গোলাম হোসেন
বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক জারিকৃত অধ্যাদেশের আলোকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিগত সরকার কর্তৃক ঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চলছে। তারই ধারাবাহিকতায় গত ৮ই অক্টোবর তিনটি ফরমাল চার্জে সেনাবাহিনীতে কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত ২৫ কর্মকর্তাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে এবং ট্রাইবুনাল তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে।
ঘটনা প্রবাহ:
International Crimes (Tribunals) Act, 1973 অধিকতর সংশোধনকল্পে প্রণীত অধ্যাদেশ যেহেতু International Crimes (Tribunals) Act, 1973 (Act No. XIX of 1973) অধিকতর সংশোধন করা সমীচীন ও প্রয়োজনীয়; এবং যেহেতু সংসদ ভাঙ্গিয়া যাওয়া অবস্থায় রহিয়াছে এবং রাষ্ট্রপতির নিকট ইহা সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হইয়াছে যে, আশু ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি বিদ্যমান রহিয়াছে; সেহেতু গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৯৩(১) অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতি নিম্নরূপ অধ্যাদেশ প্রণয়ন ও জারি করিলেন:—
উল্লিখিত বক্তব্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৭৩ এর সংশোধনী এনে কতিপয় ধারা সংযুক্ত ও সংশোধন করা হলো। পরবর্তীতে, ০৬ অক্টোবর, ২০২৫ তারিখে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (তৃতীয় সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ নামে সর্বশেষ সংশোধনী আনা হলো।
তাতে, ২০ সি ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইসিটি আইন অনুযায়ী ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হলে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার বা ওই পদে বহল থাকার অযোগ্য হবেন। একইভাবে তিনি যে কোনো স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সদস্য, কমিশনার, চেয়ারম্যান, মেয়র বা প্রশাসক হিসাবে নির্বাচিত হওয়ার বা বহাল থাকার অযোগ্য হবেন।
এমনকি প্রজাতন্ত্রের চাকরিতে নিয়োগ পাওয়ার বা অন্য কোনো সরকারি পদে অধিষ্ঠিত হওয়ারও অযোগ্য হবেন তিনি।
যদি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ট্রাইব্যুনালের রায়ে অব্যাহতি বা খালাস পান, তাহলে এই অযোগ্যতা তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না।
এখন প্রশ্ন হলো, উল্লিখিত অধ্যাদেশসমূহে সংবিধানের সাথে কতটুকু অসামঞ্জস্য রয়েছে?
সংবিধানের ৯৩(১) অনুচ্ছেদ মোতাবেক অধ্যাদেশ জারি হয়েছে। সংবিধানের একই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, তবে শর্ত থাকে যে, এই দফার অধীন কোন অধ্যাদেশে এমন কোন বিধান করা হইবে না,
(ক) যাহা এই সংবিধানের অধীন সংসদের আইন-দ্বারা আইনসঙ্গতভাবে করা যায় না;
(খ) যাহাতে এই সংবিধানের কোন বিধান পরিবর্তিত বা রহিত হইয়া যায়; অথবা
(গ) যাহার দ্বারা পূর্বে প্রণীত কোন অধ্যাদেশের যে কোন বিধানকে অব্যাহতভাবে বলবৎ করা যায়।
লক্ষ্য করুন, উল্লিখিত বিধানের আলোকে অন্তবর্তী সরকারের জারিকৃত অধ্যাদেশ সমূহ সংবিধানের ৯৩(১) এর (ক) ও (খ) লংঘন হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৭৩ একটি মৌলিক আইন। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭(খ)-তে বলা আছে, সংবিধানের মৌলিক বিধানাবলী সংশোধন অযোগ্য। যদি কেউ আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন, ১৯৭৩-কে মৌলিক আইন বলতে অস্বীকার করেন; তাহলে, উল্লিখিত অধ্যাদেশগুলো সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৬ ও ২৭ এর পরিপন্থী। সংবিধানের ২৬ অনুচ্ছেদে বলা আছে, মৌলিক অধিকারের সহিত অসমঞ্জস আইন বাতিল এবং ২৭ অনুচ্ছেদে বলা আছে, আইনের দৃষ্টিতে সমতা; সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয়লাভের অধিকারী। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (তৃতীয় সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ নামে সর্বশেষ সংশোধনীর ২০ সি ধারায় যা বলা হয়েছে, তার সম্পূর্ণটাই সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন। অতএব, সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সংবিধানসম্মত হয়নি। সংবিধানের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী হয়েছে।
উল্লেখ্য যে, অন্তর্বর্তী সরকার বর্তমান সংবিধানের আলোকে রাষ্ট্রপতির নিকট শপথ নেয়াটা সংবিধানের যথাযথ নিয়ম বা বিধানের আলোকে হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকার শপথ প্রসঙ্গে সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের দোহাই দেয়া হয়েছে। সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদে বলা আছে, “যদি কোন সময়ে রাষ্ট্রপতির নিকট প্রতীয়মান হয় যে, আইনের এইরূপ কোন প্রশ্ন উত্থাপিত হইয়াছে বা উত্থাপনের সম্ভাবনা দেখা দিয়াছে, যাহা এমন ধরনের ও এমন জনগুরুত্বসম্পন্ন যে, সেই সম্পর্কে সুপ্রীম কোর্টের মতামত গ্রহণ করা প্রয়োজন, তাহা হইলে তিনি প্রশ্নটি আপীল বিভাগের বিবেচনার জন্য প্রেরণ করিতে পারিবেন এবং উক্ত বিভাগ স্বীয় বিবেচনায় উপযুক্ত শুনানীর পর প্রশ্নটি সম্পর্কে রাষ্ট্রপতিকে স্বীয় মতামত জ্ঞাপন করিতে পারিবেন।”
উল্লিখিত বক্তব্যে ইহা সুস্পষ্ট যে, রাষ্ট্রপতির পাঠানো রেফারেন্সটি উপযুক্ত শুনানীর পর আপীল বিভাগ স্বীয় মতামত দিবে, কিন্তু আমরা সবাই জানি, রাষ্ট্রপতির পাঠানো প্রশ্নটি আদালতে উপস্থাপিত হয়নি এবং এর উপযুক্ত শুনানী অনুষ্ঠিত হয়নি। ঐ সময়ে আদালতের কার্যক্রম বন্ধ ছিল। অতএব, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারটি সংবিধানসম্মতভাবে গঠিত হয়নি, সেমতে তাদের কোনো কার্যক্রম সংবিধান সম্মত হতে পারে না।
