সমরাঙ্গন
সম্প্রতি জনৈক ব্যক্তি টকশো সহ বিভিন্ন জায়গায় দাবী করে যাচ্ছেন যে, ১৯৭১ এর যুদ্ধে পাকিস্তান আর্মি কেবল ভারতীয় বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে, এখানে বাংলাদেশের কোনো স্টেক নেই। উনার রাজনৈতিক পরিচয় আমার কাছে অত মুখ্য নয়, এসব প্রচারণার পেছনের কারন কোন জ্বালা মিটানো সেটাও আমার আজকের আলোচনার বিষয়বস্তু না। তবে না জেনে অনেকে এতে বিভ্রান্ত হচ্ছে, তাই কিছু ব্যাপার ক্লিয়ার করা প্রয়োজন বলেই মনে করছি।
প্রশ্ন : সারেন্ডার কি শুধু ভারতীয় বাহিনীর কাছে হয়েছিলো?
না। যদিও পাকিস্তান আর্মি তাই চেয়েছিলো। কারন তারা একটা রেগুলার ফোর্স হয়ে মুক্তিবাহিনীর মত গেরিলা বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করার লজ্জা নিতে চায়নি, তাছাড়া মুক্তিবাহিনী জেনেভা কনভেশনে সই করেনি। পাকিস্তান আর্মি যা অত্যাচার করেছে, তারা ভেবেছিলো মুক্তিবাহিনী তার ভয়ানক নিবে প্রতিশোধ। তবে পাকসেনাদের সে আকাঙ্খা মানা হয়নি৷ পাকিস্তান আর্মি সারেন্ডার করে যৌথবাহিনীর কাছে। যৌথবাহিনী ভারতীয় বাহিনী ও বাংলাদেশী বাহিনীর যৌথ কমান্ড ছিলো, যার কমান্ডার ছিলেন লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা৷ তাই পাকিস্তান আর্মি সারেন্ডার করলে যৌথবাহিনীর পক্ষ থেকে অরোরা এবং পাকিস্তান আর্মির পক্ষ থেকে নিয়াজী সই করেন।
টকশোতে ভদ্রলোক দাবী করেছেন, সারেন্ডার এর দলিলে নাকি কেবল ইন্ডিয়া লেখা আছে। উনাকে পর্যাপ্ত পরিমান ভিটামিন এ খাওয়ার পরামর্শ দিবো, উনার চোখ নিতান্ত দূর্বল। আত্মসমর্পণ এর দলিল এ খুব স্পষ্টভাবে লেখা আছে, এই আত্মসমর্পণ করা হচ্ছে কমান্ডার অরোরার নিকট, যিনি ইস্টার্ন থিয়েটার এ ইন্ডিয়ান ফোর্সেস ও ” বাংলা দেশ ফোর্সেস ” এর কমান্ডার। যৌথবাহিনীর কমান্ডার হিসেবে উনি একই সাথে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর কমান্ডার ছিলেন।
আত্মসমর্পণ এর দলিল :
https://liberationwarbangladesh.org/wp-content/uploads/2022/12/পাকিস্তানের-আত্মসমর্পণের-দলিল.webp
প্রশ্ন: তাহলে জেনারেল ওসমানী কেন আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন না?
এর উত্তর দিয়ে গেছেন জেনারেল ওসমানী নিজেই। উনি বাংলাদেশের সেনাপ্রধান, উনার উঠাবসা হবে পাকিস্তান এর সেনাপ্রধান অথবা ভারতের সেনাপ্রধান এর সাথে। উনি একটা আঞ্চলিক কমান্ডার এর সাথে একই টেবিলে বসতে পারেন না। আপনাদের বুঝতে হবে এইখানে অরোরা ও নিয়াজী, দুইজন ই আঞ্চলিক ইস্টার্ন কমান্ডের কমান্ডার, সেনাপ্রধান নন। জেনারেল ওসমানীর নিজের ভাষ্যমতে,
❝ আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে জেনারেল মানেকশকে রিপ্রেজেন্ট করবেন লে.জে অরোরা। জেনারেল মানেকশ গেলে তার সঙ্গে যাওয়ার প্রশ্ন উঠতো। সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে আমার অবস্থান জেনারেল মানেকশর সমান। সেখানে তার অধীনস্থ আঞ্চলিক বাহিনীর প্রধান জেনারেল অরোরার সফরসঙ্গী আমি হতে পারি না। এটা দেমাগের কথা নয়। এটা প্রটোকলের ব্যাপার। আমি দুঃখিত, আমাকে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। আমাদের মধ্যে আত্মমর্যাদাবোধের বড় অভাব। ❞
তাহলে কি উক্ত অনুষ্ঠানে বাংলাদেশী ফোর্সের রিপ্রেজেন্টেশন ছিলো না? অবশ্যই ছিলো। ফোর্সের ঢাকা অভিযানে অংশ নেওয়া সকল কমান্ডার রা ছিলেন। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ.কে খন্দকার ছিলেন, যিনি তৎকালীন সকল বাংলাদেশী অফিসারদের মধ্যে সবচেয়ে হাইয়েস্ট র্যাংকের অফিসার।
প্রশ্ন : তাহলে আত্মসমর্পণ এর দলিল ভারত নিয়ে গেলো কেন?
এ হচ্ছে মূর্খতা কিংবা জেনেবুঝে মিথ্যাচার৷ আত্মসমর্পণ এর দলিল কখনো একটা হয়না, যে কয়টা পক্ষ থাকে, সে কয়টা হয়। এজন্যই ১৯৭১ এর আত্মসমর্পণ এর দলিল তিনটা। একটা আছে পাকিস্তান এর কাছে, একটা ভারতের দিল্লীতে, আরেকটা শাহবাগের জাতীয় জাদুঘরে। কমেন্টে তিনটি আলাদা দলিলে সই করার ছবি দিয়ে দিবো। এখন আমার পাল্টা প্রশ্ন, যদি আত্মসমর্পণ এর সময় বাংলাদেশ কোনো পক্ষ না হয়ে থাকে, তাহলে বাংলাদেশের জন্য একটি দলিল তৈরি ও সই করা হলো কেন?
প্রশ্ন : যুদ্ধবন্দী সবাইকে ভারত নিয়ে গেল কেন?
আত্মসমর্পণ এর দলিলে পাকিস্তানী যুদ্ধবন্দীদের আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী ট্রিট করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। মুক্তিবাহিনী জেনেভা কনভেশনে সই করেনি, তাই জেনেভা কনভেশন মেনে যুদ্ধবন্দীদের ট্রিট করা কেবল রেগুলার ফোর্স এর পক্ষেই সম্ভব ছিলো। আর তাছাড়া তৎকালীন অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটেও তা সম্ভব ছিলো না। পাকিস্তান ও আসলে এই ভয়েই সারেন্ডার করেছিলো আগেভাগে, তা পরে কোনো পোস্টে আলোচনা করবো।
১৯৭১ নিয়ে যাদের এখনো মনে হাহাকার হয়, তারা নিজ জ্বালা মেটাতে নানান প্রোপাগাণ্ডা ছড়াতেই পারে, তবে এগুলো খুব বেশিক্ষন ধোপে টিকবে না। স্রেফ উড়ে যাবে।
