সমাজ বদলে বঙ্গবন্ধুর ব্লু-প্রিন্ট: অধ্যাপক আবু সাইয়িদ (বাকশাল প্রসঙ্গ)

সমাজ বদলে বঙ্গবন্ধুর ব্লু-প্রিন্ট: অধ্যাপক আবু সাইয়িদ (বাকশাল প্রসঙ্গ)
শেয়ার করুন
সংকলন করেছেনঃ দ ম আহমেদ

গণতন্ত্র: জনগণের জন্য

শোষিতের গণতন্ত্র বলতে বঙ্গবন্ধু এমন এক গণতন্ত্রকে বুঝাতে চেয়েছেন, যে গণতন্ত্র শোষিত মানুষের জন্য, তাদের স্বার্থে এবং তাদের দ্বারা পরিচালিত হবে। এর অর্থ হোল এই যে, আজকে যে প্রচলিত গণতন্ত্র রয়েছে সেখানে সংখ্যা গরিষ্ঠ বিপুল শোষিত শ্ৰেণী সেই অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে উল্টে দিয়ে নিজেরাই রাষ্ট্র নির্মাণে সরাসরি অংশীদার হবে, অধিকাংশ জনগণ রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করবে এবং রাজনীতি পরিচালনা করবে।

গণতন্ত্রের অর্থ হলো, অল্পাংশের উপর অধিকাংশের শাসন। কিন্তু যে গণতন্ত্র প্রচলিত রয়েছে তা হচ্ছে, অধিকাংশের উপর অল্পাংশ ধনীক, বণিক, শোষক গোষ্ঠীর শাসন। তাই অল্পাংশের জন্য যে গণতন্ত্র সমাজে প্রচলিত রয়েছে তা শোষকের গণতন্ত্র।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই অল্পাংশের গণতন্ত্র তথা শোষকের গণতন্ত্রকে বাংলার মাটি হতে চিরদিনের মত বিতাড়িত করে তদস্থলে অধিকাংশের গণতন্ত্র তথ্য শোষিতের গণতন্ত্র কায়েম করতে চেয়েছিলেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পরিষ্কারভাবে বলেছেন, “আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি। গণতন্ত্র, সেই গণতন্ত্র যা সাধারণ মানুষের কল্যাণ সাধন করে থাকে। আগেও আমরা দেখছি যে গণতন্ত্র যে সব দেশে চলছে, দেখা যায় সেই সব দেশে গণতন্ত্র পুঁজিপতিদের প্রটেকশন দেওয়ার জন্য কাজ করে এবং সেখানে প্রয়োজন হয় শোষকের রক্ষা করার জন্যই গণতন্ত্র-ব্যবহার। সে গণতন্ত্র আমরা বিশ্বাস করি না। আমরা চাই শোষিতের গণতন্ত্র এবং সেই শোষিতের গণতন্ত্রের অর্থ হলো, আমরা দেশের যে গণতন্ত্রের বিধিলিপি আছে, তাতে যে সব বন্দোবস্ত করা হয়েছে যাতে এ দেশের দুঃখী মানুষ রক্ষা পায়, শোষকেরা যাতে রক্ষা পায় তার ব্যবস্থা নাই। সেজন্য আমাদের গণতন্ত্রের সংগে অন্যের পার্থক্য আছে। সেটা আইনের অনেক সিডিউলে রাখা হয়েছে। অনেক আলোচনা হয়েছে যে, কারোর সম্পত্তি কেউ নিতে পারবে না। কিন্তু যে চক্র দিয়ে মানুষকে শোষণ করা হয়, সেই চক্রকে আমরা জনগণের কল্যানের জন্য ব্যবহার করতে চাই। তার জন্য আমরা প্রথমে ব্যাংক, ইনস্যুরেন্স কোম্পানী, কাপড়ের কল, পাটকল, চিনির কারখান সব কিছু জাতীয়করণ করে ফেলেছি। তার মানে হোল শোষক গোষ্ঠী যাতে এই গণতন্ত্র ব্যবহার করতে না পারে। শোষিতকে রক্ষা করার জন্য এই গণতন্ত্র ব্যবহার করা হবে।”

বঙ্গবন্ধু প্রবর্তিত ও ঘোষিত শোষিতের গণতন্ত্র হল গণতন্ত্রের সর্বোচ্চ রূপ যা সংখ্যাগরিষ্ঠের নিয়ন্ত্রণে তাদের স্বার্থে পরিচালিত। অর্থনৈতিকভাবে এ গণতন্ত্র শোষণের অবসান ঘটায়, জনগণের স্বার্থে রাষ্ট্রীয়বার গড়ে তোলে, রাজনৈতিকভাবে এ গণতন্ত্রে ব্যক্তি সামাজিকের নিকট দায়ী থাকে, মৌলিক অধিকার ভোগ করে এবং দায়িত্ব পালন করে। এ গণতন্ত্র বস্তুগত গ্যারান্টির মাধ্যমে মৌলিক অধিকারকে কার্যকর ও অর্থবহ করে তোলে।

