ইতিহাসের এ দিনে: নির্বাসন থেকে দেশে ফিরে কিশোর জঙ্গির হামলায় নিহত হন বেনজির ভুট্টো

ইতিহাসের এ দিনে: নির্বাসন থেকে দেশে ফিরে কিশোর জঙ্গির হামলায় নিহত হন বেনজির ভুট্টো
শেয়ার করুন

পাকিস্তানের ইতিহাসের এক শোকাবহ দিন ২০০৭ সালের ২৭শে ডিসেম্বর। দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) নেতা বেনজির ভুট্টো সেদিন রাওয়ালপিন্ডিতে নির্বাচনী প্রচারণা শেষে গাড়িতে উঠে সমর্থকদের উদ্দেশে হাত নাড়ছিলেন। আত্ম-নির্বাসন থেকে দেশে ফেরার মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরই সেই সমাবেশেই এক কিশোর আত্মঘাতী হামলাকারী কাছাকাছি ভিড়ের মধ্যে থেকে প্রথমে গুলি চালায় এবং পরে বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়।

ওই হামলায় বেনজির ভুট্টো ও আরও ২৩ জন নিহত হন।

ভুট্টো সেদিন বুলেটপ্রুফ ল্যান্ড রোভার গাড়িতে ছিলেন। কিন্তু সমর্থকদের অভিবাদন জানাতে তিনি সানরুফ খুলে দাঁড়ালে হামলাকারী সুযোগ পায়। মাত্র এক মাস আগেও দেশে ফেরার পর করাচিতে তার স্বাগত সমাবেশে এক বড় ধরনের বোমা হামলা হয়, যেখানে প্রায় ১৫০ জন নিহত হন—যা তার রাজনৈতিক যাত্রাকে শুরু থেকেই চরম ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।

৫৪ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করা বেনজির ভুট্টো ছিলেন পাকিস্তানের দু’বারের প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রের প্রথম নারী সরকারপ্রধান। দীর্ঘ আট বছরের আত্ম-নির্বাসন শেষে তিনি দেশে ফিরে তৃতীয় দফায় ক্ষমতার লড়াই শুরু করেছিলেন, কিন্তু নিরাপত্তা ঝুঁকির মাঝেই তাকে জীবন দিতে হয়।

হামলার পর দেশজুড়ে দাঙ্গা, লুটপাট ও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। কীভাবে তিনি নিহত হয়েছেন—এ নিয়েও তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়। সরকার দাবি করেছিল, গুলির আঘাতে নয় বরং সানরুফে মাথা আঘাত পেয়ে তার মৃত্যু হয়েছে। তবে পিপিপি নেত্রী শেরি রহমান—যিনি সেদিন মোটরক্যাডে ছিলেন এবং পরবর্তীতে ভুট্টোর দেহ ধৌতকরণে অংশ নেন—স্পষ্টভাবে বলেন যে তার মাথার পেছনে গুলির প্রবেশ ও বের হওয়ার চিহ্ন ছিল।

ঘটনার তদন্তে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডসহ আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা যুক্ত হন। প্রথম থেকেই পাকিস্তানি তালেবান ও আল-কায়েদার সম্পৃক্ততার কথা উঠে আসে, যদিও দীর্ঘদিন ধরে ধারণা করা হয়—রাষ্ট্রযন্ত্রের কিছু অংশও এতে ভূমিকা রাখতে পারে।

২০১০ সালে জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ভুট্টোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছিল ফেডারেল সরকার, পাঞ্জাব সরকার এবং রাওয়ালপিন্ডি পুলিশ। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এসব সংস্থা পরিস্থিতির অসাধারণ ঝুঁকি সম্পর্কে জেনেও যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি, এবং হত্যাকাণ্ডের তদন্তেও প্রত্যাশিত দৃঢ়তা দেখা যায়নি।

২০১১ সালে এ মামলায় সাতজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়—রাওয়ালপিন্ডির তৎকালীন পুলিশ প্রধান, আরেক জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা এবং পাঁচ সন্দেহভাজন তালেবান সদস্য। তিনজন সন্দেহভাজন এর আগেই নিহত হয়। ২০১৩ সালে মামলার প্রধান সরকারি কৌঁসুলি চৌধুরী জুলফিকার আদালতে যাওয়ার পথে মোটরসাইকেলে এসে গুলি করে হত্যা করা হয়।

সেই বছরই সাবেক সামরিক শাসক পারভেজ মোশাররফের বিরুদ্ধেও অভিযোগ আনা হয়। তিনি আদালতে উপস্থিত হলেও পরবর্তীতে দুবাইয়ে পাড়ি জমান এবং জীবদ্দশায় আর বিচার মুখোমুখি হননি।

শেষ পর্যন্ত দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রমাণ নষ্ট ও অবহেলার দায়ে ১৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়, আর পাঁচ সন্দেহভাজনকে খালাস দেওয়া হয়—এবং তারাই এই মামলায় একমাত্র দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি হিসেবে থেকে যান।

ভুট্টো পরিবার: রাজনীতি ও ট্র্যাজেডির উত্তরাধিকার

বেনজির ভুট্টো একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক বংশের উত্তরাধীকার ছিলেন। তার বাবা জুলফিকার আলি ভুট্টো পিপিপির প্রতিষ্ঠাতা ও ছয় বছরের রাষ্ট্রনেতা ছিলেন; সামরিক অভ্যুত্থানের পর তাকে ১৯৭৯ সালে ফাঁসি দেওয়া হয়। পরিবারজুড়ে রাজনীতি ও নির্মম পরিণতির এই ইতিহাস সত্ত্বেও তাদের রাজনৈতিক যাত্রা থেমে যায়নি।

মায়ের মৃত্যুর পর ১৯ বছর বয়সে বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি পিপিপির চেয়ারম্যান হন। তার বাবা আসিফ আলি জারদারি দলীয় সহ-সভাপতি এবং পরবর্তীতে ২০০৮–২০১৩ মেয়াদে পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি হন; ২০২৪ সালে তিনি আবারও প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন। বিলাওয়াল ২০১৮ সালে জাতীয় সংসদে নির্বাচিত হন এবং ২০২২ সালে স্বল্পকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে তিনি প্রধানমন্ত্রী পদে দলের প্রার্থী ছিলেন; যদিও ঝুলন্ত পার্লামেন্টের ফলে পিপিপি শেষ পর্যন্ত জোটে থেকে মন্ত্রিসভায় যোগ দেয়নি।

৩৭ বছর বয়সী বিলাওয়াল এখনও তরুণ রাজনীতিক এবং তার সামনে দীর্ঘ পথ—যেখানে তিনি এখনো মায়ের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ও গণতান্ত্রিক আদর্শ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছেন।

Visited 73 times, 1 visit(s) today