ঢাকার দুই বিহারি ক্যাম্পে বিপুল অস্ত্রভাণ্ডার সহিংসতার নতুন মহড়া কার ছত্রছায়ায়?

ঢাকার দুই বিহারি ক্যাম্পে বিপুল অস্ত্রভাণ্ডার সহিংসতার নতুন মহড়া কার ছত্রছায়ায়?
শেয়ার করুন

► দুই ক্যাম্পে আন্ডারওয়ার্ল্ডের রাজত্ব
► সরকারি অস্ত্র প্রকাশ্যে
► প্রতিদিন গ্যাং-ওয়ার—নাশকতার বড় ছক আঁকছে বিএনপিপন্থী সন্ত্রাসীরা
► প্রশ্রয়দাতা বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব

বিশেষ প্রতিবেদন

ঢাকার মিরপুরের জেনেভা ক্যাম্প ও পল্লবী বিহারি ক্যাম্প এখন রাজধানীর নতুন আন্ডারওয়ার্ল্ড হটস্পট। রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে এখানে গড়ে উঠেছে এমন এক সন্ত্রাসী অবকাঠামো, যা আজ রাজধানীর নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় হুমকি। অবৈধ অস্ত্রের মজুত, ককটেল-কারখানা, মাদক ব্যবসা আর প্রতিদিনের গ্যাং–ওয়ার এখন এই দুই ক্যাম্পে নিত্যদিনের চিত্র।

গত বছরের ৫ই আগস্টের একে একে বেরিয়ে আসে বহু শীর্ষ সন্ত্রাসী। তাদের বড় অংশ গিয়ে আশ্রয় নেয় এই দুই বিহারি ক্যাম্পে। স্থানীয় গ্যাংগুলোর সঙ্গে মিলে তারা তৈরি করে নতুন নেটওয়ার্ক। দুই ক্যাম্পই বর্তমানে রাজধানীর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অপরাধঘাঁটি—যেখানে প্রকাশ্যে মজুদ রয়েছে লুট হওয়া সরকারি অস্ত্র, সক্রিয় রয়েছে ককটেল তৈরির কারখানা, আর প্রতিদিন ঘটছে গ্যাং-ওয়ার, হত্যা ও গোলাগুলির ঘটনা।

গোয়েন্দাদের মতে, এসব সন্ত্রাসী চক্রকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন বিএনপির শীর্ষ কয়েকজন নেতা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় মিরপুরের পল্লবী এলাকার বিএনপির কেন্দ্রীয় এক শীর্ষ নেতা। আর মোহাম্মদপুর এলাকায় সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখছে ৯০ দশকের কুখ্যাত গ্যাংস্টার ও বর্তমানে বিএনপির ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি পিচ্চি হেলাল।

গোয়েন্দা তথ্য বলছে, রাজনৈতিক সহিংসতা ছড়ানোর পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই বিহারি ক্যাম্পকে কেন্দ্র করে নাশকতার ছক এঁকেছে বিএনপির একাধিক নেতা-কর্মী। ভিন্ন পক্ষের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতায় ক্যাম্পজুড়ে চলছে অব্যাহত সংঘর্ষ, খুন, গোলাগুলি ও ককটেল বিস্ফোরণ। প্রতিদিনকার এসব সহিংসতায় সাধারণ ক্যাম্পবাসীরা আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, গত বছরের জুলাই-আগস্টে আন্দোলনকারীরা যেসব থানা ও পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা-লুটপাট চালিয়ে যেসব এলএমজি, এসএমজি, চায়না রাইফেল, পিস্তল ও শটগান লুট করেছিল, তার বড় অংশ এখন প্রকাশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে জেনেভা ও বিহারি ক্যাম্পে।

জেনেভা ক্যাম্পে বহু বাসায় ঘরের দরজার পাশে স্তূপ করে রাখা হয়েছে লুট হওয়া অস্ত্র; বিডি ডাইজেস্ট-এর নিজস্ব সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, এগুলোর অধিকাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে জেনেভা ক্যাম্পের কুখ্যাত দুই সন্ত্রাসী—বুনিয়া সোহেল ও চুয়া সেলিম।

এ দুই গ্রুপের মধ্যে মাদক রুট, চাঁদাবাজি ও অস্ত্র বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে চলছে ভয়াবহ দ্বন্দ্ব। পুলিশের কাছে অনেক তথ্য থাকলেও, ক্যাম্পের ঘিঞ্জি পরিবেশ ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার কারণে সেখানে অভিযান চালাতে পারছে না তারা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই সীমাবদ্ধতা এতটাই প্রকট যে দুই দফায় পুরস্কার ঘোষণা করেও খোয়া যাওয়া অস্ত্রের অতি সামান্য অংশই উদ্ধার করতে পেরেছে পুলিশ। ভারী অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ রয়ে গেছে নাগালের বাইরে।

গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিশ্চিত করেছে, জেনেভা ক্যাম্পের ৪ নম্বর সেক্টর এবং ৭ নম্বর সেক্টরে রয়েছে ককটেল তৈরির দুটি স্থায়ী আস্তানা। এখানে প্রতিদিনই তৈরি হচ্ছে বোমা, হাতবোমা এবং উচ্চক্ষমতার ককটেল। এই বিস্ফোরক তৈরির মূল কারিগর জসিম ওরফে কাল্লু, যে পল্লবীর বিহারি ক্যাম্পে থাকলেও অর্ডার পেলে জেনেভা ক্যাম্পে এসে ককটেল তৈরি করে যায়। আরেক কারিগর কালা নবাব ক্যাম্পের বাসিন্দা হলেও গ্রেপ্তার এড়াতে বাইরে ভাড়া বাসায় থাকে।

বুনিয়া সোহেল ও তার ভাই টুনটুন জেনেভা ক্যাম্পে ছোট আকারের বহুতল ভবন নির্মাণ করেছে, যা বাইরে থেকে সাধারণ বাসা মনে হলেও ভেতরে রয়েছে ককটেল তৈরির ‘গোপন কিচেন’। এই কারখানাগুলো নজরদারিতে রেখেছে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা। পাশাপাশি, চুয়া সেলিম, পিচ্চি রাজা, ইশতিয়াক ও গালকাটা মনুও নতুন করে বিস্ফোরক তৈরির কারখানা গড়ে তুলেছে। ফলে এখন পুরো ক্যাম্প বিস্ফোরক উৎপাদনের একটি বড় কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

ক্যাম্পবাসীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিরাতে গুলির শব্দ ও বিস্ফোরণ তাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে।

এক নারী বাসিন্দা বলেন, “রাত হলে আমরা জানালা বন্ধ রেখে লাইট বন্ধ করে বসে থাকি। ওরা চাইলে কাউকে এখানেই গুম করে রাখে, আমরা কিছু বলার সাহসও পাই না।”

এক দোকানদার জানান, “প্রতি মাসে নিয়ম করে চাঁদা দিতে হয়। না দিলে দোকানে ককটেল মেরে ভস্ম করে দেবে।”

এদিকে পল্লবীর বিহারি ক্যাম্পে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি। পুরো ক্যাম্পেই ঘনবসতিপূর্ণ গলি, এসব গলি খুবই সরু। তবে সেখানেই খোলাখুলিভাবে চলাফেরা করছে সন্ত্রাসীরা। চাঁদাবাজি, মারামারি ও মাদক কারবারের দখল নিয়ে নিয়মিত সংঘর্ষ চললেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নীরব।

গোয়েন্দা সূত্রে পাওয়া তথ্য, স্থানীয়দের বয়ান এবং অনুসন্ধানে উঠে আসে পল্লবী বিহারি ক্যাম্পের বড় অংশ এখন বিএনপির একাধিক শীর্ষ নেতার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণে।বিএনপির কেন্দ্রীয় ক্রীড়া সম্পাদক, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক এবং মিরপুর পল্লবী অঞ্চলের মনোনয়নধারী নেতা আমিনুল হকের ঘনিষ্ঠ সহযোগীরাই সন্ত্রাসীদের দিয়ে ক্যাম্পে ‘অপারেশন’ পরিচালনা করে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ক্যাম্পে দেখা যায় প্রকাশ্যে কিশোর গ্যাংগুলোর তৎপরতা, প্রকাশ্যে ছিনতাই হওয়া মোবাইল ও ইয়াবা বিক্রি হচ্ছে। রাতের গভীর হলে শুরু হয় অস্ত্র নিয়ে আসা-যাওয়া।

স্থানীয় এক বাসিন্দা নাম না প্রকাশ করার শর্তে বলেন, “এখানে পুলিশ আসে না। আসলেও ঢোকে না। যারা আন্ডারওয়ার্ল্ড চালায়, তারা বড় লোকদের লোক।”

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়— রাজনৈতিক অস্থিরতার পটভূমিতে এসব অস্ত্রধারী ক্যাম্পভিত্তিক নাশকতা এক সময় বড় সংঘাতে রূপ নিতে পারে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা বলছেন— ঢাকার কেন্দ্রে এত বড় অস্ত্রভাণ্ডার জমা থাকা, গ্যাং-ওয়ারের নিয়মিত ঘটনা এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার সমন্বয় বড় ধরনের সহিংসতার পূর্বাভাস। এই ক্যাম্পগুলো নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে রাজধানীর নিরাপত্তা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়তে পারে।

ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের এই দুই আদর্শ কেন্দ্র—জেনেভা ক্যাম্প ও পল্লবী বিহারি ক্যাম্প—আজ শুধু অপরাধের গোপন আস্তানা নয়; এটি হয়ে উঠেছে সংগঠিত রাজনৈতিক সহিংসতার অন্যতম বড় ঝুঁকি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হলে আগামি মাসগুলোতে রাজধানীর নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও নাজুক হতে পারে।

এসব বিষয়ে পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলেন, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে আমরা বিভিন্ন সময় অভিযান চালাচ্ছি। জেনেভা ক্যাম্পের ভেতর আরও কয়েকটি ককটেল তৈরির কারখানার সন্ধান পেয়েছি আমরা। এসব ঘটনায় যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা নেবো।

তবে ক্যাম্পে রাজনৈতিক নেতাদের প্রভাব সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি কোন উত্তর দিতে চাননি।

Visited 48 times, 1 visit(s) today