উপদেষ্টা পরিষদ নির্বাচন পেছানোর ষড়যন্ত্র করছে: মেজর হাফিজ উদ্দিন

উপদেষ্টা পরিষদ নির্বাচন পেছানোর ষড়যন্ত্র করছে: মেজর হাফিজ উদ্দিন
শেয়ার করুন
নিজস্ব প্রতিবেদক। ভোলা, ২৭ জুলাই ২০২৫।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ অভিযোগ করেছেন যে, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ নির্বাচন পেছানোর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। তিনি বলেন, এই পদক্ষেপ গণতান্ত্রিক চর্চার পরিপন্থী এবং এর মাধ্যমে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার উদ্দেশ্য স্পষ্ট। শনিবার (২৬ জুলাই ২০২৫) ভোলার লালমোহন উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে উপজেলা ও পৌর বিএনপির ত্রি-বার্ষিক সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই অভিযোগ তুলেন।

মেজর হাফিজ উদ্দিন বলেন,

“বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল অন্তর্বর্তী সরকারকে সমর্থন দিয়েছে। আমরা আশা করেছিলাম, এই সরকার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে যাবে। কিন্তু আমাদের প্রত্যাশা এখনো পূরণ হয়নি। দেশে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অপরিহার্য। কিন্তু বর্তমানে উপদেষ্টা পরিষদ নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে, যার পেছনে তাদের আরও পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার উদ্দেশ্য স্পষ্ট।”

তিনি অভিযোগ করেন, “ক্ষমতার স্বাদ ত্যাগ করতে না চাওয়ার কারণেই এই ষড়যন্ত্র চলছে।”

পিআর নির্বাচন পদ্ধতির সমালোচনা

সম্মেলনে মেজর হাফিজ প্রস্তাবিত আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) নির্বাচন পদ্ধতির তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “যারা দেশের বাস্তবতা, বিশেষ করে গ্রামবাংলার মানুষের ভোটদানের প্রকৃতি সম্পর্কে জানেন না, তারাই এ ধরনের সংস্কার প্রস্তাব দিচ্ছেন। পিআর পদ্ধতিতে ভোটাররা প্রার্থীর ব্যক্তিগত যোগ্যতা বা অবদান বিবেচনা না করে শুধু দলীয় প্রতীকে ভোট দেবেন। এতে ভোটাররা প্রার্থীর মুখ দেখারও সুযোগ পাবেন না।” তিনি আরও বলেন,

“এই পদ্ধতির পক্ষে কথা বলছে এমন ছোট দলগুলো, যাদের জনগণের ভোট পাওয়ার সম্ভাবনা কম।”

বিএনপির অবস্থান স্পষ্ট করে তিনি বলেন, “আমরা এমন একটি নির্বাচন ব্যবস্থা চাই, যেখানে ভোটাররা প্রার্থীর ব্যক্তিগত গুণাগুণ, অতীতের কাজ এবং জনগণের জন্য তাদের অবদান বিবেচনা করে ভোট দেবেন। জনগণ তাদের প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, “এটিই বিএনপির দাবি।”

দ্রুত নির্বাচনের দাবি

মেজর হাফিজ উদ্দিন দ্রুত নির্বাচনের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, “যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচন দিতে হবে। সর্বোচ্চ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া উচিত। জনগণ যাকে ভোট দেবেন, তিনিই ক্ষমতায় আসবেন। আমরা তা মেনে নেব।” তিনি আরও বলেন, “নির্বাচনের কথা বললেই উপদেষ্টাদের মুখ কালো হয়ে যায়। আমরা কোনো অন্যায় দাবি করছি না। আমরা শুধু জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য সুষ্ঠু নির্বাচন চাই।”

অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা

অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রম নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে মেজর হাফিজ বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আমাদের অনেক প্রত্যাশা ছিল, কিন্তু তারা জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি জুলাই-আগস্টে আন্দোলনে যারা আহত হয়েছেন, তাদের খোঁজখবর নেওয়া বা তাদের মূল্যায়ন করার কোনো উদ্যোগও তারা নেয়নি।” তিনি আরও বলেন,

“বিএনপি ১৬ বছর ধরে দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে। আমরা চেষ্টা করেছি দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে। কিন্তু উপদেষ্টা পরিষদের বর্তমান কার্যক্রমে সেই আশা ম্লান হয়ে যাচ্ছে।”

লালমোহন উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক তাহারাত হাফিজ অর্কের সভাপতিত্বে এবং সদস্য সচিব শফিকুল ইসলাম বাবুলের সঞ্চালনায় সম্মেলনে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আ. ক. ন. কুদ্দুসুর রহমান। সম্মেলনের উদ্বোধন করেন জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ভোলা জেলার সমন্বয়ক আবু নাসের রহমত উল্লাহ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক গোলাম নবী আলমগীর, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক শফিউর রহমান কিরণ এবং সদস্য সচিব রাইসুল আলম।

মেজর হাফিজ উদ্দিন আরও বলেন, “দেশে সংস্কারের প্রয়োজন হলে তা নির্বাচিত সংসদের মাধ্যমে হওয়া উচিত। কোনো দল বা গোষ্ঠী এককভাবে সংস্কারের সিদ্ধান্ত নিলে তা ভুল হবে।” তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান, “আমাদের দলের মধ্যে কোনো দুর্নীতিবাজ বা সুবিধাবাদী ঢুকে পড়তে পারে। তাই সতর্ক থাকতে হবে।” তিনি ভোলায় সম্প্রতি আওয়ামী লীগের কিছু কর্মীকে বিএনপির মিছিলে যোগ দেওয়ার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, “এ ধরনের ঘটনা থেকে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।”

মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমেদের এই বক্তব্য বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং নির্বাচন নিয়ে উপদেষ্টা পরিষদের ভূমিকা নিয়ে তীব্র বিতর্কের সূচনা করেছে। তিনি স্পষ্টভাবে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন এবং ক্ষমতার দীর্ঘায়নের যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন। এই বক্তব্য রাজনৈতিক মহলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং আগামী দিনে নির্বাচনের সময়সীমা ও প্রক্রিয়া নিয়ে আরও তীব্র বিতর্কের সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

Visited 9 times, 1 visit(s) today