চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ড > ক্ষমতার দ্বন্দ্বে মরিয়া বিএনপি-জামায়াতের শীর্ষ সন্ত্রাসীরা: বাড়ছে অত্যাধুনিক অস্ত্রের মজুদ: পর্ব-১
আয়নাল কারিগর, চট্টগ্রাম ব্যুরো
৮০-৯০ দশকে চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডের নিয়ন্ত্রণ ছিল শিবিরের সন্ত্রাসী শিবির নাছির, গিট্টু নাছির, হাবিব খান, সাজ্জাদ হোসেন খান, ফয়েজ মুন্না, ফাইভ স্টার জসিম, গিয়াস হাজারিকা ও বিডিআর সেলিমদের হাতে। ২০০৫ সালে র্যাবের অভিযানে হাবিব খান, সাজ্জাদ হোসেন খান ও বিডিআর সেলিম ছাড়া বাকিরা প্রায় সবাই ক্রসফায়ারে নিহত হন।
বর্তমানে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অন্তত ১১ জন বর্তমানে দেশে। আর বাইরে থেকে আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ করছেন অন্তত ৩ জন। প্রত্যেকেই নিজ নিজ এলাকার দখল ধরে রেখেছেন। মাঝে মাঝে অন্যের উপস্থিতি সংঘাত ডেকে আনছে। দৈনিক-সাপ্তাহিক-মাসিক কিংবা এককালীন চাঁদাবাজি, অপহরণ, টার্গেট কিলিং, কন্ট্রাক্ট কিলিং, জমি-বাড়ি দখল, নির্মাণসামগ্রীর ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে সচেষ্ট গ্রুপগুলো। চট্টগ্রাম-৮ আসনে বিএনপির প্রার্থী এরশাদ উলাহর জনসংযোগে সন্ত্রাসী সরোয়ার হোসেন বাবলা নিহতের ঘটনাটি ছিল প্রতিপক্ষকে দমন।
শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মধ্যে বর্তমানে আলোচনায় রয়েছেন শিবির নাছির, সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদ, রায়হান আলম, হাবিব খান, সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ, মোবারক হোসেন ইমন, শহিদুল ইসলাম বুইস্যা, ইসমাইল হোসেন টেম্পু, ফজল হক, মেজর ইকবাল, বিধান বড়ুয়া, আজিজ উদ্দিন ইমু, ইকরাম ও আজিজুল হক। বড় সাজ্জাদ, হাবিব খান ও ফজল হক বিদেশ থেকে কলকাঠি নাড়ছে নিজ নিজ গ্রুপের পক্ষে।
অপরাধীদের ইতিহাস
শিবির নাছির
হাটহাজারী উপজেলার মন্দাকিনী এলাকার এলাহী বক্সের ছেলে নাছির উদ্দিন চৌধুরী। নব্বইয়ের দশকে চট্টগ্রাম নগরী ও জেলায় ত্রাস সৃষ্টি করে দীর্ঘদিন আলোচনায় ছিলেন। শিবিরের রাজনীতি করতেন বলে তিনি শিবির নাছির হিসেবেই পরিচিত। বেশ কয়েকটি খুন, অপহরণ, অস্ত্র, চাঁদাবাজিসহ শিবির নাছিরের বিরুদ্ধে মামলা ছিল ৩৬টি। ১৯৯৮ সালের ৯ই এপ্রিল থেকে কারাগারে ছিলেন নাছির। নির্বংশ করা এবং রাস্তায় প্রকাশ্যে খুনের হুমকি-ধমকিতে বাদী ও সাক্ষীরা মামলা থেকে সরে দাঁড়ানোয় খালাস পান বেশিরভাগ মামলায়। আওয়ামী লীগ আমলেই কারাগার থেকে ছাড়া পাওয়ার সুযোগ ছিল। তবে র্যাব ও পুলিশের ক্রসফায়ারের ভয়ে নাছির জামিন আবেদন না করে কারাগারে বসেই আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ করতেন। নাছিরের আইনজীবী মনজুর আহমেদ আনসারীও জামায়াতের রাজনীতিতে সক্রিয়।

চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রাবাসে পুলিশের ওপর নাছিরের হামলার মামলাটির রায় হয় ২০১৭ সালের ৪ঠা অক্টোবর। এতে তার ৫ বছরের সাজা হয়। ২০০৮ সালে অস্ত্র মামলায় ১০ বছরের সাজা হয়। ২০১৫ সালের ২৪শে মার্চ চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ছাত্র সংসদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জমির উদ্দিন হত্যা মামলায় খালাস পান নাছির। ১৯৯৪ সালের ২০শে নভেম্বর জমিরকে গুলি করে হত্যা করেন তিনি। নাজিরহাট কলেজের অধ্যক্ষ বীর মুক্তিযোদ্ধা গোপাল কৃষ্ণ মুহুরি ও হাটহাজারীর চাঞ্চল্যকর তিন খুনের মামলায় খালাস পান নাছির। ২০০১ সালের ১৬ই নভেম্বর সকালে চট্টগ্রামের জামাল খান রোডে অধ্যক্ষ মুহুরির বাসায় ঢুকে অস্ত্রধারী শিবির সন্ত্রাসীরা মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে হত্যা করে। এমন অসংখ্য ভয়ঙ্কর অপরাধের মামলার মাত্র ৩১টি মামলা রেকর্ড হয়েছিল তার বিরুদ্ধে।
শিবিরের পেশাদার অস্ত্রধারী খুনি-সন্ত্রাসী নাছির এতটাই দুর্ধর্ষ ছিল যে, সবসময় অস্ত্র বহন করতেন সাথে। যখন-তখন গুলি চালিয়ে দিতেন। ১৯৯৮ সালে তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান চালালে গুলি চালান, এতে পুলিশের কয়েকজন সদস্য গুলিবিদ্ধ হন। চট্টগ্রাম কলেজের শেরেবাংলা ছাত্রাবাসের সামনে শিক্ষকদের আবাসনের পরিত্যক্ত একটি ভবনের বাইরে থেকে তালা দিয়ে ভেতরে লুকিয়ে ছিলেন নাছির। তৎকালীন নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার আতিকুর রহমান দরজা ভেঙে তাকে গ্রেপ্তার করেন। তখন পুলিশের ওপর হামলা চালান নাছির ও তার সহযোগীরা। ওই ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় নাছির ছাড়াও ইয়াকুব ও হুমায়ন নামে তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা করে পুলিশ। পরে চট্টগ্রামের নাজিরহাটে পুলিশের সঙ্গে ক্রসফায়ারে ইয়াকুব ও হুমায়ন মারা যায়।
গত বছরের আগস্টে রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের পর মুক্ত হন নাছির। বর্তমানে জামায়াতের হয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে শোনা যাচ্ছে।
শিবির নাছিরের হাতে প্রশিক্ষিত বড় সাজ্জাদ
বায়েজিদ বোস্তামী থানার চালিয়াতলী এলাকার আব্দুল গণি কন্ট্রাক্টরের ছেলে সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদ। আলোচনায় আসেন নব্বইয়ের দশকের শুরুতেই। শিবির ক্যাডার হিসেবে পরিচিত সাজ্জাদের বিরুদ্ধে খুনসহ রয়েছে এক ডজন মামলা। যদিও নাছিরের মত ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে একাধিক বিবৃতিতে দাবি করা হয়, সাজ্জাদ শিবিরের কেউ নয়।

একে-৫৬সহ আটক শিবির সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদ
