এ,এস,এম শরিফুল হাসান
ভূমিকা
আন্দোলনের নেতৃত্ব কীভাবে গঠন করে দেশের ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করে, তা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ইতিহাস থেকে স্পষ্ট। নেপালের জেন-জি আন্দোলনের সভাপতি দিবাকর দাঙ্গাল এবং আমেরিকার মার্কিন জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা চার্লি কার্কের নেতৃত্ব যুবকদের উদ্দীপ্ত করে দেশপ্রেম এবং সংস্কারের পথ দেখিয়েছে, কিন্তু ক্ষমতা দখল থেকে বিরত থেকে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের জুলাই ২০২৪-এর ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বদাতা ছাত্র সমন্বয়করা (যেমন- বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা) কোটা সংস্কারের নামে শুরু হওয়া আন্দোলনকে সরকারবিরোধী বিপ্লবে রূপান্তরিত করে শেখ হাসিনার সরকার উৎখাত করেছেন। কিন্তু এর পরবর্তী পর্যায়ে তারা ক্ষমতায় অংশগ্রহণ করে দুর্নীতি, হত্যা এবং লুটপাটের সংস্কৃতি ছড়িয়ে যুবসমাজকে ধোঁকা দিয়েছে। এই বিশ্লেষণে তাদের নেতৃত্বের তুলনা করে দেখানো হবে কীভাবে বাংলাদেশের ছাত্র নেতৃত্ব আন্দোলনের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে যুবকদের পথভ্রষ্ট করেছে।
দিবাকর ডাঙ্গালের নেতৃত্ব: উদ্দীপনা এবং পরিণতি
নেপালের জেন-জি আন্দোলন (সেপ্টেম্বর ২০২৫) দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক জড়তার বিরুদ্ধে যুবকদের বিদ্রোহ ছিল। সভাপতি দিবাকর দাঙ্গাল এই আন্দোলনকে নেতৃত্ব দিয়ে সংসদ ভেঙে নতুন সংবিধান সংশোধনের দাবি তোলেন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কি বা বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের প্রাক্তন প্রধান কুলমান ঘিসিং-এর মতো নিরপেক্ষ ব্যক্তির নাম প্রস্তাব করেন।
দাঙ্গাল স্পষ্টভাবে বলেন, “আমরা এখনও নেতৃত্ব নেওয়ার জন্য পরিপক্ক নই; এটি আমাদের সময় লাগবে।”
বিক্ষোভে ৩৪ জনের মৃত্যু ঘটালেও, তারা ক্ষমতা থেকে বিরত থেকে ‘ওয়াচডগ’ (প্রহরী) হিসেবে কাজ করার ঘোষণা দেন। ফলে, নেপালের যুবকরা দেশপ্রেম এবং সংস্কারের প্রতি উদ্দীপ্ত হয়েছে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে, কিন্তু ব্যক্তিগত ক্ষমতালোভ এড়িয়েছে। এটি তরুণ সমাজকে তাৎক্ষণিক লাভের পেছনে না ছুটে দীর্ঘমেয়াদী পরিবর্তনের পথ দেখিয়েছে।
চার্লি কির্কের নেতৃত্ব: যুবকদের জাতীয়তাবাদী উদ্দীপনা
চার্লি কার্ক (১৯৯৩-২০২৫), আমেরিকার টার্নিং পয়েন্ট ইউএসএ (টিপিইউএসএ)-এর প্রতিষ্ঠাতা, ১৮ বছর বয়সে রক্ষণশীল যুব আন্দোলন শুরু করেন। তিনি মার্কিন জাতীয়তাবাদকে ‘গর্বের বিষয়’ হিসেবে প্রচার করে তরুণ সমাজকে দেশকে নতুনভাবে ভালোবাসতে উৎসাহিত করেন। তার ‘দ্য ম্যাগা ডকট্রিন’ বই এবং পডকাস্ট (১২ কোটিরও বেশি ডাউনলোড) তরুণ সমাজকে অর্থনৈতিক সংরক্ষণবাদ, খ্রিস্টান জাতীয়তাবাদ এবং ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ এজেন্ডায় অনুপ্রাণিত করে।
কার্ক ক্যাম্পাস ইভেন্টে যুবকদের সাথে বিতর্ক করে তাদেরকে দেশের সমস্যা (যেমন বাজেট ঘাটতি, চীনের প্রভাব) নিয়ে চিন্তা করতে বাধ্য করেন। তিনি কখনো ক্ষমতায় নামেননি; বরং যুবকদের রাজনৈতিক সচেতনতা বাড়িয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো নেতাদের সমর্থনে কাজ করেন। তার মৃত্যুর পরও (২০২৫-এ একটি ইভেন্টে হত্যাকাণ্ডে), তার উত্তরাধিকার তরুণ সমাজকে ক্ষমতার অপব্যাবহারের শিকার না হয়ে দেশপ্রেমী করে তুলেছে।
