‘মাইয়ার তো লাশ পাইছোস, পোলার লাশটাও খুঁজে পাবি না’—তাইয়েবা হত্যা মামলার বাদীকে হুমকি

‘মাইয়ার তো লাশ পাইছোস, পোলার লাশটাও খুঁজে পাবি না’—তাইয়েবা হত্যা মামলার বাদীকে হুমকি
শেয়ার করুন

জেলা প্রতিনিধি

শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার সখিপুরে ৬ বছরের তাইয়েবা হত্যা মামলার পরও পরিবারে নিরাপত্তাহীনতা ও দুশ্চিন্তা কমেনি। তাদের উপর ধারাবাহিকভাবে মামলা তুলে নিতে চাপ দেওয়া হচ্ছে এবং মামলা তুলে না নিলে যুক্তজনদেরও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে—এমন অভিযোগ জানিয়েছেন মৃত শিশুটির পরিবার। সোমবার সকালেই এসব অভিযোগ করেন তাইয়েবার মা ডলি আক্তার।

তাইয়েবা টিটু সরদারের মেয়ে; গ্রামের নাম ছৈয়ালকান্দি। সে স্থানীয় দারুণ নাজাত মাদ্রাসার নার্সারিতে পড়ত। গত বুধবার থেকে শিশুটি নিখোঁজ থাকার পর শুক্রবার স্থানীয়রা তার মরদেহ মেসবাহউদ্দীন মোল্লার বাড়ির সেপটিক ট্যাংকে পান।

ঘটনার রাতেই পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাইয়েবার চাচি আয়েশা বেগম, প্রতিবেশী নাসিমা ও রঙ মিস্ত্রি আসিফকে থানায় নিয়ে আসে। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানিয়েছে—পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও শত্রুতার জেরেই আয়েশা বেগম শিশুটিকে হত্যা করেছেন বলে তাদের ধারণা। আয়েশা বেগম একজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক।

টিটু সরদার বাদী হয়ে সখিপুর থানায় মামলা করেন। থানার ওসি মো. ওবায়দুল হক জানান, তিন আসামিকে গ্রেপ্তার করে রোববার আদালতে প্রেরণ করা হয়; তাদের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে। আদালত আয়েশা বেগমের দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।

এদিকে অভিযোগ রয়েছে—রোববার সকালে মামলা তুলে নিতে তাইয়েবার মা ডলি আক্তারকে বাড়িতে এসে হুমকি-ধমকি দিয়েছেন আয়েশা বেগমের স্বামী সাহান সরদার, ছেলে আকিব সরদার এবং ননদ রিনা ও রুমা। পরিবারের দাবি, আকিব ও রিনা বলতে থাকেন—মামলা না তুলে নিলে তোমাদের (ডলির) ছেলেকেও হত্যা করা হবে। পাশাপাশি অভিযুক্তরা মানববন্ধনে অংশ নেওয়া কয়েক শিক্ষার্থীকেও হুমকি দিয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

ডলিকে অভিযোগ করে বলা হয়, হামলাকারী ও তাদের সঙ্গীরা কশেপ্ত্রে হুমকি দিয়ে বলেন: ‘মামলা উঠাইয়া না নিলে তোর পোলারে খাইয়া ফালামু। তোর পোলারে শেষ দেখা দেইখা রাখিস। তোর মাইয়ার তো লাশ পাইছোস; পোলার লাশটাও খুঁজে পাবি না।’

এই হামলা ও হুমকির কথা উল্লেখ করে কান্নাজড়িত কণ্ঠে ডলি আক্তার বলেন, ‘আমার মেয়েকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। এখন আমি ন্যায়বিচার চাই। উল্টো হুমকি দেওয়া হচ্ছে। বলা হচ্ছে, মামলা না তুললে আমার আরেক সন্তানকে খুন করবে। আমি দিনরাত আতঙ্কে আছি। আমি প্রশাসনের কাছে নিরাপত্তা চাই।’

তিনি আরো বলেন, রাজনৈতিক নেতা পরিচয়ে আসামিপক্ষের লোকজন মীমাংসার নাম করে ভীতি প্রদর্শন করেছে।

টিটু সরদার অভিযোগ করেন, তাদের এখন বাড়ি থেকে বের হওয়াতেও ভয় লাগে; ছেলে স্কুলে যেতে পারছে না। ‘কে কখন কী করবে—এই ভয়ে আমরা কাঁপছি,’ তিনি বলেন।

তিনি জানান, বিচার চাইতে গিয়ে এখন তাদের মনে আরও বড় বিপদের আশঙ্কা কাজ করছে। ‘ওরা প্রকাশ্যে হুমকি দিচ্ছে—মামলায় আপস না করলে তারা আমাদের মেরে ফেলবে’—এমন আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন তিনি।

তবু তিনি বলেন, ‘আমি মরণ হলেও মেয়ে হত্যার বিচার চাই। দেশবাসীর কাছে দোয়া ও নিরাপত্তা চাই।’

তাইয়েবা হত্যার প্রতিবাদে রোববার ভোরে স্থানীয়রা প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে এবং পরবর্তীতে সখিপুর থানা ঘেরাও করে—আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন। মানববন্ধনে অংশ নেওয়া দশম শ্রেণির ছাত্রী লামিয়া অভিযোগ করেন—মানববন্ধনে যাওয়ার পথে আয়েশার স্বামী সাহান সরদার তাকে বলেছিল, ‘আমরা যদি মানববন্ধন করি তাহলে আমাদের লাশ খুঁজে পাওয়া যাবে না।’

তিনি আরো বলেন, আয়েশার ছেলে আকিব তাদের মানববন্ধনকারীদের ভিডিও করে নিয়েছে এবং তারা কাউকেই স্কুলে যেতে দেবে না বলে হুমকি দিয়েছে।

লামিয়া বলেন, ‘আমরা এসব ভয় পাই না; তাইয়েবা হত্যার বিচার চাই।’

পড়শি আবুল কাশেম মিয়া বলেন, শিশু হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের সঠিক বিচার না হলে সমাজে ভয়াবহ নজির স্থাপন হবে।

তিনি মনে করেন, বাদী পরিবারকে যদি এইভাবে হুমকি দেওয়া হয়, ভবিষ্যতে আর কেউ মামলা করার সাহস পাবে না। প্রশাসনের দ্রুত তদন্ত করে হত্যায় জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবি তুলেছেন তিনি এবং বলেন, ‘আয়েশার স্বামী সাহান সরদার, ছেলে আকিব, ননদ রিনা ও রুমাকে আটক করলে এ ঘটনার অনেক তথ্য পাওয়া যাবে।’

সখিপুর থানা ইনচার্জ মো. ওবায়দুল হক সংবাদমাধ্যমকে জানান, হত্যাকাণ্ডে জড়িত সব আসামিকে আইনের আওতায় আনার জন্য পুলিশ কাজ করছে।

তিনি বলেন, বাদী পরিবার হুমকির বিষয়ে লিখিত অভিযোগ দিলে পুলিশ তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেবে এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। হুমকিদাতাদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন।

Visited 17 times, 1 visit(s) today