সরকারবিরোধী মাচাদোকে নোবেল দেওয়ায় নরওয়েতে দূতাবাস বন্ধ করে দিলেন ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতি

সরকারবিরোধী মাচাদোকে নোবেল দেওয়ায় নরওয়েতে দূতাবাস বন্ধ করে দিলেন ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতি
শেয়ার করুন

আন্তর্জাতিক

ভেনেজুয়েলার বিরোধীদলীয় নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোকে মাদুরো সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টার জন্য এ বছর নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়। কিন্তু পুরস্কার প্রদানের ২ দিনের মধ্যেই নরওয়েতে ভেনেজুয়েলার দূতাবাস বন্ধের ঘোষণা দিলো প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর সরকার।

এই পদক্ষেপটিকে নোবেল কমিটির ‘বিতর্কিত’ সিদ্ধান্তের প্রতি সরাসরি প্রতিবাদ হিসেবে দেখছেন, যা ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক সংকটকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে অভিমত বিশ্লেষকদের।

এদিকে, নরওয়ের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই ঘটনাকে “দুঃখজনক” বলে বর্ণনা করলেও আলোচনার পথ খোলা থাকবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

নরওয়ের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সেসিলি রোয়াং বলেন, “এই সিদ্ধান্ত দুঃখজনক, কিন্তু আমরা ভেনেজুয়েলার সাথে সংলাপের চ্যানেল খোলা রাখতে চাই। নোবেল পুরস্কারে নরওয়ের সরকারের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।”

নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি গত ১০ই অক্টোবর, শুক্রবার অসলোতে মাচাদোকে শান্তিতে নোবেল প্রদানের ঘোষণা দেয়।

কমিটির চেয়ারম্যান যর্গেন ওয়াটন ফ্রাইডনেস বলেন, “মাচাদো লাতিন আমেরিকায় সাম্প্রতিক সময়ে বেসামরিক সাহসের অসাধারণ উদাহরণ”।

সুপ্রিম কোর্টের রায়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে নিষিদ্ধ হওয়ার পর থেকে মাচাদো আত্মগোপনে রয়েছেন। তিনি নোবেল বিজয়কে “ভেনেজুয়েলার জনগণ” এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের “সমর্থন”-এর জন্য উৎসর্গ করেন।

মাদুরো সরকার ১৩ই অক্টোবর ঘোষণা দেয়, অসলোতে দূতাবাস “বন্ধ করা হচ্ছে” এবং এর পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়াতেও দূতাবাস বন্ধ করে জিম্বাবুয়ে এবং বুর্কিনা ফাসোতে নতুন দূতাবাস খোলা হবে।

ভেনেজুয়েলার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এটি “কূটনৈতিক মিশনগুলোর অভ্যন্তরীণ পুনর্গঠনের” অংশ এবং “গ্লোবাল সাউথের সাথে সম্পর্ক জোরদার করার” উদ্যোগ।

তবে ভেনেজুয়েলার কূটনৈতিক পদক্ষেপটি ২০১০ সালে চীনের লিউ শিয়াওবোকে নোবেল দেওয়ার পর নরওয়ের সাথে চীনের সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার ঘটনার সাথে তুলনীয়, যা স্বাভাবিক হতে ৬ বছর সময় লেগেছিল।

নিকোলাস মাদুরো বিপুল জনসমর্থন নিয়ে নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন। তিনি রোববার মাচাদোকে “রাক্ষুসী জাদুকরী” বলে অভিহিত করেন, যদিও তার নোবেল জয়ের প্রসঙ্গটি সরাসরি উল্লেখ করেননি।

মাচাদোর ভেন্টে ভেনেজুয়েলা দলের নেতৃত্বে তিনি দীর্ঘদিন ধরে মাদুরোর ১২ বছরের শাসনকে “অবৈধ” বলে চ্যালেঞ্জ করে আসছেন। যদিও তার পেছনে পশ্চিমা অপশক্তির মদদ এবং অর্থায়ন রয়েছে বলে অভিযোগ আছে।

মাচাদো ফক্স নিউজকে বলেন, “নোবেল পুরস্কার আমাদের রাজনৈতিক আন্দোলনের জন্য একটি ইনজেকশনের মতো”।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই কূটনৈতিক পদক্ষেপ ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে মাদুরোর কঠোর অবস্থানের প্রতিফলন। মাচাদোর নোবেল জয় এবং দূতাবাস বন্ধের এই পর্যায়ক্রমিক ঘটনা ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ভবিষ্যতকে নতুন করে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

কে এই মারিয়া কোরিনা মাচাদো?

