কার্ড-নাম সবই আছে, হতদরিদ্রের চাল যায় কার ঝোলায়? মৃতের নামেও তোলা হচ্ছে চাল!

কার্ড-নাম সবই আছে, হতদরিদ্রের চাল যায় কার ঝোলায়? মৃতের নামেও তোলা হচ্ছে চাল!
শেয়ার করুন

ইউএনওর প্রশ্ন: ‘কার বাড়ি কোন সমস্যা সেটা ইউএনও দেখবে নাকি?’

জেলা প্রতিনিধি

মাস্টাররোলে নাম আছে, হাতে রয়েছে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির কার্ডও। তারপরও এক বছরের বেশি সময় ধরে ১৫ টাকা কেজি দরের চাল পাননি সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলার যমুনাপারের অনেক কার্ডধারী উপকারভোগী।

এমন অভিযোগ জানিয়ে সম্প্রতি তদারকি (ট্যাগ) কর্মকর্তার কাছে হাজির হন ভুক্তভোগীরা। তাদের বক্তব্য- গত বছরের ৫ই আগস্টের পর থেকে তারা আর কোনো চাল পাননি। অথচ বিতরণের মাস্টাররোলে এসব কার্ডধারীদের নাম নিয়মিত রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন তদারকি কর্মকর্তা মামুন সিরাজ।

অভিযোগ উঠেছে—চৌহালীর দুর্গম চরাঞ্চলস্থ স্থল ইউনিয়নের ডিলার মো. হাসান আলী স্থানীয় খাদ্য নিয়ন্ত্রণ দপ্তর ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় বরাদ্দকৃত চাল কালোবাজারে বিক্রি করে আসছেন।

তথ্য অনুযায়ী, ৫৮৭ কার্ডধারীর জন্য সমপরিমাণ ৫৮৭ বস্তা চাল বরাদ্দ পান হাসান আলী। প্রতিজন উপকারভোগীর প্রাপ্য—১৫ টাকা কেজি দরে ৩০ কেজি চাল। কিন্তু কার্ডধারীদের অভিযোগ, তিনি আংশিক চাল বিতরণ করে বাকিটা কালোবাজারে সরিয়ে দেন।

হতদরিদ্র কার্ডধারী মোছা. হাসিনা খাতুন (হাঁটার চর), রশিদুল কাজী (নওহাটা), সাথী খাতুন (নয়াপাড়া) অভিযোগ করেন, “আমাদের কার্ড আছে। কিন্তু গত এক বছরে কোনো চাল পাইনি।”

একই কথা জানান সন্তোষা গ্রামের সিরাজুল ইসলাম, দিঘলবাড়ির আলেক চান, ফলসাটিয়ার আব্দুল্লাহ এবং নওহাটার কোরবান আলীও।

এমনকি মৃত ব্যক্তির নামেও চাল উত্তোলনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। নওহাটার গোলজার শেখ মারা গেছেন কয়েক মাস আগে। তবু মাস্টাররোলে তার নাম দেখানো হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে গোলজারের ছেলের বউ রুমা খাতুন বলেন, “আমার মৃত শ্বশুরের নামে চাল কে উত্তোলন করছে আমরা জানি না।”

আরেকজন কার্ডধারী মোছা. শাফি খাতুন তিন বছর ধরে নারায়ণগঞ্জে থাকেন। তারপরও তার নামে কার্ড করে চাল উত্তোলনের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

জানা যায়, গত ২৪ থেকে ২৬ আগস্ট পর্যন্ত হাসান আলী ৫৮৭ বস্তার মধ্যে ২৯০ বস্তা চাল বিতরণ করেন। কিন্তু অবশিষ্ট চাল বিতরণ না করেই মাস্টাররোলে স্বাক্ষর নেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি।

দায়িত্বপ্রাপ্ত ট্যাগ অফিসার মামুন সিরাজ বলেন, “১১ আগস্ট আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। আমি ২৪ থেকে ২৬ আগস্ট পর্যন্ত নিজে উপস্থিত থেকে ২৯০ বস্তা চাল বিতরণ করেছি। দ্বিতীয় চালান ওঠার পর বিতরণের কথা থাকলেও আমাকে জানানো হয়নি। বরং ডিলার মাস্টাররোলে স্বাক্ষর চাইলে আমি আপত্তি জানাই এবং বিষয়টি ইউএনওকে অবহিত করি।”

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ডিলার হাসান আলী বলেন, “আমি নিয়ম অনুযায়ী যাদের কার্ড আছে তাদেরই চাল দিয়েছি।”

চৌহালী উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (অ.দা.) আনোয়ার হোসেন জানান, চাল বিতরণে অনিয়ম নিয়ে ট্যাগ অফিসার অভিযোগ করেছেন। এ বিষয়ে ইউএনও তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন।

কিন্তু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, তার কাছে কেউ আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করেনি।

তিনি মন্তব্য করেন, “সাংবাদিক ফোন দিয়েছিলেন, তবে অন্য কাজে ব্যস্ত ছিলাম।”

তাকে প্রশ্ন করা হয় সাংবাদিকের মাধ্যমে বিষয়টি জানার পর খোঁজ নিয়েছিলেন কিনা। জবাবে তিনি বলেন, “তাহলে পেট ব্যথা যার, সে খোঁজ না নিয়ে ডাক্তারই খোঁজ নেবে—এটা কি সম্ভব? কার বাড়ি কোন সমস্যা সেটা ইউএনও দেখবে নাকি? আপনি তো একটি নিয়ে থাকেন, আমি হাজারও সমস্যা নিয়ে থাকি।”

Visited 6 times, 1 visit(s) today