ প্রয়োজনীয় নথি জমা না দেওয়ায় ইসি সিদ্ধান্ত বহাল রাখে। তিনি এটিকে ‘পক্ষপাতমূলক’ বলে অভিহিত করে হাইকোর্টে আইনি লড়াইয়ের ঘোষণা দিয়েছেন।
জামায়াতে ইসলামী তাদের প্রার্থী তালিকায় ড. ফজলুল হককে চট্টগ্রাম-৯ আসনে মনোনয়ন দিয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, তার স্ত্রী আমেনা শাহীনের নামে নিউইয়র্কের নাসাও কাউন্টিতে স্থাবর সম্পত্তির তথ্য নির্বাচনী হলফনামায় উল্লেখ করা হয়নি। বাংলাদেশের সংবিধান ও নির্বাচনী আচরণবিধি অনুযায়ী, বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের পূর্ণ প্রমাণ ছাড়া জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ অসম্ভব।
মার্কিন ফেডারেল রেজিস্টারের সর্বশেষ তথ্য (নভেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত) অনুসারে তার নাগরিকত্ব ত্যাগের আনুষ্ঠানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি (যদিও এ ধরনের তথ্য প্রকাশে সাধারণত বিলম্ব হয়)।
এই ঘটনায় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুইয়ার বক্তব্য নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সম্প্রতি তিনি দ্বৈত নাগরিক ও ঋণখেলাপীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ না দেওয়ার হুমকি দিয়ে বলেছেন, “কোনো ব্লাডি ফরেনারদের বাংলাদেশে নির্বাচন করতে দেওয়া হবে না।” তিনি আরও হুঁশিয়ারি দেন যে, এমনটা হলে তারা রাজপথে নামবে এবং প্রয়োজনে নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার দাবি তুলবে।
কিন্তু এখানেই উঠেছে তীব্র দ্বিচারিতার অভিযোগ। বর্তমানের ড ইউনুসের সরকার প্রবাসী বাংলাদেশিদের পোশটারল ব্যালতের মাধ্যমে এই প্রথম বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেয়ার ব্যাবস্থা করছেন। জনমনে প্রশ্ন, “ব্লাডি ফরেনার”রা যদি বিদেশে বসে বাংলাদেশের সরকার নির্বাচনে ভোট দিতে পারে, তাহলে তারা কেন নির্বাচনে অংশগ্রহন করতে পারবে না। যে সকল প্রবাসী বাংলাদেশী দীর্ঘসময় বিদেশে অবস্থান করেও বাংলাদেশের রাজনীটিতে অতোপ্রোতভাবে জড়িত, তারা অনেকেই তারেক রহমানের সাথে দেশে ফিরেছেন, জামায়াতে ইসলামী প্রকাশ্যে রাজনীতি শুর করায় এইদলেরও অনেক প্রার্থী নির্বাচন করতে দেশে ফিরেছে। অথচ এদের সবাইকে “ব্লাডি ফরেনার” বলে অপমান করেছেন ছাত্র সমন্বয়ক থেকে উপদেষ্টা হওয়া হাজার কোটি টাকার দূর্ণীতির দায়ে অভিযুক্ত আসিফ মাহমুদ।
অথচ জুলাই আন্দোলনের পর গঠিত ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে বেশিরভাগ উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারী দ্বৈত নাগরিক বা বিদেশি নাগরিকত্বধারী ছিলেন। প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস নিজে দ্বৈত নাগরিক (বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র)। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমানের মতো ব্যক্তিরা মার্কিন পাসপোর্টধারী, যিনি বাংলাদেশের নাগরিকত্বাব ত্যাগ করেছেন (যদিও এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে তিনি মুখে অস্বীকার করা ছাড়া আজও বাংলাদেশের পাসপোর্ট দেখাতে পারেন নাই) বলে অভিযোগ রয়েছে ।
অন্তর্বর্তী সরকারে এসব “ব্লাডি ফরেনার” রাষ্ট্র পরিচালনায় সর্বাঙ্গে থাকার পরও নির্বাচনে দ্বৈত নাগরিকদের অংশগ্রহণের বিরোধিতা—এটিকে অনেকে পাবলিকিটি স্ট্যান্ট বা নিজেদের জোটের “ব্লাডি ফরেনার”দের আড়াল করার চেষ্টা বলে মনে করছেন।
এনসিপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে নির্বাচনী জোট বা সমঝোতা (যেমন জামায়াত-নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটে এনসিপির অংশগ্রহণ) প্রেক্ষাপটে এই দ্বিচারিতা আরও স্পষ্ট। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রশ্ন উঠেছে—যে দলের মুখপাত্র দ্বৈত নাগরিকদের বিরুদ্ধে কঠোর হুমকি দিচ্ছেন, সেই জোটসঙ্গী জামায়াত কেন দ্বৈত নাগরিককে প্রার্থী করল? এতে সত্য গোপন করে ভোটারদের ধোঁকা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
জামায়াতের এই সিদ্ধান্তকে অনেকে রাজনৈতিক সুবিধাবাদী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন, যা জুলাই আন্দোলনের পর গড়ে ওঠা নতুন রাজনৈতিক পরিবেশে স্বচ্ছতা ও নীতির প্রতি গভীর প্রশ্ন তুলেছে। ফজলুল হকের মনোনয়ন বাতিলের পরও বিষয়টি আদালতে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ নির্বাচনের পরিবেশকে আরও উত্তপ্ত করতে পারে।
সাধারণ ভোটারদের মধ্যে এখন প্রশ্ন—রাজনৈতিক দলগুলো কি সত্যিকারের সংস্কার ও স্বচ্ছতার পথে হাঁটছে, নাকি ক্ষমতার খেলায় পুরনো দ্বৈত মানদণ্ডই চালু রাখছে? এই ঘটনা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে সংশয় সৃষ্টি করেছে।