শিবির নাছির গ্রেপ্তারের পর বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ নেন আরেক শিবির ক্যাডার গিট্টু নাছির। তার নির্দেশে ১৯৯৯ সালের ২রা জুন পাঁচলাইশ ওয়ার্ড কাউন্সিলর লিয়াকত আলী খানকে বাড়ির সামনে খুন করে ত্রাস হিসেবে আবির্ভূত হন বড় সাজ্জাদ। মূলত এইট মার্ডারের ঘটনাটি আন্ডারওয়ার্ল্ডে তার ইমেজ বাড়িয়ে দেয়। সাক্ষীর অভাবে ওই মামলা থেকে খালাস পান তিনি। ২০০০ সালের ১২ই জুলাই নগরের বহদ্দারহাটে দিনেদুপুরে ব্রাশফায়ারে মাইক্রোবাসে থাকা ৬ ছাত্রলীগ নেতাকর্মীসহ ৮ জনকে হত্যা করা হয় সাজ্জাদের নেতৃত্বে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৮ সালের ২৭শে মার্চ দেওয়া মামলার রায়ে বড় সাজ্জাদসহ চার জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। হাবিব খানসহ তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
২০০০ সালের ৩রা অক্টোবর বায়েজিদ বোস্তামী থানার চালিয়াতলীতে একে-৫৬ রাইফেলসহ গ্রেপ্তার হন সাজ্জাদ। ২০০৪ সালে বিএনপি-জামায়াত আমলে ছেড়ে দেওয়া হলে সাজ্জাদ দুবাইয়ে পালিয়ে যান। সেখান থেকে দুবাই চলে যান ভারতীয় ভুয়া নাম-পরিচয় সংগ্রহ করে। ভারতে কয়েকটি সন্ত্রাসবাদী ঘটনায় একাধিকবার গ্রেপ্তার হন। তিহার জেলেও ছিলেন অনেকদিন। ভারতে বিয়ে-সংসার করেন। দুবাইয়ে রয়েছে তার মাফিয়া সাম্রাজ্য। তার অধীনে মানি লন্ডারিং এবং সোনা চোরাচালানের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে। যাতে বিএনপি-জামায়াত সরকারের অনেক নেতাকর্মী ছাড়াও চট্টগ্রাম জেলা পর্যায়ের জামায়াত-শিবিরের বেশ কিছু নেতাকর্মী সম্পৃক্ত রয়েছেন। রিয়াজউদ্দিন বাজার এবং টেরি বাজার কেন্দ্রিক হুন্ডি ব্যবসা, সোনা চোরাচালানের এই নেটওয়ার্ক চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডের অন্যতম খুঁটি।
তাকে ধরতে আওয়ামী লীগ আমলে জারি করা ইন্টারপোলে রেড নোটিশ এখনও ঝুলছে। বড় সাজ্জাদ বিদেশে বসে চট্টগ্রাম নগরের পাঁচলাইশ, বায়েজিদ বোস্তামী, চান্দগাঁও এবং হাটহাজারী এলাকার নিয়ন্ত্রণ করছেন। বাবলা হত্যার ঘটনায় সাজ্জাদসহ ৭ জনের নামোল্লেখ করে ২২ জনকে আসামি করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে বড় সাজ্জাদের সাথে তার গুরু শিবির নাছিরের প্রভাব বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে। সন্ত্রাসী ইকরামের সাথে ফাঁস হওয়া এক ফোনালাপে শিবির নাছিরকে আধলা ছুড়ে মেরে ফেলবেন বলে ঠাট্টা করতে শোনা গেছে তাকে।
জেলে বসেও আন্ডারওয়ার্ল্ডের নিয়ন্ত্রণ ছোট সাজ্জাদের
হাটহাজারী থানার শিকারপুর গ্রামের সোনা মিয়া সওদাগর বাড়ির জামালের ছোট ছেলে সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ ওরফে বুড়ির নাতি। তার বিরুদ্ধে খুনসহ এক ডজন মামলা রয়েছে। গত ১৫ই মার্চ ঢাকার বসুন্ধরা সিটি শপিংমল থেকে পুলিশ সাজ্জাদকে গ্রেপ্তার করে। বর্তমানে কারাগারে বসে আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ করছেন সাজ্জাদ। তার গ্যাংয়ের দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীদের মধ্যে রয়েছে- মুন্না, ঢাকাইয়া আকবর, জিসান, জালাল, মোবারক প্রমুখ।

ছোট সাজ্জাদ, শিবির থেকে বিএনপিতে
