চাকরি না করে উদ্যোক্তা হওয়ার আহ্বান ড. ইউনূসের: কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যর্থতা ঢাকার চেষ্টা?

চাকরি না করে উদ্যোক্তা হওয়ার আহ্বান ড. ইউনূসের: কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যর্থতা ঢাকার চেষ্টা?
শেয়ার করুন

মৃণ্ময় সেন

বাংলাদেশের তরুণরা ২০২৪ সালের কোটাবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে একটি বিপ্লবী পরিবর্তন ঘটিয়েছে। শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটিয়ে নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার পদে বসলেন। এই আন্দোলনের মূলে ছিল সরকারি চাকরিতে কোটার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, যা তরুণদের মধ্যে চাকরির সুযোগের অভাব এবং মেধাভিত্তিক নিয়োগের দাবিকে প্রতিফলিত করেছিল। কিন্তু এক বছরেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও, ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে কর্মসংস্থানের পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।

এরই মধ্যে ড. ইউনূস তরুণদের চাকরির পিছনে না ছুটে উদ্যোক্তা হওয়ার আহ্বান জানালেন, যা অনেকের কাছে সরকারের কর্মসংস্থান সৃষ্টির ব্যর্থতা ঢাকার একটি কৌশল বলে মনে হচ্ছে।

প্রথমত, ড. ইউনূসের এই আহ্বানের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় দেখা যায় যে, এটি তরুণদের ব্যক্তিগত উদ্যোগের উপর জোর দিয়ে সরকারের দায়িত্ব থেকে বিমুখতা প্রকাশ করে।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত, বাংলাদেশের বেকারত্বের হার ৪.৬৩% এ পৌঁছেছে, যা ঐতিহাসিকভাবে সর্বোচ্চ এবং প্রায় ২৭.৪ লক্ষ মানুষকে বেকার করে রেখেছে। এর মধ্যে তরুণ বেকারত্বের হার আরও উদ্বেগজনক, বিশেষ করে উচ্চশিক্ষিত যুবক-যুবতীদের মধ্যে, যা ২৭.৮% এ পৌছেছে।

ড. ইউনূসের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে (আগস্ট ২০২৪) দেশে চাকরির ক্ষতি হয়েছে বিপুল পরিমাণে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গার্মেন্টস সেক্টরে ২১ লক্ষ চাকরি হারিয়েছে, যার মধ্যে ৮৫% এর বেশি মহিলা শ্রমিক।

আওয়ামী লীগের অভিযোগ অনুসারে, গত এক বছরে ১ কোটিরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, যা অর্থনৈতিক সংকটের একটি স্পষ্ট চিত্র।

এছাড়া, বেক্সিমকো গ্রুপের মতো বড় কোম্পানিতে ১৫টি ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে অর্ধলক্ষাধিক শ্রমিকের চাকরি গেছে, এবং মোট ১৪০টিরও বেশি টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়েছে, যার ফলে প্রায় ১ লাখের বেশি মানুষ কর্মহীন হয়েছে।

দেশী-বিদেশী বিনিয়োগের অভাবে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি; বিদেশী বিনিয়োগ ৭০% কমেছে, এবং ইনভেস্টমেন্ট-টু-জিডিপি রেশিও ৩০.৭০% এ নেমে এসেছে। সরকারের সকল নিয়োগও বন্ধ রয়েছে, যা কোটা আন্দোলনের দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এই পরিস্থিতিতে উদ্যোক্তা হওয়ার আহ্বান জানানোর মানে কি সরকারের অক্ষমতা স্বীকার করে তরুণদের উপর ভার চাপিয়ে দেওয়া?

