বিচারকের গানম্যান থেকে উদ্ধার আড়াই কোটি টাকার ইয়াবা আত্মসাৎ, ৮ পুলিশ সদস্য বরখাস্ত

বিচারকের গানম্যান থেকে উদ্ধার আড়াই কোটি টাকার ইয়াবা আত্মসাৎ, ৮ পুলিশ সদস্য বরখাস্ত
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রামের বাকলিয়া থানার শাহ আমানত সেতু এলাকায় পুলিশ চেকপোস্টে কক্সবাজার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২–এর এক বিচারকের গানম্যান থেকে প্রায় ১ লাখ ইয়াবা জব্দ করার পর তা আত্মসাতের অভিযোগে ৮ পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে চট্টগ্রাম মেট্রপলিটন পুলিশ (সিএমপি)।

চট্টগ্রামের বাকলিয়া থানার শাহ আমানত সেতু এলাকায় পুলিশ চেকপোস্টে ৯০ হাজার ইয়াবা জব্দ করার পর তা আত্মসাতের অভিযোগে আট পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে চট্টগ্রাম মেট্রপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। মাদকদ্রব্য আত্মসাৎ, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদান এবং বৈধ আদেশ অমান্যের অভিযোগে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

রোববার বিকেলে সিএমপি দক্ষিণ জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার হোসাইন মোহাম্মদ কবির ভূঁইয়ার স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে বরখাস্তের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।

বরখাস্ত হওয়া পুলিশ সদস্যরা হলেন-বাকলিয়া থানার এসআই মোহাম্মদ আল-আমিন সরকার, বর্তমানে কোতোয়ালি থানায় কর্মরত এসআই মোহাম্মদ আমির হোসেন, এএসআই সাইফুল আলম, এএসআই মো. জিয়াউর রহমান, এএসআই মো. সাদ্দাম হোসেন ও এএসআই এনামুল হক, কনস্টেবল মো. রাশেদুল হাসান ভূঞা এবং নারী কনস্টেবল উম্মে হাবিবা স্বপ্না।

পড়ুন: ৯০ হাজার ইয়াবাসহ আটক বিচারকের গানম্যানকে ছেড়ে দিল পুলিশ, সংবাদ ধামাচাপার অভিযোগ

অফিস আদেশে বলা হয়, গত ৮ই ডিসেম্বর রাতে কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী একটি এসি বাস শাহ আমানত সেতু এলাকায় পুলিশি তল্লাশির সময় কক্সবাজার জেলা পুলিশের কনস্টেবল ও একজন বিচারকের গানম্যানের দায়িত্ব পালনকারী মো. ইমতিয়াজ হোসেনের সঙ্গে থাকা ট্রলি ব্যাগ থেকে আনুমানিক ১ লাখ ইয়াবা জব্দ করা হয়। জব্দকৃত ইয়াবা যথাযথ আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা আত্মসাৎ করেন এবং দিবাগত রাত সাড়ে ৩টার দিকে কনস্টেবল ইমতিয়াজ হোসেনকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠে।

পরবর্তীতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের তদন্তে বিষয়টি সত্যতা পাওয়া গেলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। বরখাস্তকালীন সময়ে পুলিশ সদস্যদের দামপাড়া পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করে নিয়মিত হাজিরা ও রোলকল দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ঘটনার ধারাক্রম

৮ই ডিসেম্বর রাত ১০টা ১৫ মিনিটে কক্সবাজারের কলাতলীর দেশ ট্রাভেলস কাউন্টার থেকে টিকিট কেটে ঢাকাগামী বাসের ই-ওয়ান নম্বর সিটে ওঠেন কনস্টেবল ইমতিয়াজ। তিনি কক্সবাজার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২–এর বিচারকের গানম্যান হিসেবে কর্মরত। যদিও টিকিটে তার যাত্রা শুরুর স্থান হিসেবে চকরিয়া উল্লেখ ছিল। টিকিটের নিবন্ধন করা হয় ঢাকার ধামরাইয়ের বাহারউদ্দিন নামের এক ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ব্যবহার করে। যাত্রার জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট বিচারক কিংবা কক্সবাজার জেলা পুলিশ কার্যালয় থেকে কোনো ছুটিও নেননি।

বাসটির সুপারভাইজার মিজান জানান, কর্ণফুলী সেতু পার হওয়ার পর বাকলিয়া থানার চেকপোস্টে গাড়ি তল্লাশির সময় ইমতিয়াজকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তিনি নিজেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিলে তাকে পুলিশ বক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর পুলিশ সদস্যরা বাসের লাগেজ বক্স থেকে তার দুটি তালাবদ্ধ ব্যাগ নামিয়ে নিয়ে যান। ৩০ মিনিট পর ইমতিয়াজকে রেখে বাসটি ছেড়ে দেওয়া হয়। ওই রাতে আরও তিনটি স্থানে বাসটি তল্লাশির মুখে পড়ে।

ইমতিয়াজের পেছনের সিটে থাকা এক যাত্রী জানান, পুলিশ এসে সামনের সিটের যাত্রীকে গাড়ি থেকে নামিয়ে নেয়। পরে তাকে ছাড়াই বাসটি ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যায়।