গত ৩০শে মার্চ রাতে নগরীর বাকলিয়া এক্সেস রোডে প্রাইভেটকারে থাকা মো. বখতিয়ার হোসেন ওরফে মানিক ও আব্দুল্লাহ আল রিফাত নামে দুজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। যার নেপথ্যে ছিলেন ছোট সাজ্জাদ এবং তার ৮নং স্ত্রী শারমিন আক্তার তামান্না। সাজ্জাদকে ধরিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্রে জড়িত সন্দেহে মানিক-রিফাতকে হত্যা করা হয়। ২০০৪ সালে শিবিরের সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদ বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার পর তার উত্তরাধিকারী হন ছোট সাজ্জাদ। বড় সাজ্জাদের স্নেহভাজন এবং তার হাতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছোট সাজ্জাদ। একসময় শিবিরের রাজনীতি করলেও বর্তমানে বিএনপির নেতাদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছোট সাজ্জাদ। বিশেষ করে বিএনপির মীর হেলালের জনসংযোগসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে তাকে পাশে দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন ব্যানারে নিজেকে হাটহাজারীর চিকনদণ্ডি ইউনিয়ন যুবদলের কর্মী বলে প্রচার করেন সাজ্জাদ।
বায়েজিদ, পাঁচলাইশ, চান্দগাঁও এবং হাটহাজারী এলাকায় নতুন বাড়ি নির্মাণ, ব্যবসা, জমি বেচাকেনা করলেই ফোন আসে ছোট সাজ্জাদের। চাঁদা দিতে গড়িমসি করলে হামলা-খুন হয়ে যায়। কুয়াইশ-অক্সিজেন সড়কে যুবলীগ নেতা মো. আনিস ও মাসুদ কায়ছারকে গুলি করে হত্যা করেন সাজ্জাদ। গত ১৮ই সেপ্টেম্বর ৫ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে কালারপুলের নির্মাণাধীন ভবনে গিয়ে প্রকাশ্যে গুলি চালায় সাজ্জাদ। গত ২১শে অক্টোবর চান্দগাঁও থানার অদুরপাড়া এলাকায় মাইক্রোবাসে এসে প্রকাশ্যে গুলি করে আফতাব উদ্দিন তাহসীন নামের এক ব্যবসায়ীকে হত্যা করে। তার বিরুদ্ধে অভিযান চালানোয় ফেসবুক লাইভে এসে ওসিকে কাপড় খুলে পেটানোর হুমকিও দেন শিবিরের সন্ত্রাসী ছোট সাজ্জাদ।
মুখ খোলার আগে গুলি চলে রায়হানের
রাউজানের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের জুরুরকুল খলিফা বাড়ির মৃত বদিউল আলমের ছেলে রায়হান আলম। তিন ভাই এক বোনের মধ্যে রায়হান দ্বিতীয়। সিএমপি’র তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদের অন্যতম সহযোগী। ছোট সাজ্জাদের অবর্তমানে রায়হানই সামলাচ্ছেন সাম্রাজ্য। রায়হানের বিরুদ্ধে খুন, হত্যাচেষ্টা, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগে নগরী ও জেলার বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। গত বছরের ৫ই আগস্টের পর চট্টগ্রাম নগর ও জেলায় জোড়া খুনসহ বিভিন্ন অভিযোগে ১৩টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে হত্যা মামলাই ৬টি।
হত্যাচেষ্টার একটি মামলায় কারাগারে গিয়ে ছোট সাজ্জাদের সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছিল। গত বছরের ৫ই আগস্টের পর রায়হানকে কারাগার থেকে বের করে আনা হয়। ছোট সাজ্জাদের অস্ত্র ভাণ্ডারের নিয়ন্ত্রণ বর্তমানে রায়হানের হাতে। বিএনপিপন্থী শীর্ষ সন্ত্রাসী বাবলাকে মাথার পেছনে পিস্তল ঠেকিয়ে হত্যা এবং বিএনপির প্রার্থী এরশাদ উল্লাহকে গুলিবিদ্ধ করার ঘটনায় তিনি সরাসরি জড়িত। গত ২৫শে অক্টোবর রাউজানে গুলি