নিজস্ব প্রতিবেদক | ১৬ই জুলাই
কোটা সংস্কারের নামে আন্দোলনকে সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রে রূপ দেওয়া হয় গত বছরের জুলাইয়ে, যা এখন সবাই জানেন। সেই আন্দোলনে গুপ্ত হামলা, সহিংসতা, লাশ ফেলে আন্দোলন বেগবান করতে গুজব ছড়ানো- সবই ছিল পরিকল্পনার অংশ। এতে অংশ নেয় বিএনপি, যুদ্ধাপরাধী জামায়াতে ইসলামী, তাদের গুপ্ত সন্ত্রাসী সংগঠন শিবিরসহ ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকার কিশোর গ্যাংসহ আরও অনেকেই।
কোটা সংস্কার, বৈষম্যবিরোধী, এক দফা এবং পরে সরকার উৎখাতের আন্দোলন- এভাবে আন্দোলন সহিসংতার দিকে নিয়ে যান শিক্ষার্থীদের ছদ্মাবরণে থাকা রাষ্ট্রবিরোধী বিভিন্ন গোষ্ঠী। তাদের নৃশংসতার প্রথম বলি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কর্মী সবুজ। গত বছরের এ দিনে তাকে হত্যা করে লাশ রাস্তার পাশে ফেলে রাখা হয়েছিল।
পরদিন ১৭ই জুলাই দেশের বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমে এ সংবাদ প্রকাশিত হলেও অজ্ঞাত কারণে তা ধামাচাপা পড়ে যায়। বরং সবুজের মরদেহের ছবি ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের উস্কে দিয়ে দাবি করা হয়- আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীকে মেরে ফেলেছে ছাত্রলীগ।
এভাবে ছাত্রলীগ কর্মীকে আন্দোলনকারী সাজিয়ে উল্টো দায় চাপিয়ে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলা হয় সবাইকে। হারিয়ে যায় সবুজের রাজনৈতিক পরিচয়। অর্থাৎ লাশের রাজনীতির প্রথম শিকারও সবুজ।
গতবছর প্রকাশিত পত্রিকার তথ্য বলছে, ঢাকা কলেজের সামনে পড়ে ছিল ছাত্রলীগ কর্মী সবুজ আলীর (২৬) মরদেহ। প্রথমে অজ্ঞাত থাকলেও পরে শনাক্ত করা হয় তার হাতের ছাপ পরীক্ষার মাধ্যমে।

শহিদ সবুজ আলী
সেসময় নিউ মার্কেট থানার এসআই মাহাবুব আলী জানান, সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিটের একটি দল মরদেহের আঙুলের ছাপ ডাটাবেজের সঙ্গে মিলিয়ে সবুজের পরিচয় শনাক্ত করে।
সবুজ আলী ঢাকা কলেজের পরিসংখ্যান বিভাগের ১৮/১৯ সেশনের ছাত্র ছিলেন; থাকতেন কলেজের নর্থ হলের ২০৫ নং কক্ষে। তিনি নীলফামারীর সদর উপজেলার বাদশা মিয়ার ছেলে। সবুজ ঢাকা কলেজ সংলগ্ন একটি ফটোকপির দোকানে পার্টটাইম কাজ করে নিজের ব্যয় নির্বাহ করতেন।
ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের যে পরিকল্পিতভাবে টার্গেট কিলিং করছে আন্দোলনকারীরা, সেই দাবি তথনই সংগঠনের পক্ষ থেকে করা হয়েছিল। যার প্রমাণ সবুজ, পরবর্তী সময়ে এমন অসংখ্য উদাহরণ দেখা গেছে।
শহিদ সবুজ আলীকে নিয়ে সংগঠনের প্রতিক্রিয়া
সবুজ ছাত্রলীগের নিষ্ঠাবান কর্মী ছিলেন জানিয়ে শোক প্রকাশ করেন আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ।
ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান স্বাক্ষরিত শোকবার্তায় উল্লেখ করা হয়, “বিএনপি-জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসী হামলায় ঢাকা কলেজ শাখা ছাত্রলীগের কর্মী মো. সবুজ আলী মারা গেছেন। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ পরিবার তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করছে এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছে।”
অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়ে ওই বার্তায় বলা হয়, “বাংলাদেশ ছাত্রলীগ বিএনপি-জামায়াত-শিবিরের দেশব্যাপী তাণ্ডবের বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে।”