পুলিশের একটি সূত্র জানায়, ইমতিয়াজের সঙ্গে থাকা ব্যাগে প্রায় ৯০ হাজার পিস ইয়াবা ছিল। তবে ঘটনার পর থেকে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা কোনো পুলিশ সদস্য আটক বা ইয়াবা উদ্ধারের বিষয়টি পুরোপুরি অস্বীকার করে আসছেন।

বাকলিয়া থানা পুলিশের মতো কনস্টেবল ইমতিয়াজ হোসেনও নিজের পরিচয় অস্বীকার করেছেন।

তবে এক পুলিশ সদস্যের কাছে তিনি স্বীকার করেছেন, সেদিন তার কাছ থেকে ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। তাকে পুলিশ বক্সে নেওয়ার পর সেখানে সাদা পোশাকে ওসি (তদন্ত) তানভীর আহমেদ, সেকেন্ড অফিসার আল আমিন, আরেকজন এসআই, তিনজন এএসআই, একজন পুরুষ কনস্টেবল, দুইজন নারী কনস্টেবল এবং কয়েকজন সোর্স উপস্থিত ছিলেন।

সূত্র জানায়, ওই সময় একটি জব্দ তালিকা প্রস্তুত করা হয় এবং ইমতিয়াজের কাছ থেকে জবানবন্দি নিয়ে তাতে স্বাক্ষর করানো হয়। পরে বিষয়টি কাউকে না জানানোর শর্তে কয়েক ঘণ্টা পর তাকে কুমিল্লাগামী একটি বাসে তুলে দেওয়া হয়।

কনস্টেবল ইমতিয়াজের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরের কল ডেটা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তিনি গত ১৩ই অক্টোবর কক্সবাজার থেকে ঢাকায় যান এবং ১৭ই অক্টোবর ফিরে আসেন। এরপর ১৫ই নভেম্বর ঢাকায় গিয়ে ১৭ই নভেম্বর ফেরেন। আবার ২২শে নভেম্বর ঢাকায় গিয়ে ২৪শে নভেম্বর কক্সবাজারে ফিরে আসেন। সর্বশেষ ৮ই ডিসেম্বর রাতে কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী বাসে উঠলেও কর্ণফুলী সেতুর চেকপোস্টে আটক হন। পরে মুক্ত হয়ে কুমিল্লায় গ্রামের বাড়িতে চলে যান।

ইমতিয়াজ কুমিল্লার মুরাদনগর থানার বাখরনগর গ্রামের বাবলু মিয়ার ছেলে। তার বিপি নং-০৩২২২৪১১০৯।

তার এক ব্যাচমেট বলেন, ‘কক্সবাজার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতে সায়েম নামে এক পুলিশ সদস্য গানম্যান হিসাবে ছিলেন। তার সঙ্গে ইমতিয়াজের সখ্য ছিল। সায়েমকে খাগড়াছড়িতে বদলি করার পর সেই স্থানে ইমতিয়াজ হোসেন আসেন। তবে সায়েম খাগড়াছড়ি থেকে প্রায় সময় কক্সবাজার আসা-যাওয়া করতেন। সায়েমের মাধ্যমেই ইয়াবা কারবারের সঙ্গে ইমতিয়াজ জড়িয়ে পড়েন। এর মধ্যে সায়েমসহ দুই ব্যক্তিকে এক বছর আগে ইয়াবাসহ আটক করে খাগড়াছড়ি পুলিশ সুপারের কাছে সোপর্দ করেছিল র‌্যাব।’

পুলিশের বিরুদ্ধে মাদক পাচারকারীকে সহায়তা এবং আলামত গায়েবের মতো গুরুতর অভিযোগ চট্টগ্রামে ‘টক অব দ্য টাউন’। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ক্যামেরার সামনে কথা বলতে না চাইলেও বিষয়টি গড়ায় আদালত পর্যন্ত।

বাকলিয়া থানার এক এসআই বলেন, ‘ইয়াবা উদ্ধারের পর এক পুলিশ সদস্যকে ছেড়ে দেওয়া এবং ইয়াবাগুলো গায়েব করায় যারা দায়িত্বে ছিলেন, সবাই বিপাকে রয়েছেন। এছাড়া এলাকাটি চাক্তাই ফাঁড়ির আওতাধীন। কিন্তু চাক্তাই ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই মোবারক ঘটনাস্থলে ছিলেন না। অথচ তিনিও বিপাকে পড়েছেন। জানতে চাইলে বাকলিয়া থানার ওসি আফতাব উদ্দিন বলেন, ‘এ ধরনের একটি বিষয় শুনেছি। তবে যাচাই-বাছাই করে সত্যতা পাওয়া যায়নি।’

পরে চট্টগ্রামের মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এস এম আলাউদ্দিন মাহমুদ গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন আমলে নিয়ে স্বপ্রণোদিত হয়ে একটি মামলা গ্রহণ করলে আদালত ১২ই জানুয়ারির মধ্যে সিএমপির উপ-কমিশনার (দক্ষিণ)–কে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন।

এরপরই এই বরখাস্তের নির্দেশনা আসে।

Visited 29 times, 1 visit(s) today