করে হত্যা করেন যুবদলকর্মী মুহাম্মদ আলমগীর আলমকে। গত বছরের ২১শে সেপ্টেম্বর চান্দগাঁওয়ে ইট-বালু ব্যবসায়ী সাবেক ছাত্রলীগ নেতা তাহসীন হত্যা, গত ২৯শে আগস্ট কুয়াইশে যুবলীগ কর্মী মাসুদ-আনিছ হত্যা, ২৩শে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে সন্ত্রাসী আকবর আলীকে (ঢাকাইয়া আকবর) প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা, ৩০শে মার্চ বাকলিয়া অ্যাক্সেস রোডে প্রাইভেট কারে গুলি করে দুজনকে হত্যাসহ অসংখ্য খুনের ঘটনায় সরাসরি অংশ নেন তিনি।

বাকলিয়া এক্সেস রোডে গুলিতে ঝাঁজরা গাড়ি
ছোট সাজ্জাদের ডানহাত হিসেবে পরিচিত রায়হান। অস্ত্রে বিশেষ পারদর্শিতার কারণে সাজ্জাদের বিশেষ আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন। চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডে বলা হয়, “মুখ চলিবার আগদি গুল্লি চলে রায়হাইন্যার”। গুরু ছোট সাজ্জাদের মতো প্রচন্ড ধুরন্ধর রায়হান। কখন কোথায় থাকেন, তার সঙ্গীরাও জানেন না। তাকে ধরতে একাধিক অভিযান চালিয়েও ব্যর্থ হয় পুলিশ। রাউজান ও ফটিকছড়ির পাহাড়ি এলাকায় আস্তানা রয়েছে তার। সেখান থেকে বেরিয়ে এসে অপরাধ করে আবার দ্রুত ফিরে যান।
কুখ্যাত রাজাকার সাকাচৌর ডানহাত শীর্ষ সন্ত্রাসী বিধান বড়ুয়া আবারও সক্রিয়
চট্টগ্রামের কুখ্যাত রাজাকার সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীর ডানহাত খ্যাত বিধান বড়ুয়া আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছেন ভয়ঙ্কররূপে। রাউজানের পূর্ব গুজরা আঁধারমানিক বড়ুয়া পাড়া গ্রামের মৃত হিমাংশু বড়ুয়ার তিন ছেলের মধ্যে ছোট বিধান। ১৯৯৩ সালে পূর্ব গুজরা ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা আকতার হোসেন রাজুকে হত্যার মধ্যে দিয়ে আলোচনায় আসেন বিধান। তার হাতে রাউজানসহ চট্টগ্রামের অন্তত ৪০ জন খুন হয়েছেন বলে বিভিন্ন তথ্য রয়েছে।
বলা হয়, এমন কোনো অস্ত্র নেই, যা তিনি চালাতে পারেন না। এমনকি তার নিশানাও ঈর্ষণীয়। ৮০’র দশক থেকে সাকা চৌধুরীর হয়ে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটিয়ে আসছেন তিনি। এমনকি বিএনপির নেতাকর্মীরাও তার হাতে খুন হয়েছেন। বেশ কয়েকবার কারাবরণ করেন বিধান। মাঝে বেশ কিছুদিন নীরব থাকার পর বর্তমানে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন সাকা চৌধুরীর পুত্র হুম্মাম কাদের (হুকা) চৌধুরীর হাত ধরে। বর্তমানে গড়ে তুলেছেন অন্তত অর্ধশত সদস্যের এক সশস্ত্র বাহিনী।
গত বছরের ৫ই আগস্টের পর রাউজান উপজেলায় একের পর এক হত্যাসহ রাজনৈতিক সংঘর্ষের মূলে তার বাহিনীর সম্পৃক্ততা পেয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এইট মার্ডারের অন্যতম আসামি হাবিব বিদেশ থেকে নাড়েন কলকাঠি
