নিজস্ব প্রতিনিধি। কক্সবাজার, ২৬ আগস্ট ২০২৫, মঙ্গলবার:
কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলায় মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় নেতা হাফেজ মাওলানা জাহাঙ্গীর আলম (৪৭) নিহত হয়েছেন। সোমবার (২৫ আগস্ট) রাত ১১টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত বছর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জাহাঙ্গীর আলম আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযুদ্ধের সমর্থকদের বিরুদ্ধে নির্যাতন ও উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন, যার কারণে তিনি বেপরোয়া আচরণের জন্য অভিযুক্ত ছিলেন।
দুর্ঘটনার বিবরণ জানা যায়, জাহাঙ্গীর আলম পেকুয়া সদর ইউনিয়ন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন এবং মইয়াদিয়া বায়তুল সালাত জামে মসজিদের খতিব ছিলেন। সোমবার রাতে এশার নামাজের পর তিনি মোটরসাইকেলে করে পেকুয়া বাজারের দিকে যাচ্ছিলেন। পথে গোঁয়াখালী সিরাদিয়া সড়কের বাইম্যাখালী তিন রাস্তার মোড়ে দ্রুতগতির আরেকটি মোটরসাইকেলের সঙ্গে তার মোটরসাইকেলের সংঘর্ষ হয়। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। স্থানীয়রা তাকে তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধার করে পেকুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় চিকিৎসকরা তাকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেন। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই পথে তার মৃত্যু হয়।
স্থানীয় প্রতিক্রিয়া ও অভিযোগ
নিহত জাহাঙ্গীর আলমের মৃত্যুর বিষয়টি স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য সাজ্জাদ হোসেন নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, জাহাঙ্গীর পূর্ব গোঁয়াখালী টেকপাড়ার বাসিন্দা বখতিয়ার উদ্দিনের ছেলে এবং পাঁচ সন্তানের জনক ছিলেন। তিনি জামায়াতে ইসলামীর একজন প্রভাবশালী নেতা হিসেবে এলাকায় পরিচিত ছিলেন।
তবে, স্থানীয়দের একাংশ জানিয়েছেন, ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জাহাঙ্গীর আলম আওয়ামী লীগের সমর্থক এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নানাভাবে নির্যাতন ও হুমকি প্রদানে জড়িত ছিলেন। তার বিরুদ্ধে একাধিকবার মব লেলিয়ে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। একজন স্থানীয় বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “তিনি এলাকায় বেপরোয়া আচরণ করতেন। তার এই কর্মকাণ্ডের কারণে অনেকেই তাকে ভয় পেতেন।”
পুলিশের বক্তব্য পেকুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জিয়াউর রহমান জানান, “দুর্ঘটনার বিষয়টি আমরা তদন্ত করছি। প্রাথমিকভাবে এটি একটি সড়ক দুর্ঘটনা বলে মনে হচ্ছে। তবে, জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ ছিল, সেগুলোও খতিয়ে দেখা হবে।” তিনি আরও বলেন, দুর্ঘটনায় জড়িত অন্য মোটরসাইকেলটির চালককে শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
জাহাঙ্গীর আলমের মৃত্যু এলাকায় মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। কেউ কেউ তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করলেও অনেকে তার বেপরোয়া কর্মকাণ্ডের কারণে এই ঘটনাকে ‘প্রতিফল’ হিসেবে দেখছেন। স্থানীয় একজন আওয়ামী লীগ সমর্থক বলেন, “তিনি অনেককে হুমকি দিয়েছিলেন, এমনকি মুক্তিযুদ্ধের সমর্থকদের ওপর হামলার জন্য মব উসকে দিয়েছিলেন। তার মৃত্যু দুঃখজনক হলেও তার কর্মকাণ্ডের জন্য অনেকেই তাকে দায়ী করছেন।”
জাহাঙ্গীর আলমের মৃত্যুতে পেকুয়া এলাকায় রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে থাকা নির্যাতন ও বেপরোয়া আচরণের অভিযোগগুলো তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করা প্রয়োজন। সড়ক দুর্ঘটনা হলেও এই ঘটনা এলাকার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। পুলিশ এই ঘটনার তদন্তে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