ভেনেজুয়েলার রাজনীতিক ও মানবাধিকারকর্মী মারিয়া কোরিনা মাচাদো দেশটির দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অবিচল আন্দোলনে কাজ করছেন দীর্ঘদিন ধরে। তার সাহসী নেতৃত্ব ভেনেজুয়েলার জনগণের মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতার সংগ্রামকে নতুন মাত্রা দিয়েছে বলে নরওয়ের নোবেল কমিটি জানায়।

মারিয়া কোরিনা মাচাদো ১৯৬৭ সালের ৭ই অক্টোবর ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে জন্মগ্রহণ করেন। আন্দ্রেস বেল্লো ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি ব্যবস্থাপনা ও অর্থনীতি বিষয়ে উচ্চতর পড়াশোনা করেন। তরুণ বয়স থেকেই তিনি নাগরিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক সংস্কারের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে শুরু করেন।

২০০২ সালে মাচাদো “সুমাটে” নামে একটি ভোট পর্যবেক্ষণ সংস্থা গঠন করেন, যা ভেনেজুয়েলার নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য কাজ করে। পরবর্তীতে তিনি “ভেন্টে ভেনেজুয়েলা” নামে একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেন এবং এর জাতীয় সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। গণতন্ত্র, সুশাসন ও নাগরিক অধিকারের পক্ষে তার সোচ্চার অবস্থান তাকে দেশজুড়ে জনপ্রিয় করে তোলে।

২০১১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় তিনি সরকারের দমননীতি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরব ছিলেন। ২০১৪ সালে সরকারবিরোধী আন্দোলনে তিনি অন্যতম নেতৃত্ব দেন, যা তাকে বিরোধী রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে।

মাচাদোর স্পষ্ট বক্তব্য ও আপসহীন অবস্থান প্রায়ই তাকে সরকারের রোষানলে ফেলে। ২০২৪ সালে আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি বিরোধীদলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পান, কিন্তু সরকার তাকে ১৫ বছরের জন্য জনপদে কাজ করার অযোগ্য ঘোষণা করে।

নির্বাচনের আগে ও পরে সরকারের দমননীতি আরও জোরদার হয়। বিরোধী কর্মীদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তার ও সহিংসতা বৃদ্ধি পায়। বহু শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে এবং এতে অন্তত ২০ জন নিহত হন। এমন পরিস্থিতিতে মাচাদো আত্মগোপনে চলে যান, তবে বিভিন্ন বিবৃতির মাধ্যমে তিনি জনগণকে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে যান।

নোবেল কমিটির মতে, মারিয়া কোরিনা মাচাদো এমন এক সময়ে সাহস ও দৃঢ়তার প্রতীক হয়ে উঠেছেন, যখন ভেনেজুয়েলার মানুষ ভয়, নিপীড়ন ও অনিশ্চয়তার মধ্যে বেঁচে আছে। শান্তিপূর্ণ উপায়ে পরিবর্তনের প্রচেষ্টা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে তার অবিচল বিশ্বাসই তাকে এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এনে দিয়েছে।

এর আগে ২০২৪ সালে ইউরোপীয় সংসদ তাকে সারখোভ পুরস্কার প্রদান করে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া ইনস্টিটিউট থেকে সামাজিক সাহসের জন্য ইভান অ্যালেন জুনিয়র পুরস্কার পান। একই বছর টাইম ম্যাগাজিন তাকে বিশ্বের ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে।

মাচাদোর এই অর্জন শুধু ভেনেজুয়েলার জন্য নয়, বরং সারা বিশ্বের গণতন্ত্রপন্থী ও মানবাধিকারের সংগ্রামীদের জন্য এক অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। তার সংগ্রাম প্রমাণ করে, ন্যায় ও স্বাধীনতার জন্য শান্তিপূর্ণ প্রতিরোধও একদিন বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি এনে দিতে পারে।

Visited 19 times, 1 visit(s) today