সিন্ডিকেট সামলাতে ব্যর্থ ইউনূস সরকার: ১৩শ টাকার এলপিজি গ্রাহক কিনছে ৩ হাজারে

সিন্ডিকেট সামলাতে ব্যর্থ ইউনূস সরকার: ১৩শ টাকার এলপিজি গ্রাহক কিনছে ৩ হাজারে
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

চলতি জানুয়ারি মাসের জন্য ১২ কেজি (সাড়ে ১২ কেজি) এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৫৩ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৩০৬ টাকা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। কিন্তু বাস্তবে সেই দামে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না কোথাও। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এলপিজি কিনতে গিয়ে গ্রাহকদের গুনতে হচ্ছে প্রায় ৩ হাজার টাকা।

সরকারি দামের সঙ্গে বাস্তব বাজারদরের এই বিপুল ব্যবধানকে সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে অন্তর্বর্তী ইউনূস সরকারের চরম ব্যর্থতা হিসেবেই দেখছেন ভোক্তা ও বাজার বিশ্লেষকরা।

গত ৪ঠা জানুয়ারি সন্ধ্যায় বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ এক সংবাদ সম্মেলনে জানুয়ারি মাসের নতুন দাম ঘোষণা করেন। ঘোষণা অনুযায়ী, ভ্যাটসহ প্রতি কেজি এলপিজির দাম নির্ধারণ করা হয় ১০৮ টাকা ৮৩ পয়সা, যা সন্ধ্যা ছয়টা থেকে কার্যকর হয়। সে হিসাবে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম দাঁড়ায় ১ হাজার ৩০৬ টাকা। কিন্তু ঘোষণার পর থেকেই বাজারে সংকট আরও তীব্র হয়েছে।

রাজধানীর মোহাম্মদপুর, মিরপুর, যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, বাড্ডা ও কেরানীগঞ্জ এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার ৩ হাজার টাকার নিচে পাওয়া যাচ্ছে না। অধিকাংশ দোকানে সরকারি দামের কথা বললেই বিক্রেতারা জানিয়ে দিচ্ছেন— “এই দামে গ্যাস নেই।” কোথাও আবার বলা হচ্ছে, “নিলে নিতে পারেন, না নিলে নেই।”

বাজারে বর্তমানে ১০–১১টি কোম্পানির এলপিজি থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে বেক্সিমকো গ্রুপের আইগ্যাস ও ওমেরা ছাড়া অন্য কোনো কোম্পানির গ্যাস অনেক এলাকায় মিলছে না। বসুন্ধরা, যমুনা বা অন্য ব্র্যান্ডের সিলিন্ডার চাইলেই বিক্রেতারা জানাচ্ছেন— “স্টক নাই।” এর ফলে গ্রাহকদের বাধ্য হয়ে অন্য কোম্পানির সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে।

শাহাদাৎ হোসেন নামে এক ভুক্তভোগী বিডি ডাইজেস্টকে বলেন, তিনি দীর্ঘদিন বসুন্ধরার এলপিজি ব্যবহার করতেন। কিন্তু বাজারে সেটি না পেয়ে আইগ্যাস নিতে বাধ্য হয়েছেন।

তাঁর ভাষায়, “১২ কেজির গ্যাসের সরকারি দাম ১ হাজার ৩০৬ টাকা। কিন্তু আমাকে দিতে হয়েছে ১ হাজার ৬০০ টাকা। আবার সিলিন্ডার বদলাতে গিয়ে বোতলের দাম হিসেবে আলাদা করে ১ হাজার ৪০০ টাকা দিতে হয়েছে। একবার গ্যাস কিনতেই প্রায় ৩ হাজার টাকা চলে গেল।”

একই অভিজ্ঞতার কথা জানালেন মিরপুরের বাসিন্দা রিকশাচালক আবদুল মালেক।

তিনি বলেন, “আমার বাসায় গ্যাস লাইন নাই, এলপিজিতেই রান্না করি। আগে মাসে একবার সিলিন্ডার নিলেই চলত। এখন একবার কিনতেই তিন হাজার টাকা লাগলে আমরা চলবো কীভাবে? দোকানে গেলে বলে গ্যাস নাই, আবার কেউ কেউ তিন হাজারের নিচে ছাড়ে না।”

যাত্রাবাড়ীর গৃহবধূ রেহানা বেগম বলেন, “সরকার দাম ঘোষণা করে, কিন্তু আমরা সেই দামে কিছুই পাই না। দোকানদাররা বলে—‘আমাদের কাছেও বেশি দামে আসছে।’ তাহলে সরকার কার জন্য দাম ঠিক করে?”

কেরানীগঞ্জের এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম বলেন, এক কোম্পানির সিলিন্ডার অন্য কোম্পানির ডিলার নিতে না চাওয়ায় সংকট আরও বেড়েছে।

“আমার কাছে আগের বোতল আছে, কিন্তু ওই কোম্পানির গ্যাস নাই। নতুন কোম্পানির বোতল না নিলে গ্যাস দেবে না। এতে একসঙ্গে দুই-তিন হাজার টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে,” বলেন তিনি।

বিইআরসির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, উৎপাদন পর্যায়ে গ্যাস নির্ধারিত দামেই বিক্রি হচ্ছে এবং খুচরা পর্যায়ে বাড়তি দামের বিষয়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর অভিযান চালাচ্ছে। তবে বাস্তবে সেই অভিযান বাজারে কোনো প্রভাব ফেলছে না বলে অভিযোগ ভোক্তাদের।

জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল করিম খান সম্প্রতি দাবি করেছেন, দেশে এলপিজির কোনো ঘাটতি নেই এবং বাজারে যে সংকট দেখা যাচ্ছে তা মূলত কারসাজির ফল। কিন্তু ভোক্তাদের প্রশ্ন—যদি কারসাজিই হয়, তাহলে সরকার কেন তা ঠেকাতে পারছে না?

বিশ্লেষকদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ও জ্বালানি উপদেষ্টা দায়িত্ব নেওয়ার পর এলপিজি খাতে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। সিন্ডিকেট, কোম্পানিভিত্তিক আধিপত্য এবং খুচরা বাজারে নজরদারির অভাবে সরকারি দামের এলপিজি সাধারণ মানুষের কাছে শুধু ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে আছে।

দ্রুত সিন্ডিকেট ভাঙা, সরবরাহ স্বাভাবিক করা এবং খুচরা পর্যায়ে কঠোর নজরদারি না হলে এলপিজি সংকট আরও ভয়াবহ আকার নেবে—এমন আশঙ্কাই এখন গ্রাহকদের মধ্যে তীব্র হয়ে উঠেছে।

Visited 19 times, 1 visit(s) today