নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকা, ৪ নভেম্বর ২০২৫: অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন প্রশাসন ধর্মভিত্তিক সংগঠনগুলোর আপত্তির মুখে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত ও শারীরিক শিক্ষকের পদ বাতিল করেছে। এই সিদ্ধান্তকে শিক্ষাবিদ, অভিভাবক ও অর্থনীতিবিদরা ‘আত্মসমর্পণের রাজনীতি’ আখ্যা দিয়ে কড়া সমালোচনা করেছেন। তারা বলছেন, এটি কেবল শিশুমনের বৈজ্ঞানিক বিকাশের পথে বাধা নয়, বরং শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক সংকটকে আড়াল করে ধর্মীয় চাপের কাছে সরকারের দুর্বলতার প্রতীক।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি সাম্প্রতিক প্রজ্ঞাপনে এই পদ দুটি বাতিলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি ইসলামিস্ট সংগঠন দাবি তুলেছিল যে, সংগীত শিক্ষা ‘ইসলামবিরোধী’ এবং এর পরিবর্তে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে। অথচ বাংলাদেশের জাতীয় শিক্ষাক্রমে ইসলামসহ সকল ধর্মশিক্ষা ইতোমধ্যে বাধ্যতামূলক এবং ব্যানবেইসের ২০২৩ সালের তথ্য অনুসারে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অধিকাংশেই ধর্মীয় শিক্ষক রয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে সংগীত ও শারীরিক শিক্ষকের পদ বাতিল করা কোনো যুক্তিসংগত সমাধান নয়—এটি সরাসরি ধর্মীয় চাপের কাছে নতজানু হওয়া।
শিক্ষাবিদ লুবনা ফেরদৌসী ডয়চে ভেলে-তে লিখেছেন, “ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগের দাবি তোলা যেতে পারে, কিন্তু সংগীত শিক্ষকের নিয়োগ বন্ধ করে তা করা যুক্তিহীন। এটি সাংস্কৃতিক প্রতিস্থাপনের রাজনৈতিক কৌশল।”
বিশ্বজুড়ে গবেষণা প্রমাণ করেছে, সংগীত শিক্ষা শিশুদের জ্ঞানীয় বিকাশ, স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ ও সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা বাড়ায়। ওইসিডির ২০২২ প্রতিবেদনে ফিনল্যান্ডে সংগীতের কারণে সমস্যা সমাধানের দক্ষতা ১৫ শতাংশ বেশি। জার্মানিতে গণিত-ভাষায় ১৭ শতাংশ উন্নতি। শারীরিক শিক্ষা শিশুদের স্বাস্থ্য, মানসিক স্থিতিশীলতা ও সামাজিক দক্ষতা গড়ে তোলে। এই দুটি পদ বাতিল করে সরকার শিশুদের সৃজনশীলতা ও সুস্থতার অধিকার কেড়ে নিচ্ছে।
এই সিদ্ধান্তের আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো, এটি শিক্ষার আসল সংকটকে সম্পূর্ণ আড়াল করছে। ব্যানবেইসের তথ্যে তৃতীয় শ্রেণির ৪০ শতাংশ শিশু বাংলা পড়তে পারে না, পঞ্চম শ্রেণির ৬০ শতাংশ অঙ্ক করতে ব্যর্থ। শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ১:৪৬—আন্তর্জাতিক মানের দ্বিগুণ। গ্রামীণ বিদ্যালয়ের অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী পঞ্চম শ্রেণিতে উঠেও দ্বিতীয় শ্রেণির পাঠ্যবই পড়তে পারে না। অথচ এই মৌলিক সংকটের পরিবর্তে সরকার সংগীত-শারীরিক শিক্ষাকে ‘বলির পাঁঠা’ বানিয়ে ধর্মীয় চাপ মেটাচ্ছে।
মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর সফল উদাহরণও এই সিদ্ধান্তকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তুরস্ক, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারে সংগীত ও শারীরিক শিক্ষা প্রাথমিক স্তরে বাধ্যতামূলক—ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি। এই দেশগুলোতে সংগীত ধর্মীয় মূল্যবোধকে দুর্বল করে নি, বরং সৃজনশীলতা ও বিশ্বনাগরিকতা গড়েছে। বাংলাদেশের সরকার কেন এই উদাহরণ অনুসরণ করছে না?
অর্থনীতিবিদ সেলিম রাইহান বলেছেন, “এই সিদ্ধান্ত একবিংশ শতাব্দীর দক্ষতা থেকে শিশুদের দূরে সরিয়ে নিচ্ছে। সৃজনশীলতা ও শারীরিক সুস্থতা ছাড়া কোনো জাতি অর্থনৈতিকভাবে এগোতে পারে না।” অভিভাবকরা উদ্বিগ্ন যে, এটি শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক দক্ষতার ক্ষতি করবে।
ইউনেস্কোর ফিউচার্স অব এডুকেশন ২০১৯ রিপোর্টে বলা হয়েছে, শিক্ষা হতে হবে সৃজনশীল, সমালোচনামূলক ও সহমর্মিতাময়। জন ডিউই ও পাওলো ফ্রেইরের শিক্ষাদর্শে সংগীত-শিল্প-ক্রীড়া অপরিহার্য। কিন্তু ইউনূস সরকার ধর্মীয় চাপের কাছে নতি স্বীকার করে এই দর্শনকে উপেক্ষা করছে।
এই সিদ্ধান্ত শুধু শিক্ষার ক্ষতি নয়, সরকারের দুর্বলতার প্রতীক। ধর্মভিত্তিক দলগুলোর কাছে আত্মসমর্পণ করে তারা শিশুদের ভবিষ্যৎকে অন্ধকার করছে। জনগণের প্রশ্ন—কবে এই ‘নতজানু’ রাজনীতি বন্ধ হবে? শিক্ষা কি ধর্মীয় চাপের বলি হবে, নাকি শিশুমনের বিকাশের হাতিয়ার?