চার্লি কার্ক জানতে শিখিয়েছেন, বোঝাতে শিখিয়েছেন, ভাবতে শিখিয়েছেন, প্রশ্ন করতে শিখিয়েছেন রাষ্ট্র পরিচালকদের। “আই হেইট পলিটক্স” এর ধারা বদলে দিয়ে মার্কিন যুবসমাজকে “উই আর পার্ট অব পলিটিক্স” এ দর্শনে যুক্ত করেছেন। যার ফলাফল দেখা গেছে ২০২৩-এর নির্বাচনে, যা যুব ভোটারদের টার্নআউটে ৩০ বছরের রেকর্ড।
বাংলাদেশের ছাত্র সমন্বয়কদের নেতৃত্ব: কোটা সংস্কার থেকে ক্ষমতা দখল এবং অস্তিত্বের সংকট
বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলন (২০২৪) কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হয়, যা মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের ৩০% চাকরির কোটা পুনর্বহালের বিরুদ্ধে ছিল। ছাত্র সমন্বয়করা (যেমন নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ, সারজিস আলম, মাহফুজ আলম প্রমুখ) এটিকে সরকারের দুর্নীতি, অর্থনৈতিক সংকট এবং বলপ্রয়োগের বিরুদ্ধে বিস্তৃত করে শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটান। এই আন্দোলনের ভাষা ছিল সহিংসতা, রাষ্ট্রীয় সম্পদের ধ্বংসসাধন করা এবং সরকার ও প্রসাশনকে আক্রমণ করে প্রতি আক্রমণে বাধ্য করা।
যার ফলে আন্দোলনে সাড়ে তিন শ-এরও বেশি মৃত্যু ঘটে। কিন্তু সরকারের পতনের পর, তারা অন্তর্বর্তী সরকারে (ড. ইউনূসের নেতৃত্বে) অংশ নেয় এবং এনসিপির মতো রাজনৈতিক দলে যোগ দেয়। এখান থেকে শুরু হয় ক্ষমতা দখলের যাত্রা। তারা সরকারী পদে নিয়োগ নেয়, কিন্তু এর ফলে দুর্নীতি, হত্যা এবং লুটপাটের অভিযোগ উঠে। প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলকে মাঠছাড়া করতে তারা মবসন্ত্রাস থেকে শুরু করে চাঁদাবাজি, হামলা, আগ্নিসংযোগসহ নানাবিধ সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ে শুধুমাত্র ক্ষমতার লোভে।
তাদের আন্দোলন শুধু পরিবর্তন, সংস্কার আর নতুন সূচনায় সিমীত ছিল না
তারা সেই পূর্বের ধারায় ক্ষমতায়িত হতে চেয়েছিল অর্থ ও প্রতিপত্তি প্রাপ্তির মাধ্যমে। আন্দোলনের এক মাসের মাথায় এটা পরিষ্কার হয়ে যায়, ছাত্র আন্দোলনাকারীরা ক্ষমতার হিস্যা চায়। যা প্রভাবিত করে ছাত্র আন্দোলনে পরের সকল সারিতে যোগ দেয়া সাধারণ মানুষকে। তারা ভাবতে থাকে, আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়ারা যেখানে ক্ষমতার হিস্যা আর অর্থ-সম্পদ অর্জনে ব্যাস্ত, আমরা কেন বঞ্চিত হবো? শুরু হয় এক অনাদি অনন্ত ক্যাওয়াস। যা ৩৬শে জুলাই শেষে ৩৯৬ দিন ধরে চলমান। এটা এমনভাবে বিস্তৃতি লাভ করেছে, যা সেনাবাহিনী, পুলিস প্রশাসন মিলে এক বছরেও নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ।

দাঙ্গাল এবং কার্কের নেতৃত্ব তরুণ সমাজকে দেশ নিয়ে চিন্তা করতে বাধ্য করে, কিন্তু ক্ষমতা থেকে দূরে থেকে আদর্শ রক্ষা করে। বাংলাদেশের ছাত্র নেতৃত্বের ক্ষেত্রে, আন্দোলনের পর তারা রাজনীতিতে ঝাঁপ দেয়, কিন্তু এটি মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাসকে অস্বীকার করে এবং তরুণ সমাজকে ‘মব সন্ত্রাস’ এর সংস্কৃতিতে টেনে নেয়।
