বাংলাদেশী শিল্পীদের মেলে না প্রশাসনের অনুমতি, পাকিস্তানি ব্যান্ডের কনসার্টের দুয়ার থাকে উন্মুক্ত

বাংলাদেশী শিল্পীদের মেলে না প্রশাসনের অনুমতি, পাকিস্তানি ব্যান্ডের কনসার্টের দুয়ার থাকে উন্মুক্ত
শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদক

বাংলাদেশী শিল্পীদের কনসার্ট একের পর এক স্থগিত হলেও পাকিস্তানি ব্যান্ড ও শিল্পীদের জন্য উন্মুক্ত হচ্ছে কনসার্টের দুয়ার। প্রশাসনের অনুমতি না মেলায় সাম্প্রতিক সময়ে দেশীয় শিল্পীদের একাধিক কনসার্ট বাতিল বা স্থগিত হয়েছে। অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে পাকিস্তানি ব্যান্ডগুলোর কনসার্ট আয়োজন যেন নির্বিঘ্নে চলছে— এমন প্রবণতা ঘিরে উঠেছে নানা প্রশ্ন।

সর্বশেষ উদাহরণ, পাকিস্তানের জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘জাল’ ফের ঢাকায় আসার ঘোষণা দিয়েছে।

১৭ই অক্টোবর, শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যান্ডটির অন্যতম সদস্য ও ভোকালিস্ট গওহর মমতাজ দুটি স্টোরি পোস্ট করে জানান, “ঢাকা, তোমরা প্রস্তুত? দেখা হবে শীঘ্রই।”

এতে ঢাকার ভক্তদের মধ্যে উচ্ছ্বাস ছড়ালেও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন— দেশের শিল্পীরা যখন নিরাপত্তাসহ নানা অজুহাতে অনুমতি না পেয়ে অনুষ্ঠান বাতিল করছেন, তখন কীভাবে বিদেশি ব্যান্ডের পারফরম্যান্সের অনুমতি মিলছে?

গত কয়েক মাসে শুধু মেহেরপুর নয়, দেশের বিভিন্ন জেলাতেই কনসার্ট আয়োজন বাধাগ্রস্ত হয়েছে প্রশাসনিক অনুমতি না পাওয়ায়। রাজশাহী, খুলনা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, বগুড়া ও কুমিল্লাসহ অন্তত আটটি জেলায় বড় পরিসরের কনসার্ট শেষ মুহূর্তে স্থগিত বা বাতিল হয়েছে।

আয়োজকরা জানিয়েছেন, স্থানীয় প্রশাসন কখনও নিরাপত্তা, কখনও জনসমাগম নিয়ন্ত্রণ বা রাজনৈতিক পরিস্থিতির অজুহাতে অনুমতি দেয়নি। অনেক ক্ষেত্রে মঞ্চ নির্মাণ, সাউন্ড বা আলোক সরঞ্জাম স্থাপনের পরও অনুষ্ঠান বন্ধের নির্দেশ এসেছে। এতে হতাশ হয়েছেন তরুণ শ্রোতারা, যারা দীর্ঘদিন পর এমন আয়োজনের অপেক্ষায় ছিলেন।

সাংস্কৃতিক অঙ্গনের ব্যক্তিত্বরা বলছেন, এই ধারাবাহিক নিষেধাজ্ঞা দেশীয় সংগীত ও বিনোদন সংস্কৃতিকে ক্রমেই সংকুচিত করে ফেলছে।

সূত্র জানায়, এ নিয়ে তৃতীয়বারের মতো ঢাকায় পারফর্ম করতে যাচ্ছে ‘জাল’। তবে আয়োজক কে বা কোথায় অনুষ্ঠানটি হবে, তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা হয়নি। এর আগেও ব্যান্ডটি ঢাকায় পারফর্ম করেছিল, যেখানে বিদেশি শিল্পী হিসেবে তাদের আগমনের বিশেষ ছাড়পত্র দেয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

অন্যদিকে সাম্প্রতিক সময়ে দেশীয় সংগীতশিল্পীদের একাধিক কনসার্ট প্রশাসনের অনুমতি না পেয়ে বাতিল হয়েছে।

গত মাসে মেহেরপুরে জেমসের কনসার্ট শেষ মুহূর্তে স্থগিত করা হয় প্রশাসনের নির্দেশে। শুধু তাই নয়, দেশের বিভিন্ন জেলায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অনুমতির জটিলতা বা নিরাপত্তা কারণ দেখিয়ে স্থানীয় প্রশাসন কনসার্ট আয়োজন বন্ধ করে দিয়েছে। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সংগীত অঙ্গনের শিল্পী ও আয়োজকেরা।

দেশীয় শিল্পীদের এমন বাধার মধ্যেই পাকিস্তানি শিল্পীদের জন্য কনসার্ট আয়োজনের অনুমতি মেলে— বিষয়টি সাংস্কৃতিক মহলে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অনেকে বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পাকিস্তানি শিল্পীদের জন্য কনসার্ট আয়োজন যেন আরও সহজ হয়ে উঠেছে।

ঢাকার এক কনসার্ট প্রযোজক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “দেশীয় শিল্পীদের কনসার্ট করতে গেলে প্রশাসনের নানা অনুমতি, তালিকা, নিরাপত্তা পরিকল্পনা দেখাতে হয়। অনেক সময় অনুমতি মেলে না, আবার কেউ কেউ রাজনৈতিক কারণে আটকে যায়। কিন্তু পাকিস্তান থেকে কেউ এলে অনুমোদন প্রক্রিয়া খুব দ্রুত সম্পন্ন হয়। এতে মনে হয়, তাদের জন্য আলাদা সুবিধা রাখা আছে।”

সাংস্কৃতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সরকারের পাকিস্তানপ্রীতি নীতিরই প্রতিফলন এটি। তারা বলছেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দেশে পাকিস্তানি শিল্পীদের এমন সহজ অনুমতি এবং দেশীয় শিল্পীদের জন্য একের পর এক বাধা— এটি কেবল সাংস্কৃতিক নয়, রাজনৈতিক বার্তাও বহন করে।

ঢাকার সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর অনেকে সামাজিক মাধ্যমে প্রশ্ন তুলেছেন, “যেখানে বাংলাদেশের শিল্পীরা নিজ দেশে গাইতে পারছেন না, সেখানে পাকিস্তানি ব্যান্ডদের জন্য কনসার্টের দরজা এত উন্মুক্ত কেন?”

২০০২ সালে আতিফ আসলাম ও গওহর মমতাজের হাত ধরে গঠিত হয় ‘জাল’। ২০০৪ সালে তাদের প্রথম অ্যালবাম ‘আদাত’ প্রকাশের পর তারা আন্তর্জাতিক জনপ্রিয়তা পায়। বর্তমানে ব্যান্ডটির সদস্য গওহর মমতাজ, আমির আজহার ও সালমান আলবার্ট।

এদিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কৃতি নীতি নিয়ে বিনোদন অঙ্গনের অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, সরকারের পক্ষপাতদুষ্ট অনুমতি নীতির ফলে দেশীয় সংগীতশিল্পীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, আর এতে দেশের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যও ঝুঁকিতে পড়ছে।

Visited 19 times, 1 visit(s) today