মতামত || রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে উপড়ে ফেলার প্রয়াস: উগ্র মৌলবাদীদের পরিচয় সংকটের উদাহরণ

মতামত || রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে উপড়ে ফেলার প্রয়াস: উগ্র মৌলবাদীদের পরিচয় সংকটের উদাহরণ
শেয়ার করুন

মৃণ্ময় সেন

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত কাছাবাড়িতে একদল উগ্রবাদীর হামলা ঘটনা বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উপর গভীর প্রশ্ন তুলেছে। এই হামলা শুধু একটি স্থাপত্য ধ্বংসের ঘটনা নয়, বরং সজ্ঞানে বাঙালি সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশকে বর্জনের একটি চেষ্টার পরিচয় দেয়।

বহুদিন ধরে মৌলবাদী গোষ্ঠীরা রবীন্দ্রনাথকে হিন্দু ও ভারতীয় হিসেবে চিহ্নিত করে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করার প্রয়াস চালিয়ে আসছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে কাজী নজরুল ইসলামকে ধর্মীয় আলোকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা খুব দৃষ্টিকটুভাবে লক্ষনীয়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাঙালি সংস্কৃতির একটি সার্বজনীন প্রতীক, যিনি ধর্ম ও জাতির সীমা অতিক্রম করে সর্বজনীন প্রেম মানবতার সুর লিখেছেন। তাঁর সাহিত্য ও দর্শন বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির মেরুদণ্ড। কিন্তু কিছু উগ্রবাদী, যারা পরিচয় সংকটে ভোগে, তাঁকে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় বা ভৌগোলিক সীমার মধ্যে আটকে রাখতে চায়। এই চেষ্টায় তাঁর কাছাবাড়ি ধ্বংসের মাধ্যমে একটি সাংস্কৃতিক হত্যাকাণ্ডের প্রতীক হিসাবে দেখা যায়।

অন্যদিকে, কাজী নজরুলকে ধর্মীয় আলোতে তুলে ধরে তাঁকে রবীন্দ্রের পরিপন্থী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা একটি ইতিহাসবিরোধী পদক্ষেপ। নজরুল ও রবীন্দ্র উভয়েই বাঙালি সংস্কৃতির দুটি বিভিন্ন মাত্রা, যা পরস্পরকে সমৃদ্ধ করেছে, এমন নয় যে একজনকে বর্জন করে অন্যজনকে জোর করে প্রতিষ্ঠিত করা যায়।

১৯২১ সালে স্টকহলমে রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমিতে রবীন্দ্রনাথ

এই পরিপ্রেক্ষিতে লতিফুল ইসলাম শিবলি ও পানাকী ভট্টাচার্যের ভূমিকা সন্দেহজনক। শিবলী, নজরুল ইন্সটিউটের প্রধান হিসেবে, নজরুলের ঐতিহ্যকে ধর্মীয় রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগে রয়েছেন। পিনাকী ভট্টাচার্যের কুটিল ষড়যন্ত্রকারিত্বও এই উত্তেজনায় ভূমিকা রাখতে পারে। এই গোষ্ঠীর উদ্দেশ্য হতে পারে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ধর্মনিরপেক্ষতা থেকে বিচ্যুত করে একটি সংকীর্ণ পরিচয়ে আবদ্ধ করা। যদি জনগোষ্ঠি সংকীর্ণতায় আবদ্ধ থাকে, তাহলে তাদের পরিচালিত আর প্রভাবিত করা এদের পক্ষে খুব সহজ হয়।

একই সঙ্গে, ড. মুহাম্মদ ইউনুসকে প্রথম নোবেল বিজয়ী বাংলাদেশি হিসেবে উজ্জ্বল করার চেষ্টা একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও সামাজিক এজেন্ডার প্রতিফলণ। ইউনুসের অর্থনৈতিক অবদান অস্বীকারযোগ্য নয়, তবে তাঁকে রবীন্দ্রের মতো সাংস্কৃতিক আইকনের পরিবর্তে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় ঐতিহ্যকে হ্রাস করতে পারে। এটি একটি ইতিহাসপ্রণোদিত সংস্কৃতিকে অর্থনৈতিক সাফল্যের সঙ্গে প্রতিস্থাপনের অপপ্রয়াস বলে মনে হয়।

হামলার প্রতিক্রিয়ায় ভারত, বাংলাদেশ ও বিদেশের সংস্কৃতিপ্রেমী ব্যক্তিত্বদের প্রতিবাদ এবং বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এটি দেখায় যে, রবীন্দ্রনাথ শুধু একটি ব্যক্তিত্ব নন, বরং দুই বাঙালি জাতির, বাংলা ভাষাভাষী দুই জাতির সংযোগসূত্র। তবে এই প্রতিবাদগুলো কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে এই ঘটনার রাজনৈতিক ব্যবহার এড়িয়ে সাংস্কৃতিক একতার পথে এগোনোর উপর।

সