সংস্কারের প্রতিশ্রুতি নাকি পুরানো রীতির পুনরাবৃত্তি? স্বাস্থ্য উপদেষ্টার সিঙ্গাপুর চিকিৎসা নিয়ে ইউনূস সরকারের দ্বৈততা নিয়ে প্রশ্ন

সংস্কারের প্রতিশ্রুতি নাকি পুরানো রীতির পুনরাবৃত্তি? স্বাস্থ্য উপদেষ্টার সিঙ্গাপুর চিকিৎসা নিয়ে ইউনূস সরকারের দ্বৈততা নিয়ে প্রশ্ন
শেয়ার করুন
নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকা, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫: আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও মন্ত্রীদের বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার প্রবণতা নিয়ে তীব্র সমালোচনা হয়েছিল। জনগণের ট্যাক্সের অর্থে বিদেশে চিকিৎসা এবং দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতি অবিশ্বাসের অভিযোগে আওয়ামী লীগ সরকার ব্যাপকভাবে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছিল। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল পুরানো রীতি ভেঙে ‘সংস্কারবাদী’ পদ্ধতিতে নতুন মানদণ্ড প্রতিষ্ঠার। কিন্তু এই প্রতিশ্রুতির বিপরীতে, খোদ স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ উপদেষ্টা নুরজাহান বেগমের সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা নিতে যাওয়ার ঘটনা এবং আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের ২০২০ সালের একটি ফেসবুক পোস্টের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির দ্বৈততা জনমনে প্রশ্ন তুলেছে: সংস্কারের নামে কি শুধু মনভোলানো কথা বলা হচ্ছে, নাকি ইউনূস সরকার পুরানো পথেই হাঁটছে এবং জনগণকে ধোঁকা দিচ্ছে?

গত সপ্তাহে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নুরজাহান বেগম সিঙ্গাপুরে চিকিৎসার জন্য যান, যা সরকারের সংস্কারবাদী দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সরকারি সূত্র জানিয়েছে, তাঁর চিকিৎসার খরচ সরকার বহন করেনি, এবং এটি তাঁর ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য জটিলতার কারণে হয়েছে। তবে, এই ঘটনা সরকারের প্রতি জনগণের আস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। স্বাস্থ্য খাতের দায়িত্বে থাকা একজন উপদেষ্টার দেশের বাইরে চিকিৎসা নেওয়া দেশীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতি অবিশ্বাসেরই প্রতিফলন বলে অনেকে মনে করছেন।

আরও আকর্ষণীয় যে, এই ঘটনার পটভূমিতে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের ২০২০ সালের ১২ জুন তারিখের একটি ফেসবুক পোস্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক প্রোফাইলে পোস্টে তিনি লিখেছিলেন,

“যদি ক্ষমতা থাকতো আইন করতাম: বর্তমান বা সাবেক প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীগণ চিকিৎসা নিতে বিদেশে যেতে পারবেন না। ক্ষমতা, চাকুরী বা ব্যবসা কোনভাবেই তাদের সন্তানরা সরকারের সাথে সংশ্লিষ্ট হতে পারবেন না।

সপ্তাহে অন্তত একদিন তাদের গণপরিবহনে চড়তে হবে। রাস্তায় চলাকালে তারা অন্য একটি যানবাহনও থামিয়ে রাখতে পারবেন না।

বিদেশ গমনের ক্ষেত্রে তারা অতিজরুরী ছাড়া কোন সফরসঙ্গী নিতে পারবেন না, এবিষয়ে সংসদকে জানাতে হবে। জনগণের টাকায় কোন কিছু উদ্বোধন বা জনগণকে সাহায্য করার ক্ষেত্রে তাদের নিজেদের নাম ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হবে।

তাদেরকে মহামান্য ও মাননীয় বলা নিষিদ্ধ হবে। তাদের ও তাদের পরিবারের দেশে বিদেশে সকল সম্পত্তি ও আয়ের বিবরণ জনগণকে জানাতে হবে। দুদকের একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ইউনিট শুধুমাত্র তাদের বিষয়ে নজর রাখবে। অন্যান্য ক্ষেত্রেও আরও বহু কিছু করতাম।

