মতামত || রাজাকারদের হাত থেকে দাঁড়ি-টুপি মুক্তি পাক

মতামত || রাজাকারদের হাত থেকে দাঁড়ি-টুপি মুক্তি পাক
শেয়ার করুন

দীপু আহকাম

স্বস্তিকা, আয়রন ক্রস, কালো লং কোট ও সামরিক টুপি- এগুলো নাৎসিদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। তাদের আগে এবং পরেও পৃথিবী জুড়ে অসংখ্য মানুষ এসব ব্যবহার করেন। তবু সিনেমা, নাটকে নাৎসিদের চিত্রায়িত করতে গেলে এসব চিহ্ন দেখানো হয়। দেখানো হয়- নাৎসিরাও এসব ব্যবহার করতো বলেই। যারা নাৎসি নয়, অথচ এসব চিহ্নের কোনটি ব্যবহার করেন, তাঁরা এ নিয়ে বাদানুবাদ করেন না। করেন না এই কারণে যে, তাঁরা কন্টটেক্সট বোঝেন। তাঁরা বোঝেন- সিনেমায় এগুলো দেখানো হয় নাৎসিদের চেনানোর জন্য। এসব স্টেরিওটাইপ তাঁরা গায়ে পরে নিজেদের উপর নেন না।

আসা যাক বাংলাদেশ প্রসঙ্গে।

ঐতিহাসিকভাবে সত্য হলো- পাকিস্তান আর্মি মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙ্গালীদের বিরুদ্ধে হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, লুটপাট, অগ্নিসংযোগসহ যাবতীয় অপকর্ম করেছে। পাকিস্তানিদের এইসব অপরাধের সহযোগী ছিলো জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম ও পিডিপি নামের চারটি রাজনৈতিক দল- যারা ইসলামের নামে রাজনীতি করতো। এরাই রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস বাহিনী গঠন করে অপকর্ম করেছে। নারী ধর্ষণকে পর্যন্ত এরা ইসলামের নামে জায়েজ করেছে। এভাবে তারা ইসলাম এবং মানবতাকে অবমাননা করেছে। সাধারণভাবে বাংলাদেশের মানুষ এদেরকে ‘রাজাকার’ নামেই ঘৃণা করেন। ‘রাজাকার’ শব্দটি নৃশংস বিশ্বাসঘাতকের ব্যবহারিক প্রতিশব্দ।

মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে বাংলাদেশের সিনেমা/ নাটক/ মঞ্চ নাটকে রাজাকারদের একটি প্রোটোটাইপ চেহারা দেখানো হয়। মাথায় টুপি, মুখে দাঁড়ি, চোখে ধুর্ততা- প্রয়াত অভিনেতা এটিএম শামসুজ্জামান, হুমায়ুন ফরিদী, রাজীব এই চরিত্রগুলো দৃঢ়ভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারতেন। শহরে, গ্রামগঞ্জে মানুষ এই চরিত্রগুলো দেখে ঘৃণা প্রকাশ করতো, তাঁদের মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতার সাথে মিল খুঁজে পেয়ে। মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্মের কেউ অভিযোগ করেনি যে, এর মাধ্যমে ইসলামের অবমাননা হয়ে যাচ্ছে!

‘রাজাকারদের চিত্রায়িত করতে দাঁড়ি-টুপি ব্যবহার আসলে ইসলাম বিদ্বেষ’- এই ফিতনাটি সাম্প্রতিক। সাথে কিছু নেপোকিড আছে যারা সোশ্যাল মিডিয়া খুঁজে মুক্তিবাহিনীর হাতে ধৃত ছিঁচকে রাজাকারদের ছবি খুঁজে নিয়ে মাতম করে- কই, রাজাকারদের তো টুপি দাঁড়ি ছিলো না! নিশ্চয় ইসলামবিদ্বেষ থেকেই রাজাকারদের টুপি-দাঁড়ি দেখানো হয়।

এই নেপোকিডরা ভুলিয়ে দিতে চায়, ধাড়ি রাজাকারদের চেহারা-সুরৎ। ছিঁচকে রাজাকাররা ছিলো গ্রাম ও শহরের পাতি অপরাধী- চোর, গুণ্ডা, বদমাশ। এরা মুক্তিবাহিনীর হাতে ধরা পড়েছে, শাস্তি পেয়েছে বা জেলে গিয়েছে। অনেকেই বঙ্গবন্ধুর সাধারণ ক্ষমায় ছাড়া পেয়েছে। কিন্তু যে ধাড়ি রাজাকার যারা পরাজয় নিশ্চিত জেনে পালিয়ে গিয়েছিলো, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের আগে বাংলাদেশে ফিরে আসার সাহস করেনি- তারা কারা?