পার্লামেন্টারী গণতন্ত্রের পরিবর্তে শোষিতের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণায় বঙ্গবন্ধুর উপর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আক্রমণ তীব্র হয়ে ওঠে। বিদেশী প্রচার মাধ্যম যার প্রায় পুরোটা শোষক গোষ্ঠীর দখলে তাদের স্বার্থে এবং পুঁজিবাদী ভাবধারায় গড়ে ওঠা মানসিকতায় শোষিতের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা ও কার্যকর ফর্মুলা ধনিক, বণিক, জোতদার ভূস্বামী এবং লুটেরা দুর্নীতিবাজ গোষ্ঠীর নিকট আতঙ্কের দৃশ্যমান বিষয় হিসেবেই চিত্রিত হয়েছে। এই ভীতপ্রদ চিত্রের বহিঃপ্রকাশ স্বৈরতান্ত্রিক নিষ্ঠুরতার প্রতিপাদ্য হিসেবে সাধারণ্যে অতি কৌশলে জাতিদ্রোহী-গণবিরোধী শক্তিসমূহ সার্বক্ষণিক প্রচারের আবশ্যিক দায়িত্ব হিসেবেই গ্রহণ করেছিল।

এখানে সংগত কারনেই বিচার্য বিষয় এবং পর্যালোচনা হওয়া একান্ত আবশ্যক এজন্য যে, বঙ্গবন্ধুর শোষিতের গণতন্ত্রের মর্ম কী? এটি কি গণতন্ত্র না কি স্বৈরতন্ত্রের ভিত্তিমূল? কেননা শোষিত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যকে সামনে রেখে বঙ্গবন্ধু চতুর্থ সংশোধনী ও একপার্টি সিস্টেম প্রবর্তন করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু বলেছেন, “এমেন্ডেড কনস্টিটিশনে যে নতুন সিস্টেমে যাচ্ছি তাও গণতন্ত্র, শোষিতের গণতন্ত্র।” তিনি বললেন, “আমি চাই শোষিতের গণতন্ত্র, শোষকের নয়।”

জাতীয় ঐক্য:

সদ্য স্বাধীন বিশৃংখল ও ধ্বংসপ্রাপ্ত দেশে রাষ্ট্রপরিচালনা করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নিকট স্পষ্টই প্রতীয়মান হয়ে উঠেছিল যে বাংলাদেশে বিরোধী দল সহ সকলকেই যেখানে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার উচ্চকণ্ঠ এবং তা জাতীয় কনসেনশান রূপে প্রতিভাত হচ্ছিল। তার সুষ্ঠু বাস্তবায়নের জন্য বহুমুখী রাজনৈতিক দলসমূহের পার্থক্যগত অস্তিত্ব বজায় রাখার আদৌও প্রয়োজন নেই। সেজন্য জাতীয় প্লাটফর্ম রূপে গঠন করলেন বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ/বাকশাল।

জাতীয় ঐক্যমতের ভিত্তিতে শাসনতান্ত্রিক বিধানে গৃহীত একক জাতীয় দলের মাধ্যমেই গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণ ও সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থাদি সফলভাবে প্রয়োগ করা সম্ভবপর। তিনি তার বক্তব্যে অত্যন্ত বিশ্বাসের সংগেই উচ্চারণ করেছেন, ঘুনে ধরা সমাজ ব্যবস্থা ও প্রশাসন নিয়ে সমাজের বুকে হতে স্থায়ীভাবে চেপে বসা দুর্নীতি, চোরাচালান ও আভ্যন্তরীণ বিশৃংখলা দূরীভূত করা সম্ভব নয়। তাঁর অভিজ্ঞতা তাঁকে একথাও পরিষ্কার করে দিয়েছিল যে, সংসদীয় গণতন্ত্রের ঢিলেঢালা ব্যবস্থাদির আওতায় সমাজ বিপ্লব পৃথিবীর কোথাও সফলতা অর্জন করতে পারেনি। সোনার বাংলা নির্মাণ সম্ভব হবে না।

নিপীড়িত দরিদ্র জনগণের প্রতি তাঁর সীমাহীন ভালোবাসা, মুক্তিকামী মানুষের প্রতি দ্ব্যর্থহীন অনুরক্তি দরিদ্র দেশগুলোর জন্য নিজেকে অনুকরণীয় নেতা হিসেবে উপস্থাপনের বিষয়টিও তাঁর মনে কাজ করে থাকবে।

নতুন প্রত্যাশা

শোষিত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার, একদলীয় গণতান্ত্রিক শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থার যাবতীয় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব জাতির পিতার হাতে অর্পিত হওয়ার ফলে নিঃসন্দেহে জনমনের মনে নতুন প্রত্যাশা জাগ্রত হয়েছিল। জনগণের প্রত্যাশা ছিল, নতুন ব্যবস্থাধীনে জননিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, দ্রব্যমূল্য হ্রাস পাবে এবং আইন শৃংখলা ও অর্থনৈতিক দূরবস্থা থেকে তারা মুক্তির পথ দেখবে।

দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে প্রতিদিন শত সহস্র লোক বাকশালের সদস্য পদের জন্য আবেদন পাঠাতে থাকে। এক বিরাট সংখ্যক সাংবাদিক, শ্রমিক সংগঠন সমিতি, গণসংগঠন, শ্রেণী ও পেশাজীবী সংগঠন, আইনজীবী, বুদ্ধিজীবী মুক্তিযোদ্ধাসহ সর্বস্তরের শ্রেণী ও পেশার মানুষ বাকশালে যোগদানের আবেদন করে। জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৪৮ জন শিক্ষক, কর্মচারী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটের প্রস্তাবে বাকশালের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা, ভাসানী ন্যাপ, জাসদ সহ অন্যান্য নেতাগণ সাংগঠনিক ভাবে না হলেও ব্যক্তিগত পর্যায়ে বাকশালে যোগদান অব্যাহত রাখে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সঙ্গে ভাসানী ন্যাপের সেক্রেটারী জেনারেল কাজী জাফরের আলোচনার ফলে তাদের বাকশালে যোগদানের বিষয়টিও প্রায় স্থির হয়ে যায়। জাসদের সিরাজুল আলমের সংগে বঙ্গবন্ধুর সাক্ষাৎকার একথাও রাজনৈতিক মহলে প্রকাশিত হয়ে পড়ে যে জাসদ বাকশালে যোগদান করতে যাচ্ছে।

জাতীয় ঐক্য গঠনের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক প্রক্রিয়া একটি তাৎপর্যপূর্ণ ইতিবাচক দিকে অগ্রসর হতে থাকে। শোষকের স্বার্থে পরিচালিত পার্লামেন্টারী গণতন্ত্রের পরিবর্তে শোষিত জনগণের স্বার্থে গণতান্ত্রিক পদ্ধতি, অধিকার ও বিধানাবলী প্রণয়ন ছিল বঙ্গবন্ধুর সমগ্র জীবনের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের নব-বিধান। এই গণতন্ত্র রাজনীতিতে শোষিত শ্রেণীর ব্যাপক অংশগ্রহণ এবং তাদের আর্থ সামাজিক-সাংস্কৃতিক এবং এই বৈষয়িক উন্নতি বিধানের বৈপ্লবিক সুযোগ এনে দেবার পাশাপাশি সুবিধাভোগী শ্রেণী কর্তৃক অবৈধভাবে পেয়ে আসা সুযোগ অধিকারকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল।

এছাড়া বাংলাদেশের বিশৃংখলা অর্থনীতির শোষণ, লুটপাট ও সমাজ জীবনে শৃংখলা ফিরিয়ে আনার বিকল্প জননির্দেশ বঙ্গবন্ধু হত্যার একযুগ পরেও এখন পর্যন্ত অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে। শোষিতের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ব্যতীত এখনও পর্যন্ত বাংলাদেশের মত একটি দরিদ্রতম দেশে কি করে উপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থার অবদান এবং সাম্রাজ্যবাদী শোষণের লক্ষ্মীপুজির নিষ্ঠুর জোয়াল ঝেড়ে ফেলার, দুর্নীতি অরাজকতা ও পরনির্ভশীলতার বিপরীতে স্বনির্ভর জাতি গঠনের অন্য কোন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া আছে কি? বাংলাদেশের সমগ্র বুদ্ধিজীবী, তাত্ত্বিক এবং জ্ঞানী গবেষকদের প্রতি চিরদিনই বঙ্গবন্ধুর এই রাষ্ট্রীয় নব বিধান চ্যালেঞ্জ হিসেবেই থেকে যাবে।

আরো একটি প্রসংগ সংগতভাবে উল্লেখিত হবে যে, রাষ্ট্রযন্ত্রের দুটি প্রধান শক্তি সেনাবাহিনী ও আমলাতন্ত্র যা গড়ে উঠেছে ‘অনায্য’ পুঁজির পাহারাদার ও নিপীড়নমূলক শাসন ও শ্রম-শোষণের ‘বরকন্দাজ’ হিসেবে। শোষিত জনগণের পক্ষে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ ও গণতান্ত্রিক চর্চার অধিকার নিয়ে জনগণের কাছে টানা বিধেয় ছিল। তাদের শোষিতের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ভ্যানগার্ড হিসেবে দায়িত্ব পালনের গণতান্ত্রিক চর্চায় একক পার্টি কাঠামোর আওয়ার নিয়ে আসা জরুরী ছিল: বহুদল ভিত্তিক তথাকথিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যা আদৌও সম্ভব নয়। পুঁজিবাদী দর্শনের আওতায় আমলা-সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ কেবলমাত্র প্রতিক্রিয়া ও স্বৈরতন্ত্রের হাতকেই শক্তিশালী করে যা পাকিস্তান বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের রাজনীতির একটি মারাত্মক ক্ষত হিসেবে চিহ্নিত। অন্যদিকে শোষণমুক্ত সমাজ নির্মাণ লক্ষ্যে মানব মুক্তির দর্শনের আওতায় এসব রাষ্ট্রীয় শক্তিসমূহের যথার্থ অংশগ্রহণের স্বীকৃতি শোষিতের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাকেই দৃঢ় ও শক্তিশালী করে। এ ক্ষেত্রে বহুদলীয় বুর্জোয়া দর্শনের পরিবর্তে একদলীয় গণতান্ত্রিক দর্শনের অপরিহার্যতা ও কার্যকারিতা বঙ্গবন্ধু যথার্থ অর্থেই উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

রাজনৈতিক কর্তৃত্ব স্থাপন:

