লক্ষাধিক শ্রমিকের জীবিকা বিপন্ন, রপ্তানি অর্থনীতিতে ধ্বংসাত্মক প্রভাবের আশঙ্কা
নিজস্ব প্রতিবেদক
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রেস সচিব শফিকুল আলমের একটি বক্তব্য দেশের গার্মেন্টস শিল্পকে তোলপাড় করে তুলেছে। তিনি বলেছেন, “নন-কমপ্লায়েন্ট কারখানা বন্ধ হওয়া দেশের জন্য খারাপ কিছু না।” এই মন্তব্যকে গার্মেন্টস মালিক, শ্রমিক নেতা এবং অর্থনীতিবিদরা ‘অহমিকাপূর্ণ’, ‘অজ্ঞতাসম্পন্ন’ এবং ‘রপ্তানি অর্থনীতির জন্য আত্মঘাতী’ বলে কঠোর সমালোচনা করেছেন।
তাদের আক্ষেপ, এই কারখানাগুলোতে লক্ষাধিক শ্রমিক কাজ করে এবং রপ্তানি শিপমেন্টের চাপ সামলাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অথচ প্রেস সচিব এত মানুষের জীবন-জীবিকা আমলেই নিচ্ছেন না!
বাংলাদেশের গার্মেন্টস খাতে প্রায় ৪৫ লক্ষ শ্রমিক কর্মরত। এর মধ্যে নন-কমপ্লায়েন্ট কারখানাগুলোতে কমপক্ষে দেড়-দুই লক্ষ শ্রমিকের কর্মসংস্থান রয়েছে। বিজিএমইএ সূত্রে জানা যায়, এই কারখানাগুলো মূলত ছোট ও মাঝারি আকারের এবং পিক সিজনে কমপ্লায়েন্ট কারখানাগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা ছাড়িয়ে গেলে সাব-কন্ট্রাক্ট নিয়ে রপ্তানি শিপমেন্ট সম্পন্ন করে।
প্রেস সচিবের এই বক্তব্য ২৫৮ কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়া, লক্ষাধিক শ্রমিক বেকার হওয়া এবং তাদের পরিবারের কয়েক লক্ষ সদস্যের জীবিকা বিপন্ন হওয়ার দায় থেকে নিজেদের দায়মুক্তি দেয়ার একটা অপপপ্রয়াস হিসাবে দেখা হচ্ছে।
বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, প্রেস সচিব হয়তো জানেন না যে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শিপমেন্টের পিক সিজনে কমপ্লায়েন্ট কারখানাগুলোর ক্ষমতা শতভাগ ছাড়িয়ে যায়। সেই সময় নন-কমপ্লায়েন্ট কারখানাগুলোই সাব-কন্ট্রাক্ট নিয়ে রপ্তানি বাঁচিয়ে রাখে। এগুলো বন্ধ হলে রপ্তানি অর্ডার বাতিল হবে, বায়ার হারানো যাবে এবং বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হবে।
গার্মেন্টস রপ্তানিকারকদের সংগঠনগুলো জানায়, প্রতি বছর ৮০ বিলিয়ন ডলারের গার্মেন্টস রপ্তানির ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ শিপমেন্ট পিক সিজনে সাব-কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। এই সাব-কন্ট্রাক্টের বড় অংশই নন-কমপ্লায়েন্ট কারখানাগুলো নেয়। এইচএন্ডএম, জারা, ওয়ালমার্টের মতো বায়াররা ডেলিভারি ডেডলাইন মানতে না পারলে অর্ডার স্থায়ীভাবে ভিয়েতনাম বা ইন্দোনেশিয়ায় চলে যায়।
বিকেএমইএ’র সহ-সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, প্রেস সচিবের মন্তব্য “যেন কেউ বলছে অসুস্থ রোগীকে অপারেশন না করে মেরে ফেলাই ভালো। নন-কমপ্লায়েন্ট কারখানাগুলোর সমস্যা আছে ঠিকই, কিন্তু সমাধান হলো আপগ্রেডেশন, ট্রেনিং এবং ফাইন্যান্সিং—বন্ধ করা নয়।“
এই কারখানাগুলো বন্ধ হলে রপ্তানি আয় কমবে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ পড়বে, বেকারত্ব বাড়বে, ব্যাংক ঋণ খেলাপি বাড়বে এবং বায়ারদের আস্থা হারিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হবে।
গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি মন্টু ঘোষ বলেন, “প্রেস সচিব কি জানেন একটা কারখানা বন্ধ হলে একজন শ্রমিকের সাথে তার পরিবারের চার-পাঁচ জনের ভাত কেড়ে নেওয়া হয়? এটা কোনো ভালো খবর নয়, এটা জীবন ধ্বংসের ঘোষণা।“
বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ যৌথভাবে সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছে প্রেস সচিবের মন্তব্য প্রত্যাহার করতে হবে এবং নন-কমপ্লায়েন্ট কারখানাগুলোর জন্য দুই বছরের রিমিডিয়েশন পিরিয়ড ঘোষণা করতে হবে। এছাড়া লো-ইন্টারেস্ট লোন, টেকনিক্যাল সাপোর্ট প্রদান এবং ধাপে ধাপে আপগ্রেডেশনের ব্যবস্থা করতে হবে।
অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, এই মন্তব্য অর্থনৈতিক সাক্ষরতার অভাবের চূড়ান্ত। নন-কমপ্লায়েন্ট কারখানা বন্ধ করলে যে ক্ষতি হবে তা পূরণ করতে পাঁচ থেকে সাত বছর লাগবে। এটা যেন কেউ বলছে ফ্যাক্টরি বন্ধ করে শ্রমিকদের রাস্তায় নামিয়ে দিলেই নিরাপত্তা বাড়বে।
প্রেস সচিবের এই বক্তব্য শুধু অহমিকা নয়, দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ডের প্রতি আঘাত। গার্মেন্টস খাত বাংলাদেশের ৮৪ শতাংশ রপ্তানি আয়ের উৎস। এই খাতের একটা অংশকেও ধ্বংস করার অধিকার কারও নেই। সরকারকে এখনই সংশোধনমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে, নইলে লক্ষাধিক শ্রমিকের অভিশাপ এবং রপ্তানি খাতের ধ্বংস অনিবার্য।