বহদ্দারহাটের এইট মার্ডারের অন্যতম হোতা শিবিরের শীর্ষ সন্ত্রাসী হাবিব খান মাঝে বেশ কয়েক বছর চুপচাপ থাকলেও সম্প্রতি সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। বায়েজিদ, পাঁচলাইশ, চান্দগাঁও, বাকলিয়া ও হাটহাজারী উপজেলায় চাঁদাবাজিসহ বেশ কিছু অপরাধের ঘটনায় উঠে এসেছে তার নাম। হাবিব খান বিদেশে বসেই তার অনুসারীদের দিয়ে চাঁদাবাজি ও অপরাধ জগত নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। তার বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সিনিয়র সহসভাপতি আলী মর্তুজা চৌধুরী, এইট মার্ডারসহ ১০টি হত্যা মামলা রয়েছে।
বিএনপি নেতাদের আস্থার ভরসা সন্ত্রাসী মেজর ইকবাল
রাউজান উপজেলার আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী ইকবাল হোসেন ওরফে মেজর ইকবাল। রাউজান বিএনপির গিয়াসউদ্দিন কাদের (গিকা) চৌধুরী পরিবারের প্রতিপক্ষ বিএনপির আরেকটি পক্ষের হয়ে খুন-খারাবি চালিয়ে যাচ্ছেন ইকবাল।
চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ফখরুদ্দিন মোহাম্মদ বাবর ও রাউজান কলেজ ছাত্র সংসদের সহসভাপতি (ভিপি) মজিবুর রহমানকে কুপিয়ে হত্যা করা হয় ১৯৮৯ সালে। এসব খুনের ঘটনার মধ্য দিয়ে আলোচনায় আসেন ইকবাল। ১৯৯৩ সালে পূর্ব গুজরা ইউপি চেয়ারম্যান রাজুকে ব্রাশফায়ারে হত্যার প্রধান আসামি এই ইকবাল। রাউজানে ছাত্রলীগ কর্মী দুই ভাই টিটু ও মিঠুর জোড়া খুন, বীর মুক্তিযোদ্ধা নিহার কান্তি বিশ্বাস হত্যা, ইকবাল ও জামিল নামে দুই আওয়ামী লীগের কর্মীকে হত্যাসহ ১৫ মামলার আসামি ইকবাল। এসব মামলায় জেলও খেটেছেন বেশ কয়েক বছর। বর্তমানে অনুসারীদের সামনে রেখে আড়াল থেকে গ্যাং পরিচালনা করছেন তিনি।
কন্ট্রাক্ট কিলিংয়ে দক্ষ ইমন
ফটিকছড়ির বাসিন্দা মোবারক হোসেন ইমন আন্ডারওয়ার্ল্ডে অভিজ্ঞ শুটার হিসেবে পরিচিত। তাকে কন্ট্রাক্ট কিলারও বলা হয়। সেও শিবিরের সন্ত্রাসী ছোট সাজ্জাদের সহযোগী হিসেবে পরিচিত। তার বিরুদ্ধে রয়েছে খুনসহ ৯টি মামলা।
মুখোশধারী শ্যুটার শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমু
রাউজানের হরিষখান এলাকার মৃত বজল আহাম্মদের ছেলে শীর্ষ সন্ত্রাসী আজিজ উদ্দিন ইমু। তার নেতৃত্বে রয়েছে দক্ষ শ্যুটার সম্বলিত সন্ত্রাসী বাহিনী। রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, হাটহাজারী সংলগ্ন এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে তারা। ১৪ মামলার আসামি ইমু বিএনপির রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত। ২০১৫ সালে রাউজান রাঙামাটি সড়কের চারাবটতল এলাকায় মুখোশ পরে যুবলীগ কর্মী শহিদুল আলমকে ফিল্মি কায়দায় মাইক্রোবাস থেকে নেমে গুলি করে হত্যা করেন। এ মামলার ১ নম্বর আসামি ইমু। সে থেকে তিনি মুখোশধারী হিসেবে পরিচিত।
ভইঙ্গা বুইস্যাও চট্টগ্রামের ত্রাস
চট্টগ্রামের স্থানীয়রা বহিরাগতদের ‘ভইঙ্গা’ বলে ডাকেন। ভোলার দৌলতখান উপজেলার মোহাম্মদ আলীর ছেলে শহীদুল ইসলাম ওরফে বুইস্যাও ভইঙ্গা হিসেবে পরিচিত। চট্টগ্রাম নগরের পশ্চিম ষোলশহর এলাকায় থাকেন। পড়াশোনা করেছেন তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত। যুবদলের রাজনীতিতে সক্রিয় বুইস্যা চান্দগাঁও-পাঁচলাইশ এলাকার ত্রাস। তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ছিনতাই, অস্ত্র, মাদকসহ ২০টি মামলা রয়েছে। চাঁদা আদায় ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারে কথায় কথায় প্রকাশ্যে গুলি ছোড়ে। তার রয়েছে নিজস্ব আয়নাঘর। চাঁদা না দিলে তাদের আয়নাঘরে নিয়ে নির্যাতন করা হয়।
