নিজস্ব প্রতিবেদক
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গঠিত জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট থেকে বেরিয়ে দলটির আকিদা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (ইআবা)। দলটি বলছে—জামায়াত যে বক্তব্য দিয়েছে, তা তাদের দীর্ঘদিনের নীতি-আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না, শরিক দলগুলোকে সেটি ভেবে দেখতে হবে।
গতকাল পুরানা পল্টনের নোয়াখালী টাওয়ারে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে ইআবা মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান এই অবস্থান তুলে ধরেন।
গাজী আতাউর বলেন, জামায়াত আমির শফিকুর রহমান সম্প্রতি এক আলোচনায় জানিয়েছেন—তারা ক্ষমতায় গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন। খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের এক সদস্যকেও তিনি আশ্বস্ত করেছেন যে শরিয়া আইন প্রতিষ্ঠার কোনো পদক্ষেপ নেবেন না।
ইআবা’র দাবি, এই বক্তব্য জামায়াতের জন্মলগ্নের মূল স্লোগান—‘আল্লাহর আইন চাই, সৎ লোকের শাসন চাই’—এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
আতাউর বলেন, “যারা সারা দেশে ইসলামের পক্ষে কাজ করছেন, তাদের আবেগ-অনুভূতি বিবেচনায় নিলে দেখা যায়—জামায়াত প্রচলিত আইনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এতে আদর্শিক লক্ষ্য অর্জনের সম্ভাবনা আমরা দেখছি না।”
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ইআবা বাংলাদেশ ২৬৮ আসনে নিজেদের প্রার্থী দেবে। বাকি ৩২ আসনে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের পর অন্যদের সমর্থন জানাবে দলটি।
মুখপাত্র বলেন, “আমরা তাদের (জামায়াতের) ক্ষমতায় যাওয়ার পথে বাধা হতে চাই না। তবে প্রচলিত আইন শান্তি–কল্যাণ প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়েছে। এই আইন বৈষম্য ও অন্যায়ের জন্ম দিয়েছে। আমরা সবসময় বলেছি—আল্লাহর দেওয়া আইন প্রতিষ্ঠাই আমাদের আন্দোলনের লক্ষ্য।”
তিনি বলেন, “শেষ মুহূর্তে যখন দেখি—জামায়াত প্রচলিত আইনেই রাষ্ট্র চালানোর কথা বলছে, তখন আমরা আর সহযোগী থাকার অবস্থায় নেই।”
শরিকদের প্রতি আহ্বান: ‘আদর্শ সাংঘর্ষিক কি না যাচাই করুন’
জামায়াত নেতৃত্বাধীন যে ১১ দলীয় জোট গঠিত হয়েছিল, সেখানে ইআবাসহ বিভিন্ন ধর্মভিত্তিক দল ছিল। ত্রয়োদশ নির্বাচন ঘনিয়ে আসার পর এই মোর্চা নির্বাচনী জোটে রূপ নেয়ার প্রক্রিয়ায় ছিল। এ নিয়ে ইআবা নেতারা বলেন, শরিক দলগুলোকে নিজেদের অবস্থান পর্যালোচনা করা উচিত।
আতাউর রহমান বলেন, “জামায়াত প্রধানের বক্তব্য তাদের (শরিকদের) নীতি-আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না—এটা তারা যেন পরিষ্কারভাবে ভেবে দেখেন।”
জোট ছাড়ার পেছনে রাজনৈতিক কারণও তুলে ধরে ইআবা বলে—জামায়াত বিএনপি নেতা তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করে জাতীয় সরকার গঠনের কথা বলেছে, কিন্তু শরিকদের তা জানায়নি।
মুখপাত্র বলেন, “বিএনপি আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী। প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির সঙ্গে সমঝোতা হলে নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। এ অবস্থায় নির্বাচন ইলেকশন হবে নাকি সিলেকশন—এই শঙ্কা তৈরি হয়েছে।”
তিনি বলেন, “বাংলাদেশে অতীতে নির্বাচন নিয়ে যে কলঙ্ক হয়েছে, আমরা চাই সেই অবস্থা থেকে দেশ বেরিয়ে আসুক। তলে তলে সমঝোতার নির্বাচন—এটা আমরা চাই না।”
ইআবা জানায়, আগের সরকারের পতনের পর ইসলামপন্থিদের সামনে বড় সুযোগ তৈরি হয়েছিল। সে প্রেক্ষাপটে চরমোনাই পীর ‘ওয়ান বক্স পলিসি’ ঘোষণা করেছিলেন, যাতে ইসলামপন্থি দলগুলো একক প্ল্যাটফর্মে থাকে।
যুগ্ম মহাসচিব বলেন, “মানুষের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল যে ইসলামি শক্তি ঐক্যবদ্ধ হবে। কিন্তু কেউ কেউ রাজনৈতিক স্বার্থে এই নীতি থেকে সরে গেছে। এতে আমরা ব্যথিত।”
তিনি বলেন, “আমরা এবাদতের রাজনীতি করি, প্রতারণা করতে পারি না। আমাদের নীতি–আদর্শ থেকে বিচ্যুত হওয়ার সুযোগ নেই।”
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (ইআবা) স্বীকার করে, জোট থেকে বেরিয়ে আসায় সামনে পথ সহজ নাও হতে পারে। তবে তারা আদর্শভিত্তিক রাজনীতি চালিয়ে যেতে চায়।
মুখপাত্র বলেন, “আমরা ক্ষমতার রাজনীতি করি না। ইসলাম আমাদের মূল লক্ষ্য। নীতি–আদর্শের প্রশ্নে আমরা বৈরিতার শিকার হলেও পথ ছাড়ব না।”
তিনি আরও জানান, ৩২ আসনে কাকে সমর্থন দেয়া হবে—মনোনয়ন প্রত্যাহারের পর দলটি সিদ্ধান্ত নেবে।
সংবাদ সম্মেলনে ইআবা’র যুগ্ম মহাসচিব আশরাফুল আলম, সহকারী মহাসচিব আহমদ আব্দুল কাইয়ুম, কে এম আতিকুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক শাহ ইফতেখার তারিক, দপ্তর সম্পাদক লোকমান হোসেন জাফরি, প্রচার ও দাওয়া সম্পাদক শেখ ফজলুল করীম মারুফ উপস্থিত ছিলেন।
