নিজস্ব প্রতিবেদক।
ঢাকা, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫: বাংলাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে সংগীত শিক্ষক নিয়োগের সরকারি প্রজ্ঞাপনের বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন প্রখ্যাত ইসলামি স্কলার শায়খ আহমাদুল্লাহ এবং মুফতি মিজানুর রহমান আজহারি। তারা স্কুলে বিশেষায়িত ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগের দীর্ঘদিনের জনদাবিকে উপেক্ষা করে সংগীত শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্তকে জনআকাঙ্ক্ষা পরিপন্থী ও অবিবেচনাপ্রসূত বলে অভিহিত করেছেন।
আহমাদুল্লাহর প্রশ্ন ও দাবি
বুধবার (৩ সেপ্টেম্বর) রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে শায়খ আহমাদুল্লাহ সরকারের উদ্দেশে প্রশ্ন রেখে বলেন, “কাদের খুশি করার জন্য গানের শিক্ষক নিয়োগে প্রজ্ঞাপন জারি করা হলো?” তিনি লিখেছেন, “প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিশেষায়িত ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হোক, এটা বহুকাল ধরে গণমানুষের প্রাণের দাবি ছিল। সেই দাবি আজও বাস্তবায়িত হয়নি। অথচ প্রাথমিকে গানের শিক্ষক নিয়োগের বিষয়ে সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।” তিনি আরও বলেন, “এই দেশে কত পার্সেন্ট মানুষ সন্তানকে গান শেখায়? কত পার্সেন্ট মানুষ স্কুলে গানের শিক্ষক চায়? বরং অধিকাংশ অভিভাবক চায়, বিদ্যালয়ে যেন তাদের সন্তানকে গান শেখানো না হয়।” তিনি উল্লেখ করেন যে, দেশের প্রায় সব অভিভাবক তাদের সন্তানদের ধর্মীয় শিক্ষার জন্য প্রাইভেট শিক্ষক নিয়োগ করেন বা মক্তবে পাঠান। স্কুলে বিশেষায়িত ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ হলে অভিভাবকদের এই বাড়তি খরচ ও ঝামেলা থেকে মুক্তি মিলত এবং শিক্ষার্থীদের সময় বাঁচত।
আজহারির নিন্দা ও উদ্বেগ
বৃহস্পতিবার (৪ সেপ্টেম্বর) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে মুফতি মিজানুর রহমান আজহারি সরকারের এই সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা জানান। তিনি লিখেছেন, “আমরা গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি, সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ইসলাম ধর্ম শিক্ষক নিয়োগে এদেশের অভিভাবকদের দীর্ঘদিনের দাবিকে উপেক্ষা করে, অযাচিতভাবে সংগীত শিক্ষক নিয়োগের ঘোষণা প্রদান করেছে। আমরা এই অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।” তিনি বলেন, “মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই দেশে প্রাথমিক স্তরে ইসলাম শিক্ষার জন্য বিশেষায়িত ধর্মীয় শিক্ষক নেই। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। অথচ সংগীতের মতো বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে ডেডিকেটেড শিক্ষক নিয়োগ স্পষ্টতই জনআকাঙ্ক্ষা পরিপন্থী। আমরা আমাদের সন্তানদের বিশ্বাস ও মূল্যবোধের নিরাপত্তা চাই।”
প্রাথমিক শিক্ষায় সংগীত শিক্ষক নিয়োগ
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের সংগীত ও শারীরিক শিক্ষার জন্য ৫,১৬৬ জন শিক্ষক নিয়োগের পরিকল্পনা চলছে। ‘সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা, ২০২৫’-এর খসড়া জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এই বিধিমালা চূড়ান্ত হলে সংগীত শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে।
আহমাদুল্লাহ ও আজহারির এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তাদের সমর্থকরা মনে করেন, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে ধর্মীয় শিক্ষার উপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। তবে, শিক্ষাবিদ ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা এই আপত্তির বিরোধিতা করে বলছেন, সংগীত শিক্ষা শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা বাড়ায়। তারা উল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলামের মতো কবি ও সংগীতজ্ঞরা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের সমন্বয় ঘটিয়েছেন। একজন শিক্ষাবিদ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “সংগীত ও শিল্পকলা শিক্ষা শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ ও সৃজনশীলতায় অবদান রাখে। এটিকে ধর্মের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হিসেবে দেখা অযৌক্তিক। ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি সংগীত শিক্ষাও শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।”
সরকারের অবস্থান
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এখনো এই বিতর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে, মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, জাতীয় শিক্ষানীতির অংশ হিসেবে সংগীত ও শারীরিক শিক্ষা শিক্ষার্থীদের বহুমুখী বিকাশে অবদান রাখে। ধর্মীয় শিক্ষার বিষয়ে সরকার ইতিমধ্যে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের মাধ্যমে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে, এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ধর্মীয় শিক্ষার বিষয়টি পাঠ্যক্রমের অংশ হিসেবে বিদ্যমান।
এই বিতর্ক বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক শিক্ষার ভারসাম্য নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, সরকারের উচিত অভিভাবক ও শিক্ষাবিদদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এমন একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা, যা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক শিক্ষার মধ্যে সমন্বয় সাধন করবে। অন্যথায়, এই ধরনের বিতর্ক সামাজিক বিভেদকে আরও তীব্র করতে পারে। শিক্ষাবিদরা আশা প্রকাশ করেছেন, সরকার শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক বিকাশের জন্য ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক শিক্ষার মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ পন্থা গ্রহণ করবে, যা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও ধর্মীয় মূল্যবোধকে সম্মান করার পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের সৃজনশীলতা ও নৈতিক বিকাশ নিশ্চিত করবে।