এই ঐতিহাসিক দিকগুলোর বিস্তারিত ভাষা, খুঁটিনাটি ব্যাখ্যার গণতান্ত্রিক রীতি পদ্ধতিকে সংহত ও শক্তিশালী করার লক্ষ্যেই পরিচালিত হয়েছে, যার নির্দিষ্ট ছিল জনগণের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। চতুর্থ সংশোধনীর বিভিন্ন ধারা ও বিধানবলী পর্যালোচনা করলে একটি বিষয় অত্যন্ত পরিষ্কার হয়ে ওঠে যে, রাষ্ট্রযন্ত্র ও প্রশাসনের সর্বস্তরে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার অনিবার্যতা, এর অর্থ রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনার বিভিন্ন স্তরসমূহে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত জন প্রতিনিধিদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা। জনগণের নিকট সরাসরি জবাবদিহি করার বিধান সম্বলিত এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাদি রাষ্ট্রের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে এবং পার্লামেন্ট সদস্য, জেলা গভর্নর, থানা গভর্নর এবং গ্রাম সমবায়ের মত রাষ্ট্রের ক্ষুদ্রতম ইউনিটের প্রতিনিধি নির্বাচনে সর্বক্ষেত্রে তা ছিল অবশ্য প্রযোজ্য উৎকর্ষিক ও সুনির্দিষ্ট। সর্বজনীন প্রত্যক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থার এই গণতান্ত্রিক পদ্ধতির বিরুদ্ধে কেবল মাত্র অন্ধ আক্রোশ ও ঈর্ষা, বিরূপ সমালোচনা ভিত্তি হতে পারে।

চতুর্থ সংশোধনীর আরো একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল রাষ্ট্রযন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতার সংগে রাজনৈতিক কর্তৃত্বের সমন্বয়। প্রচলিত গণতান্ত্রিক ধারায় পার্লামেন্টারী বা প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির সরকার যাই হোকনা কেন, রাজনৈতিক কর্তৃত্ব রাষ্ট্র পরিচালনার শুধুমাত্র নীতি নির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত প্রদানের মধ্যে ক্ষমতার সীমাবদ্ধতায় আটকে থাকে। অন্যদিকে সেই নীতি ও সিদ্ধান্তসমূহ বাস্তবায়নের দায়দায়িত্ব ও ক্ষমতাটা অর্পিত হয় নির্বাহী কর্তৃপক্ষের উপর। বাংলাদেশের মত একটি দেশে রাজনীতিক ও নির্বাহী কর্তৃত্বের যৌথ ও সম্মিলিত প্রয়াস বিরাজমান অবস্থার মোকাবিলায় কতখানি কার্যকর ও গতিশীল এবং কল্যাণকামী যুক্তিযুক্ততার বিচারে না গিয়ে বলা যেতে পারে, এরকম একটি কাঠামোগত ব্যবস্থাপনা প্রশাসনিক গণতন্ত্রায়নের পথকেই অবারিত করতে পারে।

চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে গৃহীত একক জাতীয় দল গঠনের ফলশ্রুতিতে রাষ্ট্র ও সমাজ শক্তিসমূহকে রাজনৈতিক বলয়ের অঙ্গীভূত করে উৎপাদন শক্তির সহায়ক ভূমিকা পালনের দায়িত্ব পালনের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছিল। আধুনিক রাষ্ট্রীয় কাঠামোর আমলাতন্ত্র ও সামরিক শক্তির অবস্থান, কার্যকারিতা কেবল মাত্র তখনই জনকল্যাণে নিয়োজিত হতে পারে, যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার লক্ষ্য নির্ণীত ও নির্দিষ্ট ও বহুধারা বা বহুমুখিতায় বিভক্ত নয়। গণবিরোধী ও গণবিচ্ছিন্ন আমলাতান্ত্রিক কর্তৃত্বকে খর্ব এবং পুরনো ধাঁচের মূল্যবোধের কাঠামোয় বেড়ে ওঠা সেনাতন্ত্রের গণবৈরিতা ও গণশত্রুতার পূর্বতন অভিজ্ঞতা বঙ্গবন্ধুর মানস চেতনায় নবলব্দ ধারণার বিন্যাসে এ-সিদ্ধান্ত গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করেছিল যে, তার সেনাবাহিনী হবে ‘পিপলস আর্মী’। যারা জনগণের পক্ষে তাদের স্বার্থে, তাদের সঙ্গে মিশে সুখে দুঃখে একাত্ম হবে এবং তাদের জন্যই রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে জাতি গঠনের দায়িত্ব পালনের উদ্বুদ্ধ ও উৎসর্গীকৃত; জনগণ থেকে দূরে কর্তৃত্বশালী কোটারী শক্তি হিসেবে সেনাবাহিনী বিবেচিত হবে না।

চতুর্থ সংশোধনী বা বাকশালের বিধানবলীতে সেনাবাহিনীতে প্রতিক্রিয়াশীল সম্রোজ্যবাদী ও শোষক শ্রেণীর চিরায়াত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার বিপরীতে জনগণের কল্যাণে নিবেদিত, সম্পূরক ও সহায়ক মিত্রশক্তির সারিতে উচ্ছল অবস্থানের ভিত্তি করে নিয়েছিল। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতায় বঙ্গবন্ধু এই নবতর পদক্ষেপ সকল ব্যক্তিক, গোষ্ঠিক ও দলীক এবং বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার সৎ আদর্শবাদীদের রাষ্ট্র গঠনে সরাসরি অগ্রাধিকার প্রদান তৃতীয় বিশ্বের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে নজিরবিহীন বলে উল্লেখিত হবে।

