নিজস্ব প্রতিবেদক
চট্টগ্রাম বন্দরে পাকিস্তান থেকে আসা দুটি কনটেইনারে বিপুল পরিমাণ পপি সিড (হেরোইন উৎপাদনের জন্য পপি ফুলের বীজ) ধরা পড়েছে, যা ঘোষণায় পোল্ট্রি ফিড হিসেবে আমদানি করা হয়েছিল। এই ঘটনা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তকে নতুন করে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে—পাকিস্তান থেকে আমদানিকৃত পণ্যের বাধ্যতামূলক কায়িক পরীক্ষা বাতিলের মাধ্যমে কি ইউনূস সরকার ইচ্ছেকৃতভাবে অবৈধ অস্ত্র, মাদক এবং অন্যান্য নিষিদ্ধ সামগ্রীর প্রবেশপথ সহজ করে দিয়েছে?
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ২০২৪ এর ২৯শে সেপ্টেম্বর প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে পাকিস্তান থেকে আসা সকল পণ্যের ১০০ শতাংশ কায়িক পরীক্ষ বাতিলের ঘোষণা করা হয়েছে। এর আগে শেখ হাসিনা সরকারের আমলে পাকিস্তানকে ‘হাই-রিস্ক’ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করে পাকিস্তানি পণ্যে শতভাগ “Physical Inspection” এর নিয়ম চালু ছিল, যা বাংলাদেশে জঙ্গিবাদী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে পাকিস্তানের যোগসূত্রের কারণে আরোপিত হয়।
কিন্তু ইউনূস সরকারের নির্দেশে এনবিআরের সিদ্ধান্তকে ‘ব্যবসা সহজতার’ জন্য নেওয়া হলেও, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা এটিকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ বলে অভিহিত করছেন।
চট্টগ্রাম কাস্টমসের তথ্য অনুসারে, পাকিস্তান থেকে আমদানিকৃত দুটি কন্টেইনারে ঘোষিত ৩২ হাজার ১০ কেজি ‘বার্ড ফুড’ এর পরিবর্তে ২৪ হাজার ৯৬০ কেজি পপি সিড এবং মাত্র ৭ হাজার ২০০ কেজি পোল্ট্রি ফিড পাওয়া গেছে। এই পপি সিডগুলো আমদানি করে চট্টগ্রাম কোতোয়ালি থানাধীন কোরবানিগঞ্জের মেসার্স আদিব ট্রেডিং কোম্পানি।
বাংলাদেশে পপি সিড আমদানি নিষিদ্ধ, কারণ এটি হেরোইন ইৎপাদনের প্রধান উৎস পপি গাছের বীজ। এই বীজ থেকে পপি গাছ হয় এবং সেই গাছের কাঁচা ফলের কষ থেকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় আফিম ও হেরোইন উৎপাদন হয়।
কাস্টমস কর্মকর্তারা বলছেন, এই চালানটি ইন্সপেকশন ছাড় পেলে সহজেই দেশে প্রবেশ করতে পারত। এই ঘটনা পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ে একটি অন্ধকার ছায়া ফেলেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফের সঙ্গে সাক্ষাতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এর ফলে বাণিজ্য বাধা অপসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কিন্তু পাকিস্তানকে আঞ্চলিক সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ, অবৈধ অস্ত্র পাচার এবং মাদক ব্যবসার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
.যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের ‘কান্ট্রি রিপোর্ট অন টেররিজম’ অনুসারে, পাকিস্তানে তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি), বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) এবং আইএসআইএস-কে-এর মতো গোষ্ঠীগুলো সক্রিয়, যারা ছোট অস্ত্র এবং বিস্ফোরক ব্যবহার করে হামলা চালায়। এছাড়া, পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো অবৈধ অস্ত্র ও মাদক পাচারের ‘সেফ হ্যাভেন’ হিসেবে পরিচিত।
বাংলাদেশের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা এই ইন্সপেকশন ছাড়কে ‘চিন্তার কারণ’ বলে উল্লেখ করেছেন। টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়ার একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটি পাকিস্তান থেকে অস্ত্র এবং বিস্ফোরকের প্রবেশ সহজ করে দিতে পারে, বিশেষ করে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থানের পটভূমিতে।
ইকোনমিক টাইমসের রিপোর্ট অনুসারে, এই সিদ্ধান্ত অবৈধ পণ্যের আমদানির ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। পাকিস্তানের নারকো-টেরর নেক্সাস—যেখানে মাদক ব্যবসা জঙ্গিবাদী গোষ্ঠীগুলোর অর্থায়ন করে—এর উদাহরণ হিসেবে আফগান তালিবানের সঙ্গে যোগসূত্র উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রশ্ন উঠছে, অন্তর্বর্তী সরকারের এই সিদ্ধান্ত কতটা গভীর পরিকল্পনামূলক? ফিসকাল ইয়ার ২০২২-২৩-এ বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে ৬৯৯ মিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে, যার মধ্যে তুলা, রাসায়নিক, গম এবং প্লাস্টিক অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু এই ‘সহজীকরণ’ এর ফলে কতটা নিষিদ্ধ পণ্য ঢুকেছে বা ঢুকতে পারে, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, পাকিস্তানের মতো একটি দেশ থেকে ইন্সপেকশন ছাড় দেওয়া মানে সন্ত্রাসবাদী নেটওয়ার্কের জন্য দরজা খুলে দেওয়া।
কাস্টমস কর্মকর্তারা বলছেন, এই চালানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হবে এবং পপি সিডগুলো জব্দ করা হয়েছে। কিন্তু বৃহত্তর প্রশ্ন রয়ে গেল: অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পাকিস্তান থেকে আর কী কী ‘সহজ’ করে এনেছে এতদিন? এই ঘটনা বাংলাদেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে এবং সরকারের বৈদেশিক নীতির উপর নতুন আলোচনা শুরু করেছে।
