জেলা প্রতিনিধি
রাজশাহীর বাগমারা উপজেলায় পরিবহন শ্রমিক-মালিকদের হাতে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতিত ভ্যানচালক ওমর ফারুক (৩৯) কারান্তরীন অবস্থায় মৃত্যুর পর হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে।
২৬শে ডিসেম্বর, বৃহস্পতিবার রাতে নিহতের বাবা মোসলেম সরদার বাগমারা থানায় মামলা দায়ের করেন। ওমর ফারুককে ভয়াবহ নির্যাতনের কথা ভুলতে পারছেন না প্রত্যক্ষদর্শীরা। শত শত মানুষ দেখলেও কেউ প্রতিবাদ করেনি। এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিষয়টি অবগত হলেও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়নি। বরং নির্যাতিত ওমর ফারুককে রক্ষার বদলে পরিবহন সন্ত্রাসীদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে উল্টো তাকে জরিমানা ও কারাগারে প্রেরণ করেছিল। এই ঘটনায় ক্ষোভ ও নিন্দা জানিয়েছেন মানবাধিকার কর্মীরা।
ওমর ফারুক খুনের মামলায় ১২ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত পরিচয়ের আরও ১০-১২ জনকে আসামি করা হয়েছে। নামোল্লোখিত আসামিরা হলেন— দেউলা গ্রামের রেজাউল করিম (৪৭), বিপ্লব ওরফে ভুট্টো ড্রাইভার (৩৫), রহিদুল ইসলাম (৪৫), হাবিবুর রহমান (৫৫), মাঝিগ্রামের আবদুল মতিন (৪০), দানগাছি গ্রামের মুকুল হোসেন ওরফে মুরগি মুকুল (৪৪), জুয়েল রানা ওরফে ভাংড়ি জুয়েল (৩৫), দরগামাড়িয়া গ্রামের রফিকুল ইসলাম (৪০), ভবানীগঞ্জের আসাদুল ইসলাম (৩৬), আবদুস সালাম (৪৮), মোজাম্মেল হক (৪২) ও আবদুল হান্নান (৩৮)।
মামলার এজাহার, প্রত্যক্ষদর্শী ও পরিবার সূত্রে জানা গেছে গত ১৭ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় ভবানীগঞ্জ সিএনজিস্ট্যান্ডে অটোভ্যান রেখে প্রস্রাব করতে যান ওমর ফারুক। ফিরে এসে তিনি সিএনজি মালিক সমিতির সভাপতি রেজাউল করিম ও সাধারণ সম্পাদক আবদুল মতিনের হাতে ব্যাটারি চুরির অভিযোগে আটক হন। তাদের নির্দেশে সমিতির সদস্যরা লোহার রড দিয়ে তাকে মারধর শুরু করে।
একপর্যায়ে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়ার পর তাকে একটি প্রাচীরের সঙ্গে দাঁড় করিয়ে হাত-পায়ে হাতুড়ি দিয়ে লোহার পেরেক ঠুকে দেওয়া হয়। পানি পান করতে চাইলে তাকে নদীতে নিয়ে গিয়ে বিবস্ত্র করে চোবানো হয়। পরে তার পায়ুপথে শুকনো মরিচের গুঁড়া ঢেলে দেওয়া হয়।
এভাবে অমানবিক ও বর্বর কায়দায় ওই শ্রমিককে নির্যাতন করেন সিএনজি মালিক সমিতির সভাপতি রেজাউল করিম ও সাধারণ সম্পাদক আবদুল মতিন এবং তার লোকজন।
ভয়াবহ নির্যাতনের মাত্রায় নিস্তেজ ওমর ফারুককে এই অবস্থায় সিএনজি মালিক সমিতির সভাপতি রেজাউল করিম ও সাধারণ সম্পাদক আবদুল মতিন ঘটনা ভিন্নখাতে নিতে গাঁজা উদ্ধারের নাটক সাজিয়ে বাগমারা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাইফুল ইসলাম ভুঞাকে দিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতে ১০০ টাকা জরিমানা ও সাত দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়ান।
এরপর তাকে বাগমারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে রাজশাহী কারাগারে পাঠানো হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে পরদিন রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ২০শে ডিসেম্বর তার মৃত্যু হয়। এই বিষয়টি পরিবহন সন্ত্রাসীদের চাপে এড়িয়ে যায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও মিডিয়া। মৃত্যুর পর তার পিতা সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করার পর আসামিদের মধ্যে তিনজনকে গত ২৩শে ডিসেম্বর দুপুরে আটক করে পুলিশ। তবে অভিযুক্ত ও নির্যাতনকারী মুকুল হোসেনকে ৫০ হাজার টাকা উৎকোচের বিনিময়ে ছেড়ে দিয়ে অন্য দুজনকে কারাগারে পাঠায় পুলিশ।
বাগমারা থানার ওসি সাইদুল আলম বলেন, ‘মামলার বিষয়টি নিশ্চিত। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। টাকার বিনিময়ে কাউকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ ভিত্তিহীন।’