জাতীয় একদল গঠনের প্রতিক্রিয়ায় (বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ) ওয়ান পার্টি সিস্টেম বলে বিবেচিত হলেও শুধুমাত্র দুর্নীতিবাজ, দুষ্কৃতিকারী, সমাজ বিরোধী, জননিরাপত্তাবিরোধী, হিংসাত্মক কার্যকলাপে লিপ্ত ব্যক্তি বা রাষ্ট্রীয় মূলনীতি (বাঙালী জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্ম নিরপেক্ষতা) অবিশ্বাসীদের জন্য জাতীয় দলের সদস্য প্রদান রহিত ছিল। বাকশাল গঠনতন্ত্রের বিভিন্ন ধারার সামগ্রিকতা বিবেচনা ও বিশ্লেষণ করলে সংগঠনের নীতিসমূহে গণতান্ত্রিক প্রণালী, সদস্যপদ প্রদানে গণতান্ত্রিক রীতি ও কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবেই বিধিবদ্ধ। বাকশাল যাকে একদলীয় স্বৈরতন্ত্রের সংগে সম্পর্কীত করতেই সমাজতন্ত্রের ডগমাধারী বিজ্ঞ তাত্ত্বিকেরা উৎসাহিত, তাদের সর্বত চক্ষু বাকশালের পরিপূর্ণ গণতন্ত্রের কার্যকর অনুশীলন ব্যবস্থাদি, গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকতার নীতিসমূহ, শাসনতান্ত্রিক রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার বিন্যাসে অনুসন্ধিস্যু নয়। দলীয় চেয়ারম্যান, এবং চেয়ারম্যানের উপর কার্যনির্বাহী কমিটির সিদ্ধান্তের সর্বময় বাধ্যবাধকতা, সর্বোপরি দলীয় কাউন্সিলের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা প্রয়োগের বিধানবলী প্রথমত: দলীয় এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতির উপর এর নিরঙ্কুশ প্রযোজ্যতা গণতান্ত্রিক ধারাকে পুষ্ট করে। রাজনৈতিক কর্তৃত্বের আওতায় আমলাতন্ত্র সেনাতান্ত্রিক চক্রান্তের প্রতিরোধে গণতন্ত্র সংরক্ষণের ও বিকাশের মৌলিকতার বিষয়টি তারা সব সময়ই এড়িয়ে গেছেন। এ সকল সাংগঠনিক, বিধানিক নীতিমালার সংগে সংযুক্ত ওয়ান পার্টি সিস্টেমের রাজনৈতিক দর্শন ও কর্মসূচি বিশ্লেষণে বঙ্গবন্ধুর গণতন্ত্রের প্রতি আজীবন লালিত অনুরুক্তির তাৎপর্যময় গভীরতর কার্য-প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক ধারায় অনুকরণীয় বিশিষ্টতা; যা সমাজ বিজ্ঞানী ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের নিকট চিরায়ত গবেষণার জীবন্ত বিষয় বলেই বিবেচিত হবে।

জনগণ হতে বিচ্ছিন্ন, জনগণ বিমুখ, জনগণের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা কায়েমী স্বার্থের ধারক ও বাহক এবং দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত আমলাতন্ত্রকে উচ্ছেদ করে সর্বস্তরে জনগণের প্রশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রশাসনিক গণতন্ত্রায়নের লক্ষ্য ঘোষণা অবশ্যই বৈপ্লবিক প্রস্তাবিত গণতান্ত্রিক প্রশাসন পদ্ধতিতে সেনাবাহিনীকে পিপলস আর্মির কনসেপ্ট ও কাঠামোয় গড়ে তোলার নির্ণীত লক্ষ্যে জাতি গঠন প্রক্রিয়ায় তাদের শক্তি ও সামর্থ্যকে রাজনৈতিক কর্তৃত্বের অধীনে ও সমন্বয়ে নিয়োজিতকরণ-এর সিদ্ধান্ত কার্যকর গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত ও সহযোগী করার দায়বদ্ধতায় বাকশাল সিস্টেমের ঘোষিত নীতি ও কর্মধারা সর্বোচ্চ গণতন্ত্র, যা সব সময়ই সমাজ বদলের সৈনিকদের অনুপ্রাণিত করবে।

প্রশাসনিক গণতন্ত্রায়নের সঙ্গে সম্পর্কীত জাতীয় ঐক্য গঠনের স্বার্থে বৃহত্তর গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে জাতি গঠনে প্রতিটি নাগরিকের সর্বাধিক শ্রম ও মেধার প্রয়োগ ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করা ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য। এই লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুর উদ্দেশ্য ছিল সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমান বাহিনী, রক্ষী বাহিনী, বিডিআর, পুলিশ বাহিনী, রাজনীতিবিদসহ সকল শ্রেণী ও পেশার লোকদের রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমের দায়বদ্ধতায় নিয়োজিত করা।

সমাজের সচেতন শিক্ষিত বুদ্ধিজীবি, সাংবাদিক, ডাক্তার, প্রকৌশলী, আইনজীবী, সরকারী কর্মচারী, অন্যান্য সম্প্রদায়ের চিন্তাধারা ও সৃজনশীলতা এবং পারস্পরিক আস্থা, বিশ্বাস, নীতির ঐক্য ও একমুখিনতার সমন্বয়ে জাতি গঠনের প্রয়োজনে দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনগণকে নিয়ে জাতীয় ঐক্য ও মোর্চা তোলা, যার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল স্বনির্ভরতার লক্ষ্যে স্বশাসিত পরিকল্পিত উৎপাদন বৃদ্ধি।