বাংলাদেশের ছাত্র সমন্বয়করা কীভাবে যুবসমাজকে ধোঁকা দিয়েছে এবং পথভ্রষ্ট করেছে
ছাত্র আন্দোলন যুবকদেরকে গণতন্ত্র এবং সংস্কারের স্বপ্ন দেখিয়েছিল, কিন্তু নেতৃত্বের পরবর্তী পদক্ষেপগুলো এটিকে ধোঁকায় পরিণত করেছে:
১। ক্ষমতা দখল এবং রাজনৈতিকীকরণ: আন্দোলনের পর, সমন্বয়করা অন্তর্বর্তী সরকারে পদ লুফে নেয় এবং এনসিপি-এর মতো দল গঠন করে। এটি কোটা সংস্কারের আদর্শ থেকে বিচ্যুতি; তারা তরুণ সমাজকে ‘পরিবর্তনের নেতা’ বলে উপস্থাপন করে, কিন্তু বাস্তবে সিভিল সার্ভিস এবং সরকারী পদের অপব্যবহার করে দুর্নীতি ছড়ায়। যেমন, ২০২৫-এর প্রতিবেদনগুলো দেখায় যে, ছাত্র নেতৃত্বের অধীনে সরকারী পদে নিয়োগে পক্ষপাতিত্ব বেড়েছে, যা আন্দোলনের মূল দাবির বিপরীত।
২। দুর্নীতি এবং লুটপাটের সংস্কৃতি: আন্দোলনের নামে শুরু হওয়া ‘সংস্কার’ এখন হুমকি দিয়ে চাঁদা আদায় এবং লুটপাটে পরিণত। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০২৫ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্দোলনের পরবর্তী সহিংসতায় (যেমন হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর আক্রমণ) ছাত্র গ্রুপগুলো জড়িত, যা তারা অস্বীকার করে কিন্তু এর অবসান হয় না। এটি তরুণ সমাজকে শিক্ষা দেয় যে, আন্দোলন মানে লুটপাটের লাইসেন্স, আর দখল। ফলে, যুবকরা (১৮ মিলিয়ন বেকার) পরিবর্তে অরাজকতায় জড়িয়ে পড়ে।
৩। হত্যা এবং মব সন্ত্রাস: আন্দোলনের সময় পুলিশের হাতে তিনশো’র অধিক মৃত্যু ঘটলেও, পরবর্তীতে ছাত্র নেতৃত্বের অধীনে প্রতিপক্ষকে (যেমন আওয়ামী লীগ সমর্থকদের) হত্যা এবং ‘ধরিয়ে দেওয়ার কালচার’ শুরু হয়। জাতিসংঘের ধারণা, আন্দোলনের পর ১৩০+ মৃত্যুতে ছাত্র গ্রুপের ভূমিকা রয়েছে। তারা তরুণ সমাজকে ‘বিপ্লবী’ বলে উত্তেজিত করে, কিন্তু এটি হত্যাকাণ্ডের চক্রে পরিণত করে, যা তাদের জুলাই আন্ডলনকে কলঙ্কিত করে।
৪। জাতীয়তাবাদের অস্বীকার এবং পথভ্রষ্টতা: মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে ‘কোটার কারণ’ বলে অস্বীকার করে তারা বাঙালি জাতীয়তাবাদকে দুর্বল করে। যুবকরা যারা আন্দোলনে অংশ নিয়ে দেশপ্রেম শিখেছিল, তারা এখন দুর্নীতির শিকার; অনেকে বিদেশ পালিয়ে যাচ্ছে বা অপরাধে জড়াচ্ছে। এটি দাঙ্গাল বা কার্কের মতো উদ্দীপনার বিপরীত, যেখানে যুবকরা দেশের জন্য লড়াই শেখে, না হয় ধ্বংস।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আর নেতৃত্বকে নিয়ে বিতর্কিত সব মন্তব্য আর ভুল ইতিহাস ছড়িয়ে তাদের জুলাই আন্দোলনকে সব কিছুর উপরে স্থান দেয়ার চেষ্টা, যুবসমাজকে দেশাত্ববোধ, ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা, স্বাধীনতাকে নিয়ে গর্ব অনুভব করার বদলে দায়হীনতা আর ঘৃনা শেখায়। ফলে তাদের মধ্যে আদতে কোন দর্শন আর আদর্শ গড়ে ওঠে নাই বিগত এক বছরেও, যেই দর্শন আর আদর্শকে সমুন্নত রাখতে পেরেছিল দাঙ্গাল আরর চার্লি কার্ক
দাঙ্গাল এবং কার্কের নেতৃত্ব তরুণ সমাজকে দেশের সেবক করে তুলেছে, কিন্তু বাংলাদেশের ছাত্র সমন্বয়করা আন্দোলনকে ক্ষমতার হাতিয়ার বানিয়ে যুবসমাজকে ধোঁকা দিয়েছে। এটি শুধু পথভ্রষ্টতা নয়, বরং একটি প্রজন্মের আশাকে চূর্ণ করেছে। বাংলাদেশকে সত্যিকারের পরিবর্তনের জন্য নতুন নেতৃত্ব দরকার, যা ক্ষমতা ছাড়াই সংস্কার করতে পারে।
