মৃণ্ময় সেন
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অমর অধ্যায়, যেখানে অগণিত বীর সন্তান জীবনের মূল্য দেয়নি মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য। এই বীরদের মধ্যে একজন উজ্জ্বল নাম হলো মেজর এটিএম হায়দার, যিনি বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত হয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে অপরাজেয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাঁর সাহস, কৌশল এবং নেতৃত্বের গল্প আজও আমাদের জাতীয় গর্বের উৎস।
জীবনের প্রথম পর্ব ও সৈনিক জীবন
আবু তাহের মোহাম্মদ হায়দার (জন্ম: ১২ জানুয়ারি ১৯৪২) কলকাতার ভবানীপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মোহাম্মদ ইসরাইল কলকাতা পুলিশে সাব-ইন্সপেক্টর ছিলেন এবং পরে কিশোরগঞ্জে আইনজীবী হিসেবে কাজ করতেন। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করে তিনি কাকুল মিলিটারি একাডেমি থেকে উচ্চ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। চেরাটে ও কমান্ডো প্রশিক্ষণ শেষে তিনি মুলতান ক্যান্টনমেন্টে পোস্টিং পান, পরে ১৯৬৯ সালে কুমিল্লা সেনানিবাসে যোগ দেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এসএসজি (স্পেশাল সার্ভিস গ্রুপ) এর প্রশিক্ষিত কমান্ডো হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধে প্রবেশ ও ভূমিকা
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অত্যাচার শুরু হলে মেজর হায়দার কুমিল্লা সেনানিবাস থেকে পালিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। তিনি ২ নম্বর সেক্টরে মেজর খালেদ মোশাররফের সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সেক্টরে তিনি গেরিলা যুদ্ধের কৌশল গড়ে তোলার মাধ্যমে মুক্তিবাহিনীর শক্তি বৃদ্ধি করেন। মেলাঘরে প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের কমান্ডো, বিস্ফোরক ও গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দিয়ে একটি শক্তিশালী বাহিনী তৈরি করেন। তিনি প্রথম স্টুডেন্ট কোম্পানি গড়ে তুলে তরুণদের যুদ্ধে অংশগ্রহণের পথ প্রশস্ত করেন।
বীরত্বের উদাহরণসমূহ
মেজর হায়দারের নেতৃত্বে অসংখ্য দুঃসাহসিক অপারেশন পরিচালিত হয়। তিনি কিশোরগঞ্জ-ময়মনসিংহ মহাসড়কের তারের ঘাটপুল ও মুসল্লি রেলপুল ধ্বংস করে পাকিস্তানি বাহিনীর চলাচল বন্ধ করেন। ঢাকা-চট্টগ্রাম রাস্তার ফেনিতে অবস্থিত বড় ব্রিজ ধ্বংস করে তিনি শত্রুর লজিস্টিক সরবরাহে ব্যতিচার সৃষ্টি করেন। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে, তিনি ক্র্যাক প্লাটুন নামে একটি গেরিলা বাহিনী গড়ে তোলেন, যা ঢাকায় পাকিস্তানি সেনাদের ত্রাসে রাখে। এই বাহিনী বিদ্যুতের যোগাযোগ ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটিয়ে যুদ্ধের গতি বাড়ায়। অক্টোবরে মেজর খালেদ মোশাররফ আহত হলে তিনি ২ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং সফলভাবে সেক্টর পরিচালনা করেন।
১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১-এ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে তিনি প্রধান ভূমিকা পালন করেন। তিনি পরাজিত পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা দিয়ে আত্মসমর্পণ মঞ্চে নিয়ে যান এবং ঢাকা বেতার ও টিভি থেকে “আমি মেজর হায়দার বলছি” ঘোষণা দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের নির্দেশনা প্রচার করেন। যুদ্ধোত্তর ঢাকায় লুটপাট বন্ধ ও আইনশৃঙ্খলা ফিরে পাওয়াতেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল।
বিয়োগান্ত বিদায়
স্বাধীনতা অর্জনের পর ১৯৭৩ সালে তিনি বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত হন। তবে ১৯৭৫ সালে রাজনৈতিক উত্তালতার মধ্যে ৭ নভেম্বর তিনি জেনারেল খালেদ মোশাররফের সঙ্গে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তিনি কোনো অভ্যুত্থানে জড়িত ছিলেন না, তবুও এই দুর্ঘটনা তাঁর জীবনের অমর ত্যাগের কালো দাগ রেখে গেছে।
উত্তরাধিকার ও অনুপ্রেরণা
মেজর হায়দারের জীবন আমাদের শেখায় যে দেশপ্রেমের কোনো সীমা নেই। তিনি একজন প্রশিক্ষিত সৈনিক হিসেবে শত্রুর পাশে থাকতে পারতেন, কিন্তু তিনি বাঙালি হৃদয়ের ডাকে সাড়া দিয়ে শত্রু হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর গেরিলা কৌশল ও নেতৃত্ব আজও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি উজ্জ্বল অধ্যায়। তাঁর পরিবার, বিশেষ করে বোন ক্যাপ্টেন ডা. সিতারা বেগম (বীরপ্রতীক) ও ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা টি এম সফদার জিতু, তাঁর সংগ্রামের অংশ ছিলেন। তাঁর জীবনী গ্রন্থ ও স্মৃতিসৌধ আজও তরুণ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে।
উপসংহার
মেজর এটিএম হায়দার ছিলেন একজন সত্যিকারের দেশপ্রেমিক, যিনি তাঁর জীবন দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা রক্ষা করেছেন। তাঁর বীরত্ব ও ত্যাগ আমাদের কাছে একটি শক্তিশালী স্মৃতি, যা আমাদের দেশের জন্য কাজ করতে ও তাঁদের আদর্শ ধরে রাখতে উৎসাহিত করে। তাঁর স্মৃতি চিরস্থায়ী হোক এবং তাঁর ত্যাগ বৃথা যাক না—এই প্রতিজ্ঞা আমাদের।
শ্রদ্ধাঞ্জলি মেজর এটিএম হায়দারকে, যিনি রক্তে রাঙিয়েছেন স্বাধীনতার পতাকা।
