বাগরাম বিমানঘাঁটি ফেরত চান ট্রাম্প: চীনের পরমাণু-হুমকির মাঝেই নতুন করে উত্তপ্ত আফগান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক

বাগরাম বিমানঘাঁটি ফেরত চান ট্রাম্প: চীনের পরমাণু-হুমকির মাঝেই নতুন করে উত্তপ্ত আফগান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক
শেয়ার করুন

আন্তর্জাতিক

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন সরকার আফগানিস্তানের বাগরাম বিমানঘাঁটি (বাগরাম এয়ার বেস) ফেরত নেওয়ার জন্য ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করছে। চীনের নিউক্লিয়ার অস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্রের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে এই ঐতিহাসিক সামরিক ঘাঁটিকে ‘কৌশলগতভাবে অপরিহার্য’ বলে ট্রাম্প বর্ণনা করেছেন।

তবে তালেবান শাসিত আফগান সরকার এই দাবিকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে দিয়েছে, যা দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলেছে।

ট্রাম্প গত ১৮ই সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টার্মারের সঙ্গে চেকার্সে একটি যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এই বিষয়ে প্রথমবার স্পষ্ট করে বলেন।

তিনি বলেন, “আমরা বাগরাম ফেরত নেওয়ার চেষ্টা করছি। এটা একটা বড় ব্রেকিং নিউজ হতে পারে। তারা (তালেবান) আমাদের কাছ থেকে অনেক কিছু চায়, আর আমরা এই ঘাঁটি চাই। এটি চীনের নিউক্লিয়ার অস্ত্র তৈরির স্থান থেকে মাত্র এক ঘণ্টার দূরত্বে।”

ট্রাম্পের মতে, বাইডেন-হ্যারিস প্রশাসনের ২০২১ সালের অগোছালো প্রত্যাহারে এই ঘাঁটি ‘কোনো লাভ ছাড়াই’ তালেবানের হাতে তুলে দেওয়া হয়, যা একটি ‘টোটাল ডিজাস্টার”‘ ছিল।

বাগরাম এয়ার বেস, যা ১৯৫০-এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন নির্মাণ করে, ৯/১১-এর পর মার্কিন সেনাবাহিনীর আফগানিস্তান অভিযানের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। এর ৩.৬ কিলোমিটার লম্বা রানওয়ে ভারী বোমার এবং কার্গো বিমানের জন্য উপযোগী, এবং এটি কাবুলের উত্তরে ৪০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে এই ঘাঁটি ফেরত নেওয়ার প্রচেষ্টা কয়েক মাস ধরে চলছে বলে সূত্র জানিয়েছে, যাতে তালেবানের সঙ্গে গোপন আলোচনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

তালেবানের প্রতিক্রিয়া তীব্র হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা জাকির জালালি বলেন, “আফগানরা ঐতিহাসিকভাবে কোনো বিদেশি সামরিক উপস্থিতি মেনে নেয়নি। এটি দোহা চুক্তিতে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। আমরা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কের জন্য দরজা খোলা রেখেছি, কিন্তু সামরিক উপস্থিতি অসম্ভব।”

তালেবানের উপ-প্রধানমন্ত্রী মুহাজির ফারাহি একটি কবিতার অংশ শেয়ার করে বলেন, “যারা আমাদের সঙ্গে লড়াই করেছে, তাদের মন এখনও শান্তি খুঁজছে না। বাগরাম আফগানিস্তানের।”

২০শে সেপ্টেম্বর ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে আরও কঠোর সতর্কতা জারি করেন: “যদি আফগানিস্তান বাগরাম এয়ার বেস ফেরত না দেয়, তাহলে খারাপ জিনিস ঘটবে!”

পরদিন সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা আফগানিস্তানের সঙ্গে কথা বলছি। আমরা এটি দ্রুত চাই। যদি তারা না দেয়, তাহলে আমি কী করব তা জানতে পারবে।”

তবে ট্রাম্প সৈন্য পাঠানোর সম্ভাবনা নিয়ে স্পষ্ট কোনো উত্তর দেননি।

এই ঘটনায় চীনের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। ট্রাম্প দাবি করেছেন যে চীন এখন বাগরাম নিয়ন্ত্রণ করছে এবং এখানে পাইলট প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।

কিন্তু চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জায়ান বলেন, “চীন আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা সম্মান করে। আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ আফগান জনগণের হাতে।”

বিবিসির একটি তদন্তে দেখা গেছে, ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বাগরামে চীনা কার্যকলাপের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

এই দাবি ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের ডোহা চুক্তির (২০২০) সঙ্গে জড়িত, যা মার্কিন প্রত্যাহারের পথ প্রশস্ত করে কিন্তু বাগরামের কথা উল্লেখ করে না।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি আফগানিস্তান নিয়ে নয়, বরং চীনের সঙ্গে মহাশক্তি প্রতিযোগিতার অংশ। আসন্ন এপেক সম্মেলনে জি জিনপিংয়ের সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠকের আগে এটি একটি কৌশলগত বার্গেনিং চিপ হতে পারে।

যদিও ট্রাম্পের সমর্থকরা এটিকে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির বিজয় বলে দেখছেন, সমালোচকরা সতর্ক করছেন যে এটি আফগানিস্তানে নতুন যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তালেবানের সঙ্গে পুনরায় যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা চললেও, বাগরাম ফেরত নেওয়া সহজ নয়—যা ২০ বছরের যুদ্ধের ক্ষত স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। পরিস্থিতি আরও জটিল হলে দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।

Visited 9 times, 1 visit(s) today