স্থপতি ফ্র্যাঙ্ক গেরি আর নেই: আধুনিক স্থাপত্যে ভাস্কর্যধর্মী নকশার পথিকৃতের জীবনাবসান

স্থপতি ফ্র্যাঙ্ক গেরি আর নেই: আধুনিক স্থাপত্যে ভাস্কর্যধর্মী নকশার পথিকৃতের জীবনাবসান
শেয়ার করুন

বিশ্বজোড়া খ্যাতিমান স্থপতি ফ্র্যাঙ্ক গেরি আর নেই। শুক্রবার সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা মনিকায় নিজের বাসভবনে ৯৬ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। সাম্প্রতিক শ্বাসযন্ত্রজনিত অসুস্থতার পর তার মৃত্যু হয় বলে জানায় তার প্রতিষ্ঠান গেরি পার্টনার্স এলএলপি।

গেরি সেইসব স্থপতিদের একজন, যাঁদের কাজ আধুনিক স্থাপত্যকে নতুন দিশা দিয়েছে। পপ আর্টের সঙ্গে স্থাপত্যশৈলীর মেলবন্ধন ঘটিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন অসংখ্য প্রতীকী স্থাপনা— যেমন স্পেনের বিলবাও শহরের গুগেনহাইম মিউজিয়াম, লস অ্যাঞ্জেলেসের ওয়াল্ট ডিজনি কনসার্ট হল, এবং বার্লিনের ডিজেড ব্যাংক বিল্ডিং।

এছাড়া মার্ক জাকারবার্গের অনুরোধে ফেসবুকের নর্দার্ন ক্যালিফোর্নিয়া ক্যাম্পাস সম্প্রসারণের নকশাও করেছিলেন তিনি।

কিংবদন্তি এই স্থপতি পেয়েছেন বিশ্বের প্রায় সব শীর্ষ স্থাপত্য পুরস্কার, যার মধ্যে রয়েছে স্থাপত্যের নোবেলখ্যাত প্রিটজকার প্রাইজ। পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের রয়্যাল ইনস্টিটিউট অব ব্রিটিশ আর্কিটেক্টসের স্বর্ণপদক, আমেরিকানস ফর দ্য আর্টসের আজীবন সম্মাননা এবং মাতৃভূমি কানাডার সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক— কম্প্যানিয়ন অব দ্য অর্ডার অব কানাডা।

আধুনিক স্থাপত্যের প্রতীক হয়ে ওঠার আগে তার প্রথমদিকের সাধারণ প্রকল্পগুলোও এখন নতুনভাবে মূল্যায়িত। ২০০৬ সালে সান্তা মনিকার একটি শপিং মল ভেঙে ফেলার পরিকল্পনার খবর ছড়িয়ে পড়লে অনেকেই বিরক্ত হলেও গেরি মজা করে বলেছিলেন, “এবার তারা আমার প্রথম নকশার মতোই কিছু বানাবে!”

বয়স আশির কোঠা ছাড়িয়েও তিনি থেমে যাননি। নিউইয়র্কের চেলসিতে আইএসি বিল্ডিং, পরের বছর লোয়ার ম্যানহাটনে ৭৬ তলা নিউ ইয়র্ক বাই গেরি— এসব প্রকল্প নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায় তার সৃষ্টিশীলতা। তিনি সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপত্যের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন, পাশাপাশি ইয়েল ও কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়েও শিক্ষকতা করেন।

গেরির স্থাপত্যশৈলী নিয়ে আলোচনা যেমন ছিল, সমালোচনাও ছিল প্রবল। কেউ কেউ তার কাজকে পর্যটনকেন্দ্রিক বলে আখ্যায়িত করেছেন, আবার কেউ তুলনা করেছেন শিশুকালের কাঠের টুকরো দিয়ে গড়া খেলাঘরের সঙ্গে।

ডিসনি কনসার্ট হলের নকশা নিয়েও বিতর্ক ছিল— অনেকে বলেছিলেন, এটি ভেজা কার্ডবোর্ডের বাক্সের মতো দেখায়। যুক্তরাষ্ট্রের ৩৪তম প্রেসিডেন্ট ডুইট আইজেনহাওয়ারের স্মারক ডিজাইন নিয়েও তার সঙ্গে আইজেনহাওয়ার পরিবারের মতবিরোধ তৈরি হয়েছিল।

তবে এসব সমালোচনায় গেরি বিচলিত হতেন না। বরং তিনি কখনও কখনও তা রসিকতার সঙ্গেই মেনে নিতেন। ২০০৫ সালে দ্য সিম্পসনস কার্টুনে নিজের ভূমিকায় অভিনয় করে তিনি দেখিয়েছিলেন কীভাবে একটা ভাঁজ করা কাগজ থেকেও নকশার ধারণা জন্ম নিতে পারে।

১৯২৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি কানাডার টরন্টোতে জন্ম নেওয়া ফ্র্যাঙ্ক গেরির আসল নাম ছিল এফ্রেইম ওয়েন গোল্ডবার্গ। ১৯৪৭ সালে পরিবারসহ তিনি লস অ্যাঞ্জেলেসে চলে আসেন এবং পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। প্রথম স্ত্রীর পরামর্শেই পেশাগত জীবনে তিনি নাম পরিবর্তন করেন।

শিশুকাল থেকেই আঁকাআঁকির প্রতি ঝোঁক থাকলেও স্থাপত্য পেশা বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত আসে কেবল বিশ বছর বয়সে, যখন কলেজের এক শিক্ষক তার প্রতিভা চিনতে পারেন। এরপর তিনি সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থাপত্যে ডিগ্রি এবং হার্ভার্ড থেকে নগর পরিকল্পনায় উচ্চতর শিক্ষা নেন।

গেরির পরিবারে রয়েছেন তার স্ত্রী বার্তা, কন্যা ব্রিনা এবং দুই পুত্র আলেহান্দ্রো ও স্যামুয়েল। তার আরেক কন্যা, লেসলি গেরি ব্রেনার, ২০০৮ সালে ক্যানসারে মারা যান।

স্থাপত্যের আকাশে উজ্জ্বল নক্ষত্র ফ্র্যাঙ্ক গেরি রেখে গেলেন বিস্ময় জাগানো সব ভবন—যেগুলো তার অনন্য কল্পনা ও শিল্পবোধের সাক্ষ্য হয়ে থাকবে বহু প্রজন্ম ধরে।

Visited 4 times, 1 visit(s) today