শহিদ সবুজ আলী
ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগ নেতা রজ্জব রায়হান বলেন, সবুজ ছিল ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের অনন্য কর্মী। নিজে উপার্জন করে সংগঠন করতো। কলেজে ফটোকপির দোকানে কাজ করে নিজে চলতো, পরিবারকেও সহায়তা করতো। আমরা ছাত্রলীগের এমন একনিষ্ঠ কর্মী ছোট ভাইকে হারিয়ে সত্যিই ভীষণ বেদনাহত।
ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের আরেক নেতা শেখ মিথুন বলেন, ঢাকা কলেজে আমরা পরিবারের মতো থাকতাম। সবুজ শুধু ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের কর্মী নন, আমাদের ভাইও। ওর পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা।
যা ঘটেছিল সেদিন
সেদিনের ঘটনাক্রম পর্যালোচনায় দেখা যায়, আন্দোলনকারীরা ১৬ই জুলাই দুপুর ১২টার পর ঢাকা কলেজের অদূরে সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়ে অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। এতে মিরপুর সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে তীব্র যানজটে পড়েন সাধারণ মানুষ। তখন ছাত্রলীগের কর্মীরা সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক করতে রাস্তায় নামলে বিনা উস্কানিতে তাদের ওপর চড়াও হন আন্দোলনকারীরা। ইট-পাটকেল ছুড়ে এবং লাঠিসোটা, পাইপ, রড নিয়ে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন তথাকথিত শিক্ষার্থীরা।

ঢাকা কলেজের সামনে আন্দোলনকারীরা, যেখানে সবুজ আলীকে হত্যা করা হয়, ১৬ই জুলাইর ছবি
বিকেল ৪টার দিকে সংঘর্ষ ঢাকা কলেজ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় ঢাকা কলেজের সামনের রাস্তায় এক যুবককে (সবুজ) রাস্তায় রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। বিডিনিউজ-এর আলোকচিত্রীর তোলা ছবিতে দেখা যায়, পড়ে থাকা যুবককে পেটাচ্ছে লাঠি হাতে এক আন্দোলনকারী।
গুরুতর আহত সবুজকে বিকেল সোয়া ৫টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন বলে হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক বাচ্চু মিয়া জানান। রাতে তাকেই সবুজ আলী হিসেবে শনাক্ত করেন সিআইডির বিশেষজ্ঞরা।
পরদিন ১৭ই জুলাই, বুধবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় প্রাঙ্গণে শহিদ সবুজ আলীর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমসহ দলের অঙ্গ সংগঠনের সিনিয়র নেতাকর্মীরা অংশ নেন।
এর আগে শাহবাগ মোড়ে তার লাশবাহী অ্যাম্বুল্যান্স ঘিরে বিক্ষোভ করেছেন নেতাকর্মীরা।
জানাজা শেষে নিহত সবুজ মিয়ার মরদেহে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। এরপর আওয়ামী লীগ, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগসহ দলের বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান নেতারা।

শহিদ সবুজ আলীর জানাজা
জানাজায় অংশ নিয়ে সবুজের বড় ভাই নুরনবী এ হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচার দাবি করেন। জানাজা শেষে সবুজের মরদেহ দলের পক্ষ থেকে ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। পরে সবুজের মরদেহ তার নিজ এলাকা নীলফামারীর সদর উপজেলার উদ্দেশে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মরদেহ দাফন করা হয়।
মামলা হলেও হারিয়ে গেছে অতল গহ্বরে
কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের হামলায় ছাত্রলীগকর্মী সবুজ আলী নিহতের ঘটনায় মামলা করা হয়েছে। মামলায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। ১৭ই জুলাই, বুধবার রাজধানীর নিউমার্কেট থানায় মামলা করা হয়। সবুজের মৃত্যুর ঘটনায় তার ভাই নুরনবী বাদী হয়ে এ মামলা করেন।
১৮ই জুলাই বৃহস্পতিবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মেহেরা মাহাবুব মামলার এজহার গ্রহণ করে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ২৫শে আগস্ট দিন ধার্য করেছিলেন। কিন্তু সেই প্রতিবেদন হারিয়ে গেছে কালের অতলে।
সবুজের ভাই নুরনবী মামলার এজাহারে উল্লেখ করেন, আমার ভাই সবুজ আলী ঢাকা কলেজে অনার্স চতুর্থ বর্ষে পড়ালেখা করতো এবং ঢাকা কলেজের উত্তর ছাত্রবাসে বসবাস করতো। ১৭ই জুলাই রাত ৩টায় খবর পাই কোটাবিরোধী আন্দোলনকারী দ্বারা আক্রান্ত হয়ে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে উপস্থিত হয়ে মর্গে ভাইয়ের মরদেহ শনাক্ত করি।
মামলার এজাহারে আরও বলা হয়, গত ১৬ই জুলাই বিকেল ৪টা ১৫ মিনিটে সবুজ অজ্ঞাতনামা কোটাবিরোধী আন্দোলনকারী কর্তৃক গুরুতর জখম হয়ে ঢাকা কলেজের সামনে রাস্তার পূর্ব পাশে পাকা রাস্তার উপর পড়ে ছিল। উপস্থিত পথচারীরা তার চিকিৎসার জন্য দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। ঢামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত ডাক্তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ৫টা ১৫ মিনিটে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
সর্বশেষ কোনো আপডেট পাওয়া যায়নি এই মামলার। কেউ কি সবুজ আলী হত্যার বিচার চাইবে? কার কাছে চাইবে? এমন প্রশ্ন তার পরিবারের নয়, সাধারণ জনতার।
