❐ স্থানীয় সংবাদদাতা
সেন্টমার্টিন উপকূল থেকে আবারও ১৭ জন বাংলাদেশি জেলেকে অপহরণ করেছে মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি। রোববার সন্ধ্যায় তিনটি ট্রলারসহ তাদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। মাত্র ২৬ দিনের ব্যবধানে অপহৃত জেলের সংখ্যা দাঁড়াল ৭৮ জনে। গড়ে প্রতিদিন তিনজন করে মানুষ হারিয়ে যাচ্ছেন সমুদ্র থেকে।
ঘটনার পর থেকে সেন্টমার্টিন, টেকনাফ এবং আশেপাশের উপকূলজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিদিনের জীবিকার জন্য জেলেরা সমুদ্রে নামলেও এখন তারা চরম ভয়ের মধ্যে আছেন। সমুদ্রের পাশে দাঁড়ানো অনেক পরিবার চোখের জল ফেলে বলছেন—“আমাদের স্বজনেরা হয়তো আর ফিরবেন না।” অনেকে আবার অস্থায়ীভাবে মাছ ধরা বন্ধ রেখেছেন। এর ফলে দ্বীপ ও উপকূলের বাজারগুলোতেও মাছের সরবরাহ কমে যাচ্ছে।
গলাচিপার আফসার, আবু তাহের, মোহাম্মদ আলমগীর—এদের নাম আজ পরিসংখ্যানের তালিকায়। কিন্তু বাস্তবে তারা কারো বাবা, কারো স্বামী, কারো সন্তান।
পরিবারের সদস্যরা বলছেন, “প্রতিদিন শুধু খবরের অপেক্ষায় থাকি। সরকারের কেউ যদি একটু এগিয়ে আসতো!”
একজন অপহৃত জেলের স্ত্রী জানালার পাশে বসে সাংবাদিকদের বললেন—“আমার স্বামী ছাড়া সংসার কীভাবে চলবে? বাচ্চাদের মুখে খাবার তুলব কীভাবে?”
এত বড় সংকটের পরও ইউনূস সরকারের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেই। কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনী কেবল পর্যবেক্ষণ করছে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন।
বিজিবির এক কর্মকর্তা গত ২৮শে আগস্ট জানিয়েছিলেন, তখন পর্যন্ত ৫১ জন জেলে বন্দি রয়েছে। এর পর মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে আরও ২৭ জন বেড়ে এখন সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৮-এ। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো উদ্ধার অভিযান বা সামরিক প্রস্তুতির খবর পাওয়া যায়নি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এ ঘটনায় সক্রিয় পদক্ষেপ নেয়নি। মিয়ানমারের সঙ্গে কোনো উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়েছে কিনা সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য নেই। জাতিসংঘ বা আন্তর্জাতিক মহলে এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগও দেখা যায়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিবেশী দেশের সংঘাত বাংলাদেশকেও সরাসরি আঘাত করছে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার যেন অস্বস্তিকর নীরবতায় আছে।
প্রশ্ন উঠছে— ৭৮ জন জেলে কি কেবল সংখ্যার খাতায় বন্দি? প্রতিটি নামের পেছনে আছে একেকটি পরিবার, দুঃস্বপ্নে ভরা একেকটি রাত। স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়েও যদি নিজ সমুদ্রে গিয়ে নিরাপদে ফিরতে না পারেন, তবে স্বাধীনতার মানে কী?
বিশেষজ্ঞ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও জেলেরা বলছেন, এখনই জরুরি ভিত্তিতে অপহৃতদের উদ্ধারে পদক্ষেপ নিতে হবে। সমুদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত না করলে প্রতিদিন আরও মানুষ নিখোঁজ হবেন। সীমান্তে ও সমুদ্রে যৌথ নিরাপত্তা অভিযান চালানো ছাড়া এ সংকট সমাধান সম্ভব নয়।