ঘোষিত দ্বিতীয় বিপ্লব:

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দ্বিতীয় বিপ্লবের ব্লু-প্রিন্ট ঘোষণা করে এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের মধ্যেই বেঁচে থাকার প্রত্যাশা ঘোষণা করেন। দ্বিতীয় বিপ্লবের ব্লু-প্রিন্ট বাস্তবায়নের পথে জাতীয় দল বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ/বাকশাল গঠন তাঁর সেই কাঙ্ক্ষিত চেতনাকে বাস্তবে রূপদানের সাংগঠনিক কাঠামো। সমাজ বদলের এই ব্লু-প্রিন্টের নির্মোহ বিশ্লেষণ প্রচলিত প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত জরুরী।

বঙ্গবন্ধু ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’-এর রাজনৈতিক লক্ষ্য নির্ধারণ করেন শোষণমুক্ত সোনার বাংলা নির্মাণ। এই লক্ষ্য অর্জনের সাংগঠনিক কাঠামো বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ/বাকশাল।

বাকশাল রাজনীতির মৌল ঘোষণা-

ক. জাতীয় ঐক্য

খ. শোষিতের গণতন্ত্র

এবং ঐ রাজনীতির সংগে সম্পর্কিত নির্বাচন পদ্ধতি

শোষণমুক্ত সোনার বাংলা নির্মাণের প্রাথমিক ভিত্তি হিসেবে জাতীয় ঐক্য জরুরী। বিভিন্ন স্তরে বিভক্ত সমাজে পশ্চাদপদ, অবহেলিত, শোষিত, বিশাল জনগোষ্ঠী এবং দেশপ্রেমিক ব্যক্তি, দল ও শক্তির সমন্বয়ে জাতীয় ঐক্য গড়ার প্রশ্নে বঙ্গবন্ধু ছিলেন নিরলস। তিনি বলেন, “জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার জন্য জাতীয় দল (বাকশাল) করা হয়েছে। যারা বাংলাদেশকে ভালবাসেন এবং এর আদর্শ বিশ্বাস করেন, চারটি রাষ্ট্রীয় নীতি বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্ম নিরপেক্ষতা মানেন, সৎ পথে চলেন তারা সকলেই এই দলের সদস্য হতে পারবেন। যারা বিদেশী এজেন্ট, যারা বহিঃশত্রুর কাছ থেকে পয়সা নেয়, এতে তাদের স্থান নেই। সরকারী কর্মচারীরাও এই দলের সদস্য হতে পারবেন। কারণ তারাও জাতির একটা অংশ। তাদের অধিকার থাকবে এই দলের সদস্য হওয়ার। এই জন্য সকলে যেখানে আছি একতাবদ্ধ হয়ে দেশের কাজে লাগতে হবে।”

প্রচলিত গণতন্ত্র:

আজকে আমরা যে গণতন্ত্রের কথা বলছি, তার উদ্ভব প্রাচীন গ্রীস দেশে। গ্রীসের নগর-রাষ্ট্রে নাগরিকদের ভোটে নির্বাচিত সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করতো। নাগরিক বলে গণ্য হতো তারাই, যারা ছিলো পরশ্রমভোগী, শোষক, দাস-মালিক এবং অভিজাত শ্রেণী। এরা ছিলো মুষ্টিমেয়। অন্য দিকে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ যে শ্রমজীবী মানুষ তারা নাগরিক বলে গণ্য হতো না, সুতরাং রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের অংশগ্রহণের অধিকার ছিলো না। তাই গ্রীক গণতন্ত্রে ‘গণ’ অর্থ পরশ্রমভোগী গুটিকতক দাস-মালিক এবং শোষক শ্রেণী। তাদের নির্মম শোষণের অবাধ অধিকারের সংগে সংগতি রেখেই প্রণীত হয়েছে এ গণতন্ত্রের বিধি-বিধান, রীতি-পদ্ধতি ও আইন কানুন। সুতরাং গ্রীসের গণতন্ত্র দাস-মালিকদের তথা শোষকের গণতন্ত্র।

এরিস্টটলের সমসাময়িক বলে কথিত কৌটিল্য তার ‘অর্থশাস্ত্র’-এ দাসদের ও শ্রমজীবী প্রাকৃতজনের জন্য কিছু সুযোগ-সুবিধা প্রদানের কথা বললেও প্রকৃত প্রস্তাবে, রাষ্ট্র-শাসন ও পরিচালনায় তাদের অংশগ্রহণের অধিকার ছিল না।

এ-উপমহাদেশে সেদিনের ‘গণতন্ত্র’ ছিল মুষ্টিমের অভিজাত শ্রেণীর অধিকারে। গণতন্ত্রের প্রকৃত ‘গণ’ ছিল উপেক্ষিত অবহেলিত, শোষিত ও নির্যাতিত। এ উপমহাদেশে যেমন নদ-সাম্রাজ্য, গ্রাম-গোষ্ঠী, ট্রাইবাল গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে। গ্রীসেও তেমনি দাস-বিদ্রোহ গ্রীক গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে দেয়। অন্যদিকে আজ প্রমাণিত হচ্ছে, মহাভারতের যুদ্ধদাস মালিকদের সঙ্গে গণ-সংঘের যুদ্ধ।