পুর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর প্রধান গোলাম ছিলো রাজাকারের মাস্টারমাইন্ড। সে দলবল নিয়ে খুনি পাকিস্তানি গভর্নর টিক্কা খানের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলো ৪ঠা এপ্রিল ও ৬ই এপ্রিল ১৯৭১। দুই সভাতেই তারা টিক্কা খানকে সহযোগীতার আশ্বাস দেয়, এই আশ্বাসের ভিত্তিতেই কয়েকদিন পর রাজাকার, আল-বদর, আল-শামসের মতো সশস্ত্র ঘাতক দল গড়ে উঠে।

পাকিস্তান সামরিক প্রশাসনকে সহায়তা প্রদান এবং মুক্তিযোদ্ধাদেরকে প্রতিরোধের লক্ষ্যে মে মাসে খুলনায় খান জাহান আলী রোডের একটি আনসার ক্যাম্পে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতা মওলানা একেএম ইউসুফের নেতৃত্বে ৯৬ জন জামায়াতে ইসলামী কর্মী নিয়ে প্রথম রাজাকার বাহিনী গঠন করা হয়। ঘাতক আল-বদর বাহিনীর নেতৃত্ব দেয় তখনকার জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের প্রধান মতিউর রহমান নিজামী।

শীর্ষ রাজাকারদের নাম হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্মের যে কেউ বলে দেবেন- গোলাম আযম, মওলানা একে এম ইউসুফ, আব্বাস আলী খান, মওলানা মান্নান, এটিএম আজহার, মতিউর রহমান নিজামী, কামারুজ্জামান, আব্দুল কাদের মোল্লা, আলী আহসান মুজাহিদ,মকবুল আহমাদ।

সিনেমা, নাটকসহ যেকোন শিল্পমাধ্যমে রাজাকারদের প্রোটোটাইপ হিসাবে তো এই নামগুলোই আসবে, ছিঁচকে রাজাকারদের নয়।

এই চেহারাগুলো যেরকম- সেরকমই আঁকা হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে। এদেরকে তো আর ক্লিনশেভড, মাথায় কাউবয় হ্যাট লাগিয়ে আঁকা যাবে না। এই রাজাকারদের নৃশংসতার শিকার যারা হয়েছেন সংখ্যাগত হিসেবে তাঁদের অধিকাংশও মুসলমান। এই রাজাকারদের বর্বরতার বিরুদ্ধে যারা অস্ত্র হাতে যুদ্ধ তাঁরাও বেশিরভাগ মুসলমান। সে কারণে টুপি-দাঁড়ি সমেত রাজাকারের ছবি দেখে কারো কখনো মনে হয়নি এটি ইসলাম বিদ্বেষ, সবাই বুঝেছেন- এটা রাজাকারদের প্রতি ন্যায্য ঘৃণা।

যারা রাজাকারদের ‘ট্রু ফেইস’-এ ইসলাম বিদ্বেষ খুঁজে পায় তারা আসলে রাজাকার ঘৃণায় কষ্ট পায়, তারা রাজাকারদের আদর্শিক উত্তরসূরী। তাদের পুর্বসূরীরা যেভাবে অপকর্ম জায়েজ করতে ইসলাম ব্যবহার করেছিলো, তারাও নিজেদের চাপা ক্ষোভ প্রকাশে ইসলামকে ব্যবহার করছে।

দাঁড়ি-টুপি যদি ইসলামের প্রতীক হয় তাহলে, দাঁড়ি-টুপির সবচেয়ে বেশী অবমাননা করেছে স্বয়ং রাজাকাররাই। ইসলামের অবমাননা রুখতে যেসব রাজাকার এখনো জীবিত আছে এবং তাদের উত্তরসুরীদের জন্য দাঁড়ি-টুপি ব্যবহার নিষিদ্ধ করা যেতে পারে।

এই ঘাতকদের হাত থেকে ইসলাম ও মানবতা রক্ষা শান্তিপ্রিয় মুসলমানদের আশু কর্তব্য।

Visited 15 times, 1 visit(s) today