আন্তর্জাতিক
ওয়াশিংটন ও ব্যাংকক থেকে রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসন সম্প্রতি এমন একাধিক প্রস্তাব বিবেচনা করেছে যা দীর্ঘদিনের মার্কিন নীতিকে আমূল বদলে দিতে পারে। এসব প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য হচ্ছে মিয়ানমারের বিপুল পরিমাণ বিরল খনিজ সম্পদের প্রবাহ চীনের পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঘুরিয়ে আনা।
চারটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি এবং এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে বিভিন্ন লজিস্টিক বাধা রয়েছে। তবে যদি প্রস্তাবনাগুলো বাস্তবায়নের দিকে এগোয়, তাহলে ওয়াশিংটনকে সম্ভবত কাচিন স্বাধীনতা বাহিনী (KIA)-এর সঙ্গে চুক্তিতে যেতে হতে পারে, যারা দেশের উত্তরাঞ্চলের খনিজসমৃদ্ধ এলাকাগুলো নিয়ন্ত্রণ করে।
এই প্রস্তাবগুলোর মধ্যে একটি হলো মিয়ানমারের জান্তা সরকারের সঙ্গে শান্তি চুক্তির মাধ্যমে কাচিন বিদ্রোহীদের সঙ্গে বোঝাপড়া গড়ে তোলা। অন্য একটি প্রস্তাব জান্তাকে এড়িয়ে সরাসরি কাচিন বাহিনীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক স্থাপনের পক্ষে। ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক জান্তার সঙ্গে সরাসরি আলোচনা এড়িয়ে চলছে।
এই উদ্যোগগুলো মার্কিন প্রশাসনের কাছে উপস্থাপন করেছেন এক মার্কিন ব্যবসায়িক লবিস্ট, অং সান সু চির এক সাবেক উপদেষ্টা এবং কাচিন বাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কিছু যোগাযোগকারী। আলোচনাগুলো এতদিন প্রকাশ্যে আসেনি।
বিরল খনিজ হচ্ছে এমন ১৭টি ধাতু যা অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, বিশেষ করে যুদ্ধবিমান ও অস্ত্র নির্মাণে অপরিহার্য। যুক্তরাষ্ট্র এসব খনিজের অল্প পরিমাণ উৎপাদন করে এবং বেশিরভাগই আমদানি করে, যার প্রক্রিয়াজাতকরণের ৯০% চীনের হাতে।
ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি ইস্যু হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে চীনের প্রভাব কমাতে এবং এই খনিজ সরবরাহ সুরক্ষিত রাখতে যুক্তরাষ্ট্র বিকল্প উৎস খুঁজছে।
গত সপ্তাহে ট্রাম্প প্রশাসন কয়েকজন জান্তা ঘনিষ্ঠের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করলেও মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এটি মিয়ানমারের প্রতি মার্কিন নীতিতে বড় কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত নয়।
অ্যাডাম ক্যাসটিলো নামের একজন প্রাক্তন আমচ্যাম (AmCham) কর্মকর্তা এবং মিয়ানমারভিত্তিক নিরাপত্তা সংস্থার প্রধান জানিয়েছেন, তিনি প্রশাসনকে অনুরোধ করেছেন যুক্তরাষ্ট্র যেন কাচিন বাহিনীর সঙ্গে একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে সম্পদ আহরণে যুক্ত হয় এবং এতে কোয়াড জোটের দেশগুলোরও (ভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়া) ভূমিকা থাকে।
তিনি আরও বলেন, চীনের দখলে থাকা বাজার থেকে বেরিয়ে আসতে চায় কাচিন বাহিনী এবং তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী।
অন্যদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাচিন রাজ্যের দুর্গম অঞ্চল থেকে ভারতে খনিজ পরিবহনের বাস্তবতা অত্যন্ত কঠিন। সুইডিশ লেখক বার্টিল লিন্টনার একে “একেবারেই পাগলামি” আখ্যা দিয়ে বলেন, “যদি তারা চিনা সীমান্তঘেঁষা পাহাড়ি অঞ্চল থেকে ভারতে খনিজ নিয়ে যেতে চায়, তবে একমাত্র একটি রাস্তা আছে – যা সহজেই চীনের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে।”
মিয়ানমারের সামরিক সরকার অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে আগ্রহ দেখাচ্ছে। ট্রাম্প সম্প্রতি মিয়ানমারের রপ্তানির ওপর ৪০% শুল্ক আরোপের হুমকি দিলে, জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং এক চিঠিতে ট্রাম্পের “শক্তিশালী নেতৃত্বের” প্রশংসা করে শুল্ক হ্রাস ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান। এমনকি তিনি একটি আলোচনা দল ওয়াশিংটনে পাঠানোর কথাও বলেন।
হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে এখনও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে প্রশাসনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, “এই আলোচনাটি ছিল আমেরিকান ব্যবসায়ী সমাজের প্রতি সম্মান জানিয়ে এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাসের প্রচেষ্টাকে সহায়তা করতেই করা।”
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, মিয়ানমারের সংকটপূর্ণ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সম্পৃক্ত হবে কি না, তা এখনও অনিশ্চিত। তবে যদি কাচিন অঞ্চলের খনিজ উৎসের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা বাস্তবায়িত হয়, তাহলে তা হবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভূরাজনীতির দৃশ্যপট বদলে দেওয়ার মতো এক বড় পদক্ষেপ।