ফজল হক- বিদেশ থেকে চালাচ্ছেন নেটওয়ার্ক
নোয়াপাড়ার ফজল হক বিএনপি-জামায়াত শাসনামলে ত্রাসের জনপদ রাউজানসহ চট্টগ্রামের ত্রাস সৃষ্টি করেন ফজল হক বাহিনী দিয়ে। প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া, কন্ট্রাক্ট কিলিংসহ অপহরণ বাণিজ্য ছিল তার বাহিনীর কাজ। রাউজানের আওয়ামী লীগ নেতাকে ইকবাল ও জামিলকে প্রকাশ্যে হত্যা করেন তিনি। বর্তমানে বিদেশ থেকে পরিচালনা করছেন নেটওয়ার্ক। বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় ফজল হক গত বছরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আরও বেপরোয়া। এলাকায় তার ভাই জানে আলমসহ বাহিনীর একাধিক সদস্য তার হয়ে গ্যাং পরিচালনা করছেন।
টেম্পু ইসমাইল- টেম্পু চালকের সহকারী থেকে শীর্ষ সন্ত্রাসী
লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার ইউসুফের ছেলে ইসমাইল হোসেন টেম্পু। চার ভাইয়ের মধ্যে তৃতীয়। ছোটবেলা থেকে বড় হয়েছেন চান্দগাঁও থানাধীন পশ্চিম ফরিদাপাড়া এলাকায়। বর্তমানে পরিবার নিয়ে থাকেন বায়েজিদ বোস্তামী থানার সাংবাদিক হাউজিং সোসাইটি এলাকায়। একসময় টেম্পু চালকের সহকারী হিসেবে কাজ করতেন, পরে বিএনপি-জামায়াত শাসনামলে বহদ্দারহাট বাজারে মাছ কাটার কাজ করতেন, আবার রাত হলে মাদক ব্যবসা, চুরি-ছিনতাই করতেন। পরে গড়ে তোলেন টেম্পু বাহিনী। পুরো নগরজুড়ে সক্রিয় তার গ্যাং। হত্যা, ছিনতাই, চাঁদাবাজিসহ অন্তত ৩০টি মামলার আসামি। বর্তমানে টেম্পু ইসমাইল কারাগারে থাকলেও অনুগতরা চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন গ্যাং।
বাড়ছে বিদেশি অস্ত্রের মজুদ
আন্ডারওয়ার্ল্ড সম্পৃক্ত একাধিক সূত্র বিডি ডাইজেস্ট-এর প্রতিবেদকের সাথে আলাপে জানিয়েছে চট্টগ্রামে গত দেড় বছরে যেসব ভারী অস্ত্র ঢুকেছে, তার মধ্যে রয়েছে অন্তত ১৩টি একে-৪৭ রাইফেল এবং ২২-২৫টি জি-৩ রাইফেল। এর মধ্যে ৬টি একে-৪৭ রয়েছে শিবির নাছিরের নিয়ন্ত্রণে। সূত্র মতে, এসব একে-৪৭ চট্টগ্রাম মহানগরের একাধিক অজ্ঞাত স্থান এবং দুটি উপজেলায় বিশ্বস্তদের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। অন্তত দুটি একে-৪৭ রয়েছে বিএনপির প্রয়াত নেতা মীর নাসিরের পুত্র- দলের কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও চট্টগ্রাম-৫ আসনের মনোনীত প্রার্থী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের নিয়ন্ত্রণে। যার একটি তিনি তার গাড়িতে বহন করেন বলে ঘনিষ্ঠ সূত্রের ভাষ্য। বিএনপির প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর জনসংযোগে গুলির ঘটনার পর থেকে মীর হেলাল এখন সশস্ত্র দেহরক্ষী ছাড়া বের হন না কোথাও।
