এনজিওর জন্য বিদেশি অনুদান সহজীকরণ: রাজনীতিতে এনজিওর হস্তক্ষেপ এবং বিপন্ন সার্বভৌমত্ব

এনজিওর জন্য বিদেশি অনুদান সহজীকরণ: রাজনীতিতে এনজিওর হস্তক্ষেপ এবং বিপন্ন সার্বভৌমত্ব
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের সভাপতিত্বে উপদেষ্টা পরিষদের সাম্প্রতিক বৈঠকে ‘বিদেশি দান (স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম) নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

এই সংশোধনের মাধ্যমে এনজিওসহ বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর বিদেশি অনুদান গ্রহণ ও ব্যবহারের নিয়ম সহজতর করা হয়েছে। এনজিও রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া সরলীকৃত, অনুদান মুক্তির শর্তাবলী শিথিল এবং বার্ষিক ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত দানের জন্য অনুমোদনের প্রয়োজনীয়তা রহিত করা হয়েছে। সরকারের দাবি, এটি এনজিওগুলোকে আরও অংশগ্রহণমূলক ও স্টেকহোল্ডার-বান্ধব করে তুলবে।

কিন্তু এই সহজীকরণের আলোয় বিদেশি অনুদানের মাধ্যমে দেশের রাজনীতি ও সার্বভৌমত্বের ওপর প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কা উঠে এসেছে। বিশেষ করে ইউএসএইড এবং ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশনের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর অর্থায়নের ইতিহাস দেখলে এই উদ্বেগগুলো আরও স্পষ্ট হয়।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই আইনের ফলে বিদেশি শক্তির অদৃশ্য হস্তক্ষেপ বাড়তে পারে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে প্রভাবিত করে সার্বভৌমত্বের ক্ষয় ঘটাতে পারে। নিচে এই আশঙ্কাগুলোর বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হলো।

ইউএসএইডের অর্থায়ন: রাজনৈতিক অস্থিরতা ও রেজিম চেঞ্জের অভিযোগ

ইউএসএইড, যুক্তরাষ্ট্রের উন্নয়ন সহায়তা সংস্থা, বাংলাদেশে এনজিওগুলোর মাধ্যমে ব্যাপক অর্থ প্রবাহিত করেছে। ২০২১-২০২৪ সালে দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ ১.৮৯ বিলিয়ন ডলার বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, যার বেশিরভাগ এনজিও এবং সুশীল সমাজের বিভিন্ন গোষ্ঠীকে বিতরণ করা হয়েছে। এই অর্থের মাধ্যমে গভর্নেন্স, ডেমোক্রেসি প্রমোশন এবং সিভিক এডুকেশনের প্রকল্প চলে, কিন্তু সমালোচকরা এগুলোকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের হাতিয়ার বলে অভিহিত করেন।

ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই) এবং ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক ইনস্টিটিউট (এনডিআই)-এর ভূমিকা: এই দুই সংস্থা ইউএসএইড এবং ন্যাশনাল এন্ডাউমেন্ট ফর ডেমোক্রেসি (এনইডি)-এর ফান্ডিং-এ চলে।

২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে এরা বাংলাদেশে যুব নেতৃত্ব প্রশিক্ষণ, এনজিও-সহযোগিতা এবং নির্বাচন পর্যবেক্ষণের কাজ শুরু করেছে। ২০১৯-২০ সালে আইআরআই-এর একটি পরিকল্পনায় বিএনপিকে ক্ষমতায় আনার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া, ইউএসএইড-এর ফান্ডে র‍্যাপ গ্রুপগুলোকে উস্কানিমূলক প্রতিবাদী গান তৈরি করে বিক্ষোভ উস্কে দেওয়া হয়েছে।

২০২৪-এর রাজনৈতিক অস্থিরতায় ভূমিকা

আওয়ামী লীগের মন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী অভিযোগ করেছেন যে, ইউএসএইড এবং আইআরআই-এর ফান্ডিং ২০১৮ থেকে আওয়ামী লীগ সরকারকে অস্থিতিশীল করার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। ২০২৪-এর দাঙ্গায় এই অর্থের মাধ্যমে এনজিওগুলোকে সক্রিয় করে শেখ হাসিনার পতন ঘটানো হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট সাবেক কর্মকর্তা মাইক বেঞ্জের বক্তব্য অনুসারে, ইউএসএইড-এর মাধ্যমে মার্কিন নাগরিকদের করের অর্থ ব্যবহার করে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করা হয়েছে।

এমনকি ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ২৯ মিলিয়ন ডলার ইউএসএইড ফান্ড বাতিল করে দিয়েছে, যা রাজনৈতিক ল্যান্ডস্কেপ শক্তিশালী করার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছিল বলে অভিযোগ।

এই অর্থায়নের ফলে এনজিওগুলো রাজনৈতিক দল, সিভিল সোসাইটি এবং মিডিয়াকে প্রভাবিত করে বিদেশি স্বার্থ (যেমন চীনের বেল্ট এন্ড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্পের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতা) সাধন করে। এটি দেশের সার্বভৌমত্বের উপর হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ এনজিওগুলোকে ‘সফট পাওয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশনস (OSF)-এর অর্থায়ন: মানবাধিকারের আড়ালে রাজনৈতিক এজেন্ডা