এটি একটি অবাস্তব আহ্বান, কারণ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বেসরকারি খাত ৯৫% শ্রমিককে নিয়োগ করে, কিন্তু এখন সেই খাতও সংকটে পড়েছে ক্রেডিট গ্রোথ ৭% এ নেমে এসেছে এবং ক্যাপিটাল মেশিনারি আমদানি ৩৪% কমেছে।

দ্বিতীয়ত, ড. ইউনূসের উপদেশটি তার নিজের মাইক্রোফাইন্যান্সের দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও, বর্তমান রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অস্থিরতায় এর কার্যকারিতা নেই।

তিনি ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) অনুষ্ঠানে বলেছেন, “মানুষ চাকরির জন্য জন্মায় না, উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য জন্মায়” এবং তরুণদের প্রযুক্তির সাহায্যে উদ্যোক্তা হতে উৎসাহিত করেছেন। এটি তার গ্রামীণ ব্যাংকের সাফল্যের স্মৃতি জাগায়, কিন্তু বর্তমানে যখন মুদ্রাস্ফীতি ৯.০৫% এ রয়েছে, বিদেশী সাহায্য কমছে এবং ট্রাম্প প্রশাসনের ২০% ট্যারিফের কারণে গার্মেন্টস রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত, তখন ছোট উদ্যোগ শুরু করা কতটা সম্ভব?

ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের অনুমানে, ২০২৫ সালের মধ্যে অতিরিক্ত ৩০ লক্ষ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাবে। তরুণরা যদি উদ্যোক্তা হয়ে ওঠে, তাহলে কে তাদের ক্যাপিটাল প্রদান করবে? সরকারের নতুন রিনিউয়েবল এনার্জি পলিসি বা ডিজিটাল ইকোনমির উদ্যোগগুলো এখনও ফলপ্রসূ হয়নি।

এই উপদেশটি আদর্শগতভাবে ভালো হলেও, বাস্তবে এটি তরুণদের হতাশা বাড়ায়, কারণ সরকারের দায়িত্ব হলো অবকাঠামো গড়ে তোলা, বিনিয়োগ আকর্ষণ করা এবং নতুন চাকরি সৃষ্টি করা—যা ড. ইউনূসের সরকার করতে ব্যর্থ হয়েছে। এটি কি চাকরির সংকট ঢাকার একটি প্রচারণা? কারণ আন্দোলনের তরুণরা চাকরির দাবি করেছিল, উদ্যোক্তা হওয়ার নয়।

তৃতীয়ত, এই উপদেশের ফলে তরুণদের মধ্যে একটি বিভ্রান্তি সৃষ্টি হচ্ছে, যা দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে বাধাগ্রস্ত করবে। বাংলাদেশের যুবকরা ইতিমধ্যে NEET (না শিক্ষার্থী, না কর্মরত, না প্রশিক্ষণরত) হিসেবে ২/৩ অংশ নিয়ে আছে, বিশেষ করে মহিলাদের মধ্যে। সরকারের নিয়োগ বন্ধ এবং বেসরকারি খাতের সংকোচনের কারণে চাকরির বাজার সংকুচিত হয়েছে, কিন্তু উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ (যেমন সহজ ঋণ, মার্কেট অ্যাক্সেস, নিরাপদ পরিবেশ) নেই।

ড. ইউনূসের সরকার সংস্কার কমিশন গঠন করেছে এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কিন্তু অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া এসব শুধু কাগজের উপর। এই আহ্বান তরুণদের স্বপ্নকে ব্যক্তিগত স্তরে সীমাবদ্ধ করে, যখন জাতীয় স্তরে কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য সরকারের কৌশলগত পরিকল্পনা দরকার। এটি একটি ব্যর্থতার অস্বীকার, যা তরুণদের হতাশা আরও গভীর করবে।

ড. ইউনূসের উদ্যোক্তা হওয়ার উপদেশটি তার দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে মিললেও, বর্তমান কর্মসংস্থান সংকটের আলোকে এটি অকার্যকর এবং সমালোচনীয়। সরকারের ব্যর্থতা—চাকরির ক্ষতি, বিনিয়োগের অভাব এবং নিয়োগ বন্ধ—যদি ঢাকতে চায়, তাহলে তরুণদের উপর দায় চাপানো অন্যায়। পরিবর্তে, সরকারকে অবিলম্বে বিনিয়োগ আকর্ষণ, শিল্প পুনরুজ্জীবন এবং মেধাভিত্তিক নিয়োগের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। অন্যথায়, এই আহ্বান শুধু তরুণদের হতাশা বাড়াবে, দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে বিলম্বিত করবে। তরুণরা বিপ্লব করেছে পরিবর্তনের জন্য, এখন সরকারের পালা।

Visited 17 times, 1 visit(s) today