কুখ্যাত রাজাকার সাকা চৌধুরীর পুত্র হুকা চৌধুরীর সংগ্রহে রয়েছে একে-৪৭ এবং জি-৩ রাইফেলসহ হালকা ও ভারী অস্ত্রের বড় একটি মজুদ। যা তত্ত্বাবধান করেন সাকার ডানহাত খ্যাত শীর্ষ সন্ত্রাসী বিধান বড়ুয়াসহ আরও কয়েকজন।
আন্ডারওয়ার্ল্ড সূত্র মতে, চট্টগ্রাম মহানগরের চকবাজার, বাকলিয়া, ফটিকছড়ি, রাউজানসহ কয়েকটি এলাকার বিএনপি-জামায়াতের নেতৃবৃন্দের নিজস্ব সন্ত্রাসী বাহিনীর হাতে রয়েছে বেশ কিছু একে-৪৭ রাইফেল। জি-৩ রাইফেলগুলোর বেশিরভাগই রয়েছে চট্টগ্রাম কলেজ, মহসীন কলেজ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের হোস্টেল এবং নগরের শিবির নেতাদের কাছে। দল-মত নির্বিশেষে কয়েকজন অস্ত্র ব্যবসায়ী এসব অস্ত্র সরবরাহে কাজ করেন বলে তথ্য রয়েছে। তারা শুধু অস্ত্রই সরবরাহ করেন না, বিভিন্ন শ্রেণির গুলি চাহিবামাত্র নির্দিষ্ট পয়েন্টে পৌঁছে দেন। বিভিন্ন ক্যালিবারের পিস্তলের গুলি, শটগান ও দেশিয় বন্দুকের বিভিন্ন শ্রেণির কার্তুজ- এমনকি ভারী অস্ত্রের গুলিও তাদের কাছে সহজলভ্য।
কী বলছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী
অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডে দেশি-বিদেশি অস্ত্রের যে জোয়ার দেখা যাচ্ছে, তাতে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংঘাত হতে পারে ভয়াবহ। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন তারা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছেন। মাঝে মাঝে অস্ত্র উদ্ধারও করছেন। তবে তাদের তৎপরতা পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করছেন নগরবাসী।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার না হলে এগুলো নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারে ব্যবহার হতে পারে। এতে নির্বাচনী পরিবেশ বাধাগ্রস্ত হবে।
তথ্য বলছে, গত জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সিএমপি, জেলা পুলিশ ও র্যাব মিলে চট্টগ্রাম থেকে ১৪৫টি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করেছে।
পুলিশ স্বীকার করেছে, চট্টগ্রামে অবৈধ অস্ত্র ব্যবহারে অপরাধ বাড়ছে। তবে এও স্বীকার করতে বাধ্য হলেন নগর পুলিশের কর্মকর্তারা- শীর্ষ সন্ত্রাসীদের হাতে নিহতের ঘটনাগুলোয় ব্যবহৃত বেশিরভাগ অস্ত্রই উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি বলে। বিদেশি অস্ত্রগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে বড় বড় অপরাধের ক্ষেত্রে।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিবি ও শিল্পাঞ্চল) ও মুখপাত্র মো. রাসেল বলেন, আমরা অভিযান চালিয়ে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করছি। যার বেশিরভাগই স্থানীয়ভাবে তৈরি।
র্যাব-৭-এর সহকারী পরিচালক (মিডিয়া) এ আর এম মোজাফফর হোসেন বলেন, চট্টগ্রামে দেশিয় আগ্নেয়াস্ত্র অনেকেই তৈরি করে। তথ্য পেলে আমরা অভিযান চালাই। সাধারণত উপকূলীয় এলাকায় তৈরি হচ্ছে। তবে আমাদের অভিযান চলছে। আশা করি দ্রুত অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।



