যুক্তরাজ্যে সাবেক ভূমিমন্ত্রী জাবেদের সম্পদ বিক্রি: ঋণ পরিশোধের উদ্যোগ

যুক্তরাজ্যে সাবেক ভূমিমন্ত্রী জাবেদের সম্পদ বিক্রি: ঋণ পরিশোধের উদ্যোগ
শেয়ার করুন
নিজস্ব প্রতিবেদক। ঢাকা, ১২ আগস্ট ২০২৫:

যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের বিপুল সম্পদ বিক্রির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এই পদক্ষেপের লক্ষ্য তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের করা দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগের মধ্যে ঋণ পরিশোধ করা। জাবেদের মালিকানাধীন সম্পদের মধ্যে লন্ডন ও ইংল্যান্ডের বিভিন্ন শহরে অবস্থিত ৩০০টির বেশি আবাসিক ভবন, ফ্ল্যাট এবং অ্যাপার্টমেন্ট ব্লক রয়েছে, যার মূল্য প্রায় ১৭০ মিলিয়ন পাউন্ড (প্রায় ২৩৮০ কোটি টাকা)।

যুক্তরাজ্যের জাতীয় অপরাধ সংস্থা (এনসিএ) এবং বাংলাদেশের বর্তমান প্রশাসনের আইনি অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে জাবেদের সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাবেদের সাথে সংশ্লিষ্ট ছয়টি আবাসিক সম্পত্তি কোম্পানি প্রশাসনের অধীনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এই সম্পদের মধ্যে লন্ডনের সেন্ট জনস উডে ১১ মিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের একটি বিলাসবহুল বাড়ি এবং ফিটজরোভিয়ায় একটি ফ্ল্যাটের ব্লক উল্লেখযোগ্য। যুক্তরাজ্যের ঋণ পরিশোধ এবং সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান গ্রান্ট থর্নটন এই সম্পদ বিক্রির দায়িত্ব পেয়েছে। বিক্রির আয় সিঙ্গাপুরের ডিবিএস ব্যাংক, ব্রিটিশ আরব কমার্শিয়াল ব্যাংক এবং বাংলাদেশের ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি)-এর মতো ঋণদাতাদের পরিশোধে ব্যবহৃত হবে। ইউসিবি প্রায় ২৬০ মিলিয়ন পাউন্ড (প্রায় ৩৬৪০ কোটি টাকা) পুনরুদ্ধারের চেষ্টায় রয়েছে।

সাইফুজ্জামান জাবেদ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহযোগী এবং আওয়ামী লীগের তিনবারের সংসদ সদস্য, বাংলাদেশে অর্থ পাচার ও দুর্নীতির অভিযোগে তদন্তের মুখোমুখি। বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) জানিয়েছে, জাবেদের মালিকানাধীন জেডটিএস প্রপার্টিজের সম্পদের মূল্য প্রায় ৭৩.১৫ মিলিয়ন পাউন্ড (প্রায় ১০২৫ কোটি টাকা)। এছাড়া, তাঁর নামে থাকা জব্দকৃত ব্যাংক আমানতের মূল্য প্রায় ২.৫ মিলিয়ন পাউন্ড (প্রায় ৩৫ কোটি টাকা)। বাংলাদেশের আদালতের নির্দেশে যুক্তরাজ্যে ৩৪৩টি, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২২৮টি এবং যুক্তরাষ্ট্রে ৯টি সম্পত্তি জব্দ করা হয়েছে। জাবেদ ও তাঁর স্ত্রী রুখমিলা জামানের বিরুদ্ধে ইউসিবি থেকে ২৫০ মিলিয়ন টাকা আত্মসাৎ ও অর্থ পাচারের অভিযোগও রয়েছে।

জাবেদ এই অভিযোগগুলো অস্বীকার করে বলেছেন, তাঁর সম্পদ বৈধ ব্যবসার মাধ্যমে অর্জিত। তিনি দাবি করেছেন, তাঁর পারিবারিক ব্যবসা এবং করোনা মহামারীর সময় যুক্তরাজ্যে কম সুদের হারে সম্পত্তি ক্রয়ের সুযোগ তাঁকে এই সম্পদ অর্জনে সহায়তা করেছে। তিনি এই অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত “উইচ হান্ট” হিসেবে উল্লেখ করে সরকারের কাছে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তবে, তাঁর শপথপত্রে উল্লেখিত বার্ষিক আয় মাত্র ১.৩৫ লাখ টাকা এবং কোনো বিদেশী আয়ের উল্লেখ না থাকায় তাঁর সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এই ঘটনা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পদের উপর যুক্তরাজ্যের কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারির প্রতিফলন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল ইউকে এবং দ্য গার্ডিয়ানের একটি যৌথ তদন্তে জানা গেছে, শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশের রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা যুক্তরাজ্যে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন পাউন্ডের সম্পত্তি কিনেছেন। এই তদন্তে ব্যাংক, আইনজীবী এবং সম্পত্তি ব্যবস্থাপকদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে, যারা অর্থ পাচার রোধে যথাযথ পরিশ্রম (ডিউ ডিলিজেন্স) না করার অভিযোগের মুখোমুখি।

এই ঘটনা যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলেছে। শেখ হাসিনার ভাগ্নি এবং ব্রিটিশ লেবার পার্টির এমপি তুলিপ সিদ্দিক আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির সাথে সংযোগের অভিযোগে তদন্তের মুখোমুখি হয়ে ট্রেজারি মন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। তিনি এই অভিযোগকে “সম্পূর্ণ অযৌক্তিক” বলে উল্লেখ করে বাংলাদেশের বিচারে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান জাবেদের যুক্তরাজ্যের সম্পদ বিক্রির উদ্যোগ বাংলাদেশের দুর্নীতি বিরোধী তৎপরতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে, এই সম্পদের বৈধতা এবং অর্থ পাচারের অভিযোগ নিয়ে তদন্ত চলমান থাকায় এই ঘটনা দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। জাবেদের সম্পদ ফিরিয়ে আনা এবং ঋণ পরিশোধের প্রক্রিয়া বাংলাদেশের জনগণের জন্য কতটা উপকারী হবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। তবে, এই পদক্ষেপ অর্থ পাচার রোধে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।

Visited 6 times, 1 visit(s) today