পরবর্তীকালে ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসাবে রাজা-বাদশার আগমন ও সামন্ত প্রভুদের উদ্ভব ও বিকাশের যুগ। সামন্তযুগে সামন্ত ভূস্বামীরাই ‘গণদেবতা’। সে ‘গণের’ ক্ষমতার উপাদানেই পড়ে তার রাষ্ট্রযন্ত্র। তাই সামন্ত শাসনও সামন্ত ভুস্বামীদের গণতন্ত্র।’ যেমন দাস সমাজের গ্রীক গণতন্ত্র মানেই ছিলো দাস- মালিকদের গণতন্ত্র।

সম্রাট ও সামন্ত শাসকদের অত্যাচারে, অনাচারে ও স্বৈর শাসনে জর্জরিত, অধিকার-বঞ্চিত ভূমিদাস, কৃষক, শ্রমিক মেহনতি ও সাধারণ মানুষের অধিকার সচেতনতা জাগ্রত হয়েছে, নবতর বিপ্লবের উদ্ভব ঘটিয়েছে। তাই দেখা যায়, ফরাসী বিপ্লবের ফলশ্রুতিতে সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার বাণীতে সকল শ্রেণীর মানুষকে হাত করে বুর্জোয়া শ্রেণী ক্ষমতা দখল করে। কৃষক শ্রমিক সাধারণ মানুষ আগের মতই শোষিত ও নিপীড়িত হতে থাকে।

প্রচলিত গণতন্ত্রের স্বরূপ:

প্রচলিত এ গণতন্ত্রে শোষক শ্রেণী এমন সমস্ত অধিকার ও সুবিধার কথা কৌশলে শ্লোগান হিসেবে উত্থাপিত রেখেছে, যাতে মানুষ সহজেই বিভ্রান্ত হতে পারে। যেমন এ গণতন্ত্রের মানবীয় অধিকারের কথা বলা হয়েছে। ঘোষণা দেওয়া হয়েছে যে সম্পত্তির অধিকার অলংঘনীয় ও পবিত্র। কিন্তু এই ঘোষণার পেছনে দুরভিসন্ধি রয়েছে আর তা হল, যে কোনো প্রকারের সম্পত্তি ও সম্পদ অর্জন এবং কুক্ষিগত করার অধিকার। এই অমানবীয় ও অবৈধ অধিকারকে রক্ষার লক্ষ্য নিয়েই প্রচলিত গণতন্ত্রের সকল বিধিমালা প্রণীত সম্পদ ও সম্পত্তির অধিকারের দোহাই দিয়ে শোষক গোষ্ঠী বিত্তহীনদের উপর জবরদস্তি চালায়, উৎপাদনযন্ত্রের মালিকানার জোরে উৎপাদককে শোষণ করে। ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকারের অর্থ, অন্যকে যথেচ্ছা শোষণের স্বাধীনতায় যেন কেউ হস্তক্ষেপ করতে না পারে।

এ প্রচলিত গণতন্ত্রের আরো একটি মোহময় ঘোষণা হল ব্যক্তি স্বাধীনতা ও সম-অধিকার। কিন্তু এই ব্যক্তি-স্বাধীনতার নামে শাষক গোষ্ঠী সুযোগ নেয় অবাধ অধিকারের। এই অবাধ অধিকারের ফলে একদিকে সৃষ্টি হয় মুষ্টিমেয় পুঁজিপতি, অন্যদিকে দেশের বিশাল জনগোষ্ঠী সম্পদ ও সমস্ত প্রকার সুবিধা ও অধিকার থেকে বঞ্চিত।

মৌলিক অধিকার কয়েকজনের হাতে দিয়েছে অপরিমিত ক্ষমতা ও সম্পদ, অন্যদিকে কেড়ে নিয়েছে কোটি কোটি মানুষের মুখের মান, গায়ের কাপড়, মাথা গুজার ঠাই এবং রোগের ওষুধ।

এ গণতন্ত্র মুষ্টিয়ের ধনিকের স্বার্থে সমগ্র মানবতার উপর, এক গোষ্ঠী কর্তৃক অন্য শ্রেণীর উপর, সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলি অনুন্নত ও পরাধীন দেশগুলির উপর, এক জাতি কর্তৃক অন্য জাতির উপর, এক সম্প্রদায় কর্তৃক অন্য সম্প্রদায়ের উপর, পুরুষ কর্তৃক স্ত্রীলোকদের উপর, এক কথায় প্রবলকেই শোষক সমাজ নাম দিয়েছে ব্যক্তি-স্বাধীনতা। এই সমাজের ব্যক্তি স্বাধীনতা বলে মুনাফা শিকারী অনায়াসে মানুষের মৃত্যু ডেকে আনতে পারে, সাম্প্রদায়িকতা ও বর্ণ বিদ্বেষীরা নিরুদ্বেগে মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে পারে, সাম্রাজ্যবাদী প্ররোচকরা বিনা বাধায় দাঙ্গাহাঙ্গামা ও যুদ্ধের উস্কানি দিতে পারে, মানবতার শত্রুরা বিচ্ছিন্নভাবে যৌন ব্যাভিচার এবং সমাজদ্রোহী ভাবধারা প্রচার করতে পারে। প্রচলিত সমাজে ব্যক্তি স্বাধীনতার অর্থ শোষকের জনস্বার্থের পক্ষে হানিকর সব রকম কুকর্ম করবার অধিকার।

