বিশেষ প্রতিবেদক
ঢাকা, ৪ নভেম্বর ২০২৫: অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে গতকাল প্রকাশিত একটি পোস্টে বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বা FDI ১৯ দশমিক ১৩ শতাংশ বেড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এই দাবিকে সমর্থন করতে শ্রীলঙ্কা, চিলি, সুদান, ইউক্রেন, মিশর ও ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন বছরের আন্দোলন পরবর্তি FDI বৃদ্ধির উদাহরণ টানা হয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সূত্র যেমন ইউএনসিটিএডি, ইনডেক্সমুন্ডি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য পরীক্ষা করলে দেখা যায়, এই দাবি কেবল অসম্পূর্ণই নয়, বরং সরাসরি ভুল ও বিভ্রান্তিকর।
প্রথমত, ইউনূসের উল্লিখিত ১৯ দশমিক ১৩ শতাংশ বৃদ্ধির হিসাবটি ২০২৫ সালের তৃতীয় কোয়ার্টারের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে। অথচ এটি পুরো ২০২৪ সালের চিত্র নয়। ইউএনসিটিএডির ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট রিপোর্ট ২০২৫-এ স্পষ্ট বলা হয়েছে, বাংলাদেশে FDI চতুর্থ বছরের মতো কমেছে—নিয়ন্ত্রণের অসঙ্গতি ও বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের কারণে। ২০২৪ সালে নেট FDI ১৩ দশমিক ২ শতাংশ কমে ১ দশমিক ২৭ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, ২০২৫ সালের দ্বিতীয় কোয়ার্টারে FDI ৬১ দশমিক ৫৩ শতাংশ কমে মাত্র ৩০৩ মিলিয়ন ডলার হয়েছে। তৃতীয় কোয়ার্টারে ১৯ শতাংশ বৃদ্ধি দেখানো হলেও এর ৭২ শতাংশই পুনর্বিনিয়োগ বা রিইনভেস্টমেন্ট—অর্থাৎ বিদেশ থেকে নতুন টাকা আসেনি, পুরনো বিনিয়োগের লাভই আবার বিনিয়োগ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, নতুন ইকুইটি ক্যাপিটাল ৬২ শতাংশ কমেছে।
ইউনূসের পোস্টে যে ছয়টি দেশের উদাহরণ দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর সব দেশেই বাস্তবে আন্দোলন পরবর্তি সময়ে FDI বৃদ্ধি পায়নি। শ্রীলঙ্কায় ২০২২ সালে FDI ৪৯ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু সেটি অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও স্থিতিশীলতার কারণে। চিলিতে ২০১৯ সালে ৬২ দশমিক ৯ শতাংশ বৃদ্ধি হয়েছে স্থিতিশীল অর্থনীতির জোরে। কিন্তু সুদানে ২০১৯ সালে FDI ২৭ দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে—সরকার পতনের পর গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছে বলে। ইউক্রেনে ২০১৪ সালে ৮১ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে, কারণ রাশিয়ান বিনিয়োগ শূন্য হয়ে গিয়েছিল। মিশরে ২০১১ সালে ১০৭ শতাংশ কমেছে—আরব দেশ ও পশ্চিমারা বিনিয়োগ বন্ধ করে দিয়েছিল। ইন্দোনেশিয়ায় ১৯৯৮ সালে ১৫১ শতাংশ কমেছে এশিয়ান মহামন্দা আর সুহার্তো’র পতনের কারণে।
এসব দেশে পরিস্থিতির সঙ্গে বাংলাদেশের ২০২৪ এর আগস্টে সরকার পতনের তুলনা করলেও, বাংলাদেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের যেই সফলতার গল্প বলছেন বিডা চেয়ারম্যান ও প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর, বাস্তবে পার্থক্যটা আকাশ আর পাতালের।
সরকারের এই ‘সাফল্যের’ দাবির বিপরীতে বাস্তবতা ভয়াবহ। বিগত এক বছরে ২৫৮টি পোশাক কারখানা ও হাজারখানেক শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে, লক্ষাধিক শ্রমিক কাজ হারিয়েছে। RMG ক্রয় অর্ডার ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়ায় সরে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে, নতুন FDI-এর অভাবে অর্থনীতি আরও দুর্বল হচ্ছে। দুর্নীতি, সন্ত্রাস এবং নিয়ন্ত্রণের অভাবে দেশীয়-বিদেশি উভয় বিনিয়োগকারী মুখ ফিরিয়েছে। UNCTAD-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের FDI ২০২৫-এ নেগেটিভ হবে।
সারাদেশের পত্রিকায় প্রকাশিত খবরগুলো—FDI হ্রাস, শিল্প বন্ধ, বেকারত্ব—কি সব মিথ্যা? ইউনূস ও তাঁর সহযোগী আশিক চৌধুরীর মতো নেতারা বিদেশি বিনিয়োগ আনার কোনো উদ্যোগ নেয়া বলতে কোটি টাকার পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন আর বিদেশ সফর হয়েছে, যা বৈদেশিক বিনিয়োগকারীর আস্থা ফেরানোর জন্য যথেষ্ট নয়; বরং তাদের অব্যবস্থাপনায় অর্থনীতি ধ্বংসের দিকে এগিয়েছে। এই ‘আইওয়াশ’ কতদিন চলবে? জনগণের অর্থনৈতিক সত্যিকারের হালচিত্র জানার অধিকার আছে—মিথ্যা প্রচারণায় নয়।
অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ ড মামুনুর রশিদ বলেন, “এই ধরনের তথ্য বিকৃতি শুধু বিশ্বাস হারায়, বিনিয়োগ আকর্ষণ করে না। স্থিতিশীলতা ও স্বচ্ছতা ছাড়া কোনো অর্থনীতি বাঁচাতে পারবে না। এই অন্তর্বর্তী সরকার জনগনের সাথে মুনাফেকি করছে। সরকার ইচ্ছাকৃত ভাবে মিথ্যা তথ্য দিচ্ছেন জনগনকে, নিজেদের ব্যার্থতা আড়াল করতে, না হলে অর্থনীতির তথ্য নিজেদের মতো করে কাটাছেড়া করে উপস্থাপন করছেন, এবং এটা তারা অর্থনীতি না বুঝে করছেন যে তা না, এটা তারা জেনে শুনে বুঝেই করছেন।”