জর্জ সরোস-প্রতিষ্ঠিত ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশন বিশ্বের বৃহত্তম বেসরকারি অর্থ যোগানদাতা সংস্থা, যা ২০২৩-এ ১.৭ বিলিয়ন ডলার খরচ করেছে। বাংলাদেশে ২০০৪ থেকে মানবাধিকার, শিক্ষা এবং রোহিঙ্গা সংকটে কাজ করে এসেছে।

উদাহরণস্বরূপ, ২০১৭-এ ১০ মিলিয়ন ডলার ব্র্যাক এনজিওর মাধ্যমে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সাহায্যে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সমালোচকরা ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশনের বিরুদ্ধে ‘আদর্শগত বিশেষ এজেন্ডা’ বাস্তবায়নের অভিযোগ করেন।

রাজনৈতিক প্রভাব

ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশন এনজিওগুলোকে অর্থায়ন করে ডেমোক্রেসি প্রমোশন, গভর্নেন্স এবং মাইনরিটি রাইটসের নামে রাজনৈতিক আন্দোলনকে উস্কানি দেয়।

বাংলাদেশে এটি এনজিও নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মিডিয়া ন্যারেটিভ এবং বিরোধিপক্ষকে প্রভাবিত করে। ট্রাম্পের অভিযোগ অনুসারে, ইউএসএইড-এর মাধ্যমে ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশন ২৬০ মিলিয়ন ডলার পেয়েছে, যা বাংলাদেশসহ দেশগুলোতে অস্থিরতা সৃষ্টিতে ব্যবহৃত হয়েছে।

সার্বভৌমত্বের ঝুঁকি

ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশন-এর অর্থায়ন ‘ফ্রিঞ্জ গ্রুপ’ এবং অ্যাডভোকেসি নেটওয়ার্ককে শক্তিশালী করে স্থানীয় সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে চ্যালেঞ্জ করে। হাঙ্গেরি, রাশিয়া এবং ভারতে এর জন্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ হয়েছে। বাংলাদেশে এটি এনজিওগুলোকে ‘বিদেশি গুপ্তচর’ হিসেবে পরিণত করতে পারে, যা জাতীয় সিদ্ধান্তকে বিদেশী এজেন্ডায় আনুগত্যী করে।

ভবিষ্যতে এই আইনের ক্ষতিকর সম্ভাবনা

পূর্ববর্তী আইন (Foreign Donations Regulation Act, ২০১৬) বিদেশী ফান্ডিং-এ কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছিল, যা এনজিওগুলোকে সরকার-নিয়ন্ত্রিত করে রেখেছিল। কিন্তু এখনকার শিথিলতা (যেমন ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত অনুমোদনমুক্ত) এনজিওগুলোকে অসীমিত বিদেশী অর্থ প্রবাহের সুযোগ দেয়, যা নিম্নলিখিত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে:

ঝুঁকির ধরন সম্ভাব্য ক্ষতি উদাহরণ
রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এনজিওগুলো বিদেশী এজেন্ডা (যেমন ডেমোক্রেসি প্রমোশন) অনুসরণ করে নির্বাচন বা আন্দোলনে প্রভাব ফেলতে পারে, যা অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নষ্ট করে। ২০২৬ নির্বাচনে IRI/NDI-এর যুব প্রশিক্ষণ প্রকল্প পোলারাইজেশন বাড়াতে পারে।
সার্বভৌমত্বের ক্ষয় বিদেশী দাতারা (যেমন USAID/OSF) এনজিওকে ‘প্রক্সি’ হিসেবে ব্যবহার করে জাতীয় নীতি (যেমন BRI-এর বিরোধিতা) প্রভাবিত করতে পারে। OSF-এর মাধ্যমে সরোসের নেটওয়ার্ক স্থানীয় সংস্কৃতিকে চ্যালেঞ্জ করে নিও-কলোনিয়ালিজম সৃষ্টি করতে পারে।
অর্থনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা অস্বচ্ছ ফান্ডিং দুর্নীতি বাড়াতে পারে, এবং এনজিওগুলোকে বিদেশী স্বার্থের পক্ষপাতী করে স্থানীয় উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। USAID-এর $২৭০ মিলিয়ন EWMI-কে রাজনৈতিক আউটকাম ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ব্যবহার।
এনজিও স্বাধীনতার ক্ষয় শিথিলতার নামে পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ বাড়তে পারে, যা এনজিওগুলোকে বিদেশী ফান্ডারের ‘ফ্রন্ট’ করে ফেলতে পারে।

পূর্ববর্তী আইনের মতো, এটি সরকার-বিরোধী কণ্ঠকে দমন করতে ব্যবহার হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা সুপারিশ করছেন, অনুদানের স্বচ্ছতা বাড়ানো, নিয়মিত অডিট এবং রাজনৈতিক কার্যক্রমের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এই ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হবে। এই আইন যদি সঠিকভাবে কার্যকর না হয়, তাহলে এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি করতে পারে। সিভিল সোসাইটি এবং সরকারের মধ্যে সংলাপের মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা জরুরি।

Visited 17 times, 1 visit(s) today