জনকণ্ঠ দখলে নেতৃত্ব দেওয়া মেজর আফিজের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ কার্টুনিস্ট কিশোরের

জনকণ্ঠ দখলে নেতৃত্ব দেওয়া মেজর আফিজের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ কার্টুনিস্ট কিশোরের
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

জনকণ্ঠ পত্রিকা দখল ইস্যুতে আলোচনায় থাকা সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর আফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোর। তিনি দাবি করেছেন, ২০২০ সালে নির্যাতনের ঘটনায় আফিজ সরাসরি জড়িত ছিলেন।

কিশোর জানান, ২০২০ সালে ডিজিএফআই-এর মিডিয়া উইংয়ে কর্নেল শাম্মী ফিরোজের অধীনে একটি টিমে ছিলেন আফিজুর রহমান।

সেই সময় থেকেই লেখক মুশতাক আহমেদকে অনুসরণ করতেন তিনি। জনকণ্ঠ দখল ইস্যুতে আফিজের নাম আলোচনায় আসার পর কিশোর তাকে শনাক্ত করেন। ফেসবুক পেজ ‘মানুষ কিশোর’-এ পোস্ট দিয়ে তিনি জানান জামিনে মুক্তির পর স্মৃতি থেকে আঁকা ফরেনসিক স্কেচের একটির সঙ্গে আফিজের মিল পেয়েছেন।

আফিজের বাবা বিগত বিএনপি সরকারের এক মন্ত্রীর এপিএস ছিলেন বলেও জানতে পেরেছেন কিশোর। তিনি লেখেন, “আমি এই মুহূর্তে আফিজের গ্রেপ্তার দাবি করছি। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে বহু গুম ও নির্যাতনের ঘটনা বেরিয়ে আসবে বলে মনে করি।”

মেজর আফিজের পৈত্রিক নিবাস গোপালগঞ্জের একাধিক সুত্র জানিয়েছে, মেজর আফিজের দাদা ও বাবার বিরুদ্ধে একাত্তর সালে রাজাকার বাহিনীর সাথেও সংশ্লিষ্টতা ছিল। তবে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে আফিজ পুরোদস্তর ‘আওয়ামী লীগ’-এর ঘরের লোক (গোপালগঞ্জ) বনে যান।

এ বিষয়ে ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক এ বি এম সিরাজুল হোসেন ধারাবাহিক লেখালেখিতে প্রকাশ করছেন সরকারের ভিতরে ঢুকে ডিপ স্টেট কীভাবে কাজ করে। সেখানে তিনি কক্সবাজারে আওয়ামী লীগের কাউন্সিলর একরামুল হককে হত্যাসহ একাধিক বিষয় তুলে ধরেছেন। জনকন্ঠ দখলকেও এ বিশ্লেষক মেটিক্যুলাস ডিজাইনের অংশ বলে মনে করেন এ বিশ্লেষক।

কার্টুনিষ্ট কিশোরের অভিযোগ, আফিজ দীর্ঘদিন বিভিন্ন সাংবাদিক ও লেখকের ওপর নজরদারি, হয়রানি ও চাপ প্রয়োগে জড়িত ছিলেন। তিনি বলেন, “আমি মেজর আফিজুরের ছবি দেখে চিনেছি। আমি নিশ্চিত, তিনিই আমাকে নির্যাতনকারীদের একজন। তিনি চোখ বেঁধে লাঠি, ঘুষি, লাথি মেরেছেন এবং ইলেকট্রিক চেয়ারে বেঁধে রেখেছিলেন।”

২০২০ সালের ২রা মে ভোরে কিশোরকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে ৬৯ ঘণ্টা অজ্ঞাত স্থানে রাখা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের সময় তার রাজনৈতিক কার্টুনের ব্যাখ্যা দাবি করা হয়। কিশোর জানান, নির্যাতনের এক পর্যায়ে থাপ্পড়ে তার কান দিয়ে রক্ত পড়ে এবং পায়ে স্টিলের পাত বসানো লাঠি দিয়ে আঘাত করা হয়। পরে তাকে র‌্যাব কার্যালয়ে আনা হয়, যেখানে লেখক মুশতাক আহমেদের সঙ্গে তার দেখা হয়। কয়েক দফা জিজ্ঞাসাবাদের পর ৬ই মে রমনা থানায় সোপর্দ করা হয়।

গুম ও নির্যাতনের ঘটনায় কিশোরের শ্রবণক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়, পরে অস্ত্রোপচার করে কানে শ্রবণযন্ত্র বসাতে হয়। বর্তমানে তিনি সুইডেনে বসবাস করছেন।

এদিকে, জনকণ্ঠের সম্পাদক ও প্রকাশক শামীমা এ. খানও আফিজের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ করেছেন। তার দাবি, মেজর আফিজ ষড়যন্ত্র করে পত্রিকা দখল করেছেন এবং পুরনো সাংবাদিকদের বাদ দিয়ে জামায়াতপন্থী ও এনসিপি-সমর্থকদের নিয়োগ দিয়েছেন।

শামীমা খান অভিযোগ করেন, “মব সৃষ্টি করে অবৈধভাবে জনকণ্ঠ ভবন দখল” করা হয়েছে, যা সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত।

তবে এসব “মিথ্যাচার” এবং “দায়ের অযোগ্য অভিযোগ” বলে উড়িয়ে দিয়ে মেজর আফিজ জানান তিনি শুধুমাত্র দায়িত্ব পালন করেছিলেন, কোনো হস্তক্ষেপ করেননি।

তবে জনকন্ঠ থেকে এর আগে মুক্তিযুদ্ধপন্থী হিসেবে পরিচিত ২০ জনের অধিক সাংবাদিককে ‘মব’ সৃষ্টি করে বের করে দেন পত্রিকাটির প্ল্যানিং এডিটর ও জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি’র যুগ্ম সদস্য সচিব জয়নাল আবেদিন শিশির।

গত বছরের ৫ই আগস্ট রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের পর গুপ্ত সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতা ও পরবর্তীতে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব জয়নাল আবেদিন শিশিরকে জনকন্ঠে প্ল্যানিং এডিটর পদে নিয়ে আসেন মেজর আফিজ।

অথচ শিশিরের প্ল্যানিং এডিটর হওয়ার কোন যোগ্যতা ছিল না, তার সাংবাদিকতা জীবনের বয়সও মাত্র ২ বছর আগে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ট্রেইনি রিপোর্টার হিসেবে; কিন্তু একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র মেজর আফিজের মাধ্যমে জনকন্ঠের হর্তাকর্তা হয়ে উঠেন তিনি।

Visited 54 times, 1 visit(s) today