❐ আযম খান
বদরুদ্দীন উমরদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কেন ৯০ ভাগ মিথ্যা এইটা বুঝতে হলে জানতে হবে তার পিতা আবুল হাশেমের কথা। সাথে তার পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ডও।
আবুল হাশেম সাহেব ছিলেন একজন রাজনীতিবিদ এবং ইসলামি চিন্তাবিদ। তারা ছিলেন ব্রিটিশ আমলের বনেদি বংশ। মানে ব্রিটিশ আমলে তারা আনুগত্যের বিনিময়ে নানা সুবিধাভোগ করতেন। তারা ছিলেন ব্রিটিশদের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সহযোগী এবং মুসলিম সমাজে প্রভাবশালী। মুসলিম সমাজে তাদের প্রভাবের কারণে ব্রিটিশরা এদের নানা সুবিধা দিয়ে আমাদের দেশে তাদের শাসন বজায় রাখার কাজটা করতো। এদেরকে নওয়াব টাইটেল, জমিদারি ইত্যাদি দেয়া হইতো বিনিময়ে।
আবুল হাশেম জন্মগ্রহণ করেন এমনই এক সুবিধাভোগী পরিবারে। তাদের পরিবার ছিল বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির বুরদাওয়ান জেলার কাশিয়ারার (বর্তমানে কাশিমনগর) জমিদার। তার এক দাদা ছিলেন আবার নওয়াব টাইটেলপ্রাপ্ত। এই হচ্ছে সংক্ষেপে আবুল হাশেমের ব্রিটিশ আমলে পারিবারিক স্ট্যাটাস। আরো সংক্ষেপে বললে তারা ছিলেন গরীবের রক্তচোষা, তৎকালীন রাজাকার।
আবুল হাশেম বড় হয়ে মুসলিম লীগের রাজনীতিতে যোগ দেন। ১৯৪৩ সালে মুসলিম লীগের বাংলা প্রভিন্স শাখার সাধারন সম্পাদক হন। জিন্নাহর প্রতি তিনি কিছুটা ক্রিটিক্যাল ছিলেন। যে কারণে পরবর্তীতে হোসেন সোহরাওয়ার্দীর কিছুটা ঘনিষ্ট হয়ে উঠেন। তার ভালো কাজগুলোর মধ্যে একটা হচ্ছে তিনি বাংলাকে দুই ভাগ করে দিতে চান নাই। আমি এটা উল্লেখ করেছি এ কারণে যে আমি ইতিহাসের প্রতি সৎ থাকতে চাই। এখন এটা কি উনি দেশ ভাগ হলে তাকে ভারত ছাড়তে হবে এই আশংকায় করেছেন নাকি আসলে মন থেকে তা চেয়েছেন তা আমি জানি না।
কেন আমার এই সন্দেহ তার ক্লু পাবেন লেখার পরের দুই প্যারায়।
যাই হোক, দেশভাগের পর তিনি পূর্ব পাকিস্তানে পরিবারসহ চলে আসেন। তার রাজনীতিতে আগে কিছুটা বামঘেঁষা চরিত্র ছিল যেটা পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসার পরে আমূল বদলে যায়। ১৯৬০ সালে তিনি ইসলামিক একাডেমির পরিচালক হিসাবে দায়িত্ব নেন।
১৯৬২ সালে জেনারেল ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা দখলের পরে কাউন্সিল অফ ইসলামিক ইডিয়োলজি নামে একটা প্রতিষ্ঠান গঠন করেন। যার কাজ ছিল পাকিস্তানকে একটা পরিপূর্ণ ইসলামি রাষ্ট্রে পরিণত করা। এ প্রতিষ্ঠান বর্তমান পাকিস্তানে এখনো আছে এবং পাকিস্তানকে আরো ইসলামিকরনের রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে আছে। আবুল হাশেম ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং বহুদিন এখানে কাজ করেছেন।
উল্টোদিকে শেখ মুজিব ছিলেন সোজা বাংলায় বললে কেরানী-চাষার ছেলে। বাংলার এক সাধারণ পরিবারের সাধারণ মানুষ। নিজ যোগ্যতায় এবং নেতৃত্বগুণে তিনি হয়ে ওঠেন বাংলার অবিসংবাদিত নেতা। এই আটপৌরে পরিবারের সন্তান শেখ মুজিব বাংলাদেশ স্বাধীন করাতে বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষের অধিকাংশ খুশি হলেও খুশি হতে পারেনাই ব্রিটিশ আমল থেকে পাকিস্তান আমল পর্যন্ত বাংলার খেটে খাওয়া মানুষকে চুষে খাওয়া এলিট পরিবারগুলো। তাদের এলিট স্ট্যাটাস অনেকটাই ধসে পড়ে। অর্থবিত্তেরও ক্ষতি হয় অনেক। আর তাদের পেয়ারে পাকিস্তান আদর্শিকভাবে ব্যর্থ হওয়ার আদর্শিক জ্বালা তো আছেই।
মুক্তিযুদ্ধ যখন হয় তখন বদরুদ্দীন ওমরের বয়স ছিল ৩৯। এক কোটি মানুষ শরণার্থী হয়ে ভারতে। বাকি যারা দেশে আছে তারা তখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী, রাজাকারদের ভয়ে আতংকিত। সে সময়ে আবুল হাশেমের পরিবার ছিলো নিরাপদে। বদরুদ্দীন ওমর গায়ে বাতাস লাগিয়ে সাইকেলে চেপে ঢাকা শহরে ঘুরে বেড়াতেন।
সেই বদরুদ্দীন উমর স্বাধীনতার কিছুদিন পর থেকে মুক্তিযুদ্ধের বিচারকের দায়িত্ব নিলেন। দিস্ত দিস্ত কাগজের অপচয় করে লিখলেন বারবার, মুক্তিযুদ্ধ কীভাবে বেহাত হয়ে গেল, মুক্তিযুদ্ধ কীভাবে ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে আওয়ামি লীগ এবং শেখ মুজিবের কারণে। মায়ের চাইতে মাসীর দরদ যেন উথলে উঠলো।
বদরুদ্দীন উমর তার পিতার প্রতিষ্ঠা করা পাকিস্তানের পরাজয় কোনদিন মেনে নিতে পারেন নাই। পারেন নাই তার মতন জমিদারের নাতিদের এক চাষার ছেলের কাছে পরাজয় মেনে নিতে। যে চাষারা তাদের পায়ের নিচে ছিল যেই চাষাদের একজনের সন্তান তর্জনি উঁচিয়ে বলেছিল “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম”।
ঐ তর্জনি শুধু শেখ মুজিবের ছিল না, ঐ তর্জনি ছিল বাংলার নিপীড়িত সমস্ত কুলি-মজুর-চাষা সবার ঔদ্ধত্যের প্রতীক। বদরুদ্দীন ওমরেরা সেটাকে তাদের পরাজয় তো বটে, অপমান হিসাবেও নিয়েছেন।
পরিচিতি: লেখক, ব্লগার ও মানবাধিকার কর্মী