যারা লুটেরা, চোর আর সন্ত্রাসী—তাদের জীবন নরক বানিয়ে ছাড়তাম।” এই পোস্টটি ৮৩ হাজার লাইক এবং ২৫ হাজার মন্তব্য পেয়েছিল, যা ড. নজরুলের সংস্কারবাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রমাণ হিসেবে দেখা হয়েছিল।

কিন্তু আজ ক্ষমতায় থাকা ড. আসিফ নজরুলের সরকারে সেই পুরানো রীতি অব্যাহত থাকায় সমালোচনা তীব্র হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যা নিয়ে তিনি এবং অনেক উপদেষ্টা ও আন্দোলনকারী তীব্র সমালোচনা করতেন, আজ সেই ঘটনা আরো তীব্র ভাবেই ঘটছে।

স্বাস্থ্য উপদেষ্টার সিঙ্গাপুর যাত্রা এবং ড. নজরুলের পুরানো পোস্টের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা জনমনে প্রশ্ন তুলেছে:  কিছুই কি বদলায়নি?

ড. নজরুল এখনও এই ঘটনায় কোনো মন্তব্য দেননি, কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এটি ব্যাপক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিদেশে চিকিৎসার জন্য বছরে শত শত কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলে অভিযোগ ছিল।  এই প্রবণতাকে ‘দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ব্যর্থতা’ হিসেবে দেখা হতো।

ইউনূস সরকার ক্ষমতায় এসে দাবি করেছিল যে তারা এই ধরনের রীতি ভেঙে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় আস্থা ফিরিয়ে আনবে। কিন্তু নুরজাহান বেগমের সিঙ্গাপুর যাত্রা এবং ড. আসিফ নজরুলের পুরানো পোস্টের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির দ্বৈততা সেই প্রতিশ্রুতির বিপরীত দৃষ্টান্ত।

ঢাকার একজন চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “যিনি আইন করে বিদেশ চিকিৎসা নিষিদ্ধ করতে চেয়েছিলেন, আজ তার সরকারে সেই রীতি অব্যাহত। এতে কি কিছু বদলালো?”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ঘটনা ইউনূস সরকারের দ্বৈত মানদণ্ডের প্রমাণ। একদিকে তারা সংস্কারের বড় বড় কথা বলছেন, অন্যদিকে পুরানো অভ্যাস অব্যাহত রেখেছেন।

আওয়ামী লীগের একজন স্থানীয় নেতা বলেন, “ড. আসিফ নজরুল যা নিয়ে আওয়ামী লীগকে সমালোচনা করতেন, আজ তার সরকারে সেই ঘটনা ঘটছে। এটি জনগণের সঙ্গে প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়।” জনগণের মধ্যেও ক্ষোভ বাড়ছে।

ঢাকার একজন বাসিন্দা বলেন, “আমরা ভেবেছিলাম ইউনূস সরকার পুরানো ভুলগুলো শুধরে নতুন কিছু করবে। কিন্তু স্বাস্থ্য উপদেষ্টার এই পদক্ষেপ এবং ড. আসিফ নজরুলের পুরানো পোস্টের সঙ্গে বর্তমান অসঙ্গতি দেখিয়ে দিলো যে কিছুই বদলায়নি।”

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এই ঘটনা নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে, যেখানে অনেকে ইউনূস সরকারের ‘সংস্কারবাদী’ দাবিকে ‘মিথ্যা প্রতিশ্রুতি’ বলে অভিহিত করছেন। ইউনূস সরকারের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা। স্বাস্থ্য খাতে সংস্কারের জন্য দেশীয় হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিদেশে চিকিৎসার প্রবণতা বন্ধ করা জরুরি।

অন্যথায়, সংস্কারের নামে জনগণকে ধোঁকা দেওয়ার অভিযোগ আরও জোরালো হবে। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, সংস্কারবাদী সরকারের প্রতিশ্রুতি এখনও কেবল কথার কথা, এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণে তারা অনেক পিছিয়ে আছে।

Visited 10 times, 1 visit(s) today