নয়াদিল্লিতে রাশিয়া ও ভারতের শীর্ষ নেতৃত্ব শুক্রবার দু’দেশের দীর্ঘদিনের অংশীদারিত্বকে আরও দৃঢ় করার বার্তা দিলেন। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, যুক্তরাষ্ট্রের বর্ধিত শুল্ক এবং ইউক্রেন যুদ্ধের সমাপ্তি নিয়ে চলমান কূটনৈতিক চাপ—সবকিছুর মাঝেও তারা স্পষ্ট করে দিলেন যে মস্কো-দিল্লি সম্পর্ক ভাঙার নয়।
দুই দেশের বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন মুখোমুখি আলোচনায় জানান, সম্পর্ককে শুধু জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা শিল্পেই সীমাবদ্ধ না রেখে আরও বিস্তৃত পরিসরে নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা রয়েছে তাদের।
পুতিনের আগমনে এবার নিয়ম ভেঙে নিজে বিমানবন্দরে হাজির হন প্রধানমন্ত্রী মোদি। সেখান থেকেই দু’নেতা এক গাড়িতে মোদির বাসভবনে রাতের খাবারের উদ্দেশ্যে রওনা হন—যা দুই দেশের “অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের প্রতীক” হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শুক্রবার বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা বাড়াতে একাধিক সমঝোতা স্মারক সই হয়। শক্তি, কৃষি, ওষুধ, শিপিং থেকে শুরু করে কর্মসংস্থান—বিভিন্ন বিষয়ে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার নতুন নকশা তুলে ধরা হয়। মোদি জানান, ২০৩০ সাল পর্যন্ত অর্থনৈতিক সহযোগিতা কর্মসূচির অধীনে দুই দেশ ১০০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য লক্ষ্যে এগোবে।
এ সময় পুতিন বলেন, ভারতকে রাশিয়া “নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ” দিতে প্রস্তুত। রাশিয়ার তেল কেনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিরূপ মনোভাব ও অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ ভারতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ালেও দিল্লি তাদের অবস্থান থেকে সরে আসবে না বলে ইঙ্গিত দিয়েছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, দুই দেশের ঘোষিত চুক্তিগুলোর চেয়ে বড় বার্তা হলো আন্তর্জাতিক চাপ উপেক্ষা করে যৌথ সম্পর্ক বজায় রাখার দৃঢ় সংকল্প।
ওবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ভূরাজনীতি বিশ্লেষক হর্ষ পন্ত বলেন, “এই শীর্ষ বৈঠকের মূল বার্তা—দুই দেশের কেউই সম্পর্ক হ্রাস করার পক্ষে নয়।” একইসঙ্গে তিনি বলেন, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যকে সময়োপযোগী করতে তা জ্বালানি ও প্রতিরক্ষার বাইরে নিয়ে যেতে হবে।
ইম্যাজইন্ডিয়া ইনস্টিটিউটের রবীন্দর সাচদেভ মনে করেন, দুই দেশ এবার সম্পর্ককে আরও ‘টার্বোচার্জ’ করতে চায়—সরকারি পর্যায়ের বাইরেও জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর তারা জোর দিচ্ছে।
পুতিন জানান, ভারত-রাশিয়া সহযোগিতা এখন আরও গভীর হবে এবং ব্রিকসসহ বহুপাক্ষিক প্ল্যাটফর্মে তারা ‘ন্যায়সঙ্গত বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা’ গড়ে তুলতে চায়।
পুতিনের ৩০ ঘণ্টার ভারত সফর পশ্চিমা বিশ্বকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে রাশিয়া এখনো বড় অংশীদারদের সমর্থন পাচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধে শান্তিচুক্তির জন্য ভারতের ওপর পশ্চিমাদের চাপ থাকলেও মোদি প্রকাশ্যে এমন কোনও আহ্বান জানাননি।
তবে তিনি জানান, ভারত শুরু থেকেই শান্তির পক্ষে এবং বর্তমান পরিস্থিতি ‘যুদ্ধের সময় নয়’—এই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। পুতিন কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, সামরিক প্রযুক্তি, মহাকাশ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশ এগিয়ে যেতে চায়।
বর্তমানে ভারত মার্কিন শুল্ক চাপ ও ইউক্রেন যুদ্ধজনিত বৈশ্বিক রাজনীতির জটিলতার মাঝে সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করছে। যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ করে, ভারত সস্তায় রুশ তেল কিনে পরোক্ষভাবে যুদ্ধকে টিকিয়ে রাখছে।
যদিও রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের ঐতিহাসিক সম্পর্ক ও সামরিক নির্ভরতা দেশটিকে মস্কোর কাছাকাছি রেখেছে। সাম্প্রতিক ভারত-পাকিস্তান চারদিনের সংঘর্ষে রুশ এস–৪০০ ও সুখোই এমকেআই ব্যবহারে তা আবার স্পষ্ট হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের চাপ যত বাড়বে, দিল্লির কাছে রাশিয়ার গুরুত্ব তত বাড়বে।
পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও জ্বালানি সহযোগিতা “মূলত অক্ষত” রয়েছে বলে জানান পুতিন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকেও রুশ পারমাণবিক জ্বালানি কেনার কথা উল্লেখ করে প্রশ্ন তোলেন—তাহলে ভারতে কেন হবে না?
তবে ভারতীয় রপ্তানি এখনো মাত্র ৫ বিলিয়ন ডলারের মতো, ফলে দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি ৬৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ভারত রুশ তেল আমদানি মূল্য ও পরিমাণ উভয়দিকেই কিছুটা কমালেও রাশিয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী ভারতের মোট আমদানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জুড়ে রয়েছে।
রাশিয়ার নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন্দ্রেই বেলোসভ দিল্লিতে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে জানান, ভারতকে প্রতিরক্ষা উৎপাদনে স্বনির্ভর হতে মস্কো প্রস্তুত। বাণিজ্যে নতুন দিগন্ত হিসেবে রাশিয়া ভারত থেকে মাংস ও মৎস্যজাত পণ্য আমদানির আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন ইস্যুর সমাধান হলে রাশিয়ার ওপর চাপ কমবে এবং ভারত দ্রুত সুযোগ নিয়ে রপ্তানি ও ব্যবসা সম্প্রসারণে এগোতে পারবে।
সাচদেভ বলেন, শান্তি প্রতিষ্ঠা হলে ভারতই প্রথম দৌড়ে এগোতে চাইবে—পশ্চিমারা তখনও ক্রমে রাশিয়ার বাজারে ফিরবে, আর ভারত সেই প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে চায়।