এ গণতন্ত্রের আর একটি শ্লোগান গণতান্ত্রিক অধিকার ও রাষ্ট্র পরিচালনার অধিকার। বর্তমান সমাজে প্রকৃতপক্ষে যতই আইনগত ব্যবস্থা থাকুক না কেন, স্বাধীনভাবে ভোট দেবার, প্রার্থী হবার ও রাষ্ট্রপরিচালনায় অংশ গ্রহণে, দেশের শতকরা ৯৮ জন দরিদ্র লোকের পক্ষে সম্ভব নয়। কেননা যে ব্যক্তি খাওয়া পাড়ার জন্য ধনীকদের অনুগ্রহ প্রার্থী, তার পক্ষে স্বাধীনভাবে ভোট প্রদান সম্ভব নয়। তাছাড়া নির্বাচনে প্রার্থী হতে হলে যে পরিমাণ অর্থ, সম্পদ দরকার, প্রচার পরিবেশন দরকার, সেখানে গরীব ও সাধারণ মানুষের পক্ষে ভোট প্রার্থী অসম্ভব ব্যাপার। সেজন্য সাধারণত ধনীক গোষ্ঠীর ভেতর হতেই বিভিন্ন দলীয় নামের প্রার্থী দাঁড়ায় এবং তাদের মধ্য হতে একজনকে ভোট দিতে হয়।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে ধনীরা অল্পাংশ হলেও যেহেতু তারা অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী সেহেতু নির্বাচনের ‘ঘের নিয়ে’ তারাই রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলে রাখে। রাষ্ট্র পরিচালনায় তারাই নিয়ামক, জনগণ নিমিত্ত মাত্র। জনগণের সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণের কোন প্রকার সুযোগ নেই। সেজন্য প্রচলিত গণতন্ত্রে দুর্নীতিবাজ, কালো টাকার মালিক-চক্র নিরঙ্কুশভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করে এবং সাধারণ মানুষের উপর শোষণ, অত্যাচার ও নিপীড়ণের জন্য রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে।

প্রকৃত গণতন্ত্র হচ্ছে অধিকাংশের কাছে অল্পাংশের আজ্ঞাধীনতা মানা রাষ্ট্র। কিন্তু চরম বৈষম্যমূলক সমাজে আজকের প্রচলিত গণতন্ত্র হলো নগন্য সংখ্যাল্পের জন্য গণতন্ত্র সংখ্যাল্পের নিকট সংখ্যাগরিষ্ঠদের আজ্ঞাধীনতা মানা উলটো গণতন্ত্র।

যদি প্রচলিত গণতন্ত্রের যন্ত্রব্যবস্থাটা আর একটু খুঁটিয়ে দেখা যায়, তাহলে ভোটাধিকারের ‘তুচ্ছ’ তথাকথিত খুঁটিনাটিতে, প্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিষ্ঠানগুলির কলাকৌশলে, সমাবেশ অধিকারের বাস্তব বাখার, সংবাদপত্রের চটকদারি বিজ্ঞাপন এবং নেতার মহিমা কীর্তন ইত্যাদিতে সর্বত্র দেখা যাবে গণতন্ত্রের সীমাবদ্ধতার পর সীমাবদ্ধতা। এই সব সীমাবদ্ধতার রাজনীতি থেকে, গণতন্ত্রে সক্রিয় অংশগ্রহণ থেকে গরিবেরা বাদ পড়ে, বিতাড়িত হয়। কয়েক বছরে একবার করে নিপীড়িতদের স্থির করতে দেয়া হয় নিপীড়ক জনগণ ঠিক কোন প্রতিনিধিটি পার্লামেন্টে তাদের প্রতিনিধিত্ব করবে ও যে তাদেরই পদানত রাখবে।

এ গণতন্ত্রে ব্যক্তি-স্বাধীনতা, সমানাধিকার, সম্পত্তির অধিকার, মতামত প্রকাশের অধিকার, নির্বাচন ও রাষ্ট্র পরিচালনার অধিকার, সমস্ত অধিকারই শাসক ধনিক-বনিক চক্রের কবজায়। তাই দেখা যায়, প্রচলিত গণতন্ত্রে ‘গণ’-এর স্থানে চেপে বসে শোষকশ্রেণী এবং তাদের জন্য যে ‘তত্ত্ব’ অর্থাৎ প্রণীত শাসনতান্ত্রিক বিধি বিধান, আইন কানুন, রাজনৈতিক আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থাবলী; তারই নাম হল গণতন্ত্র। এ গণতন্ত্র হলো সংখ্যাগরিষ্ঠের উপর সংখ্যালঘুর শাসন। শাসকগোষ্ঠীই প্রকৃতপক্ষে গণতান্ত্রিক অধিকারসমূহ ও স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে। এ গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠান পার্লামেন্ট, বহুদলীয় পদ্ধতি ইত্যাদি শাসকচক্রের ইচ্ছাকেই রূপদানের জন্য নির্মিত, সামাজিক গণ স্বার্থ দেখার জন্য নয়।

 

 

Visited 11 times, 1 visit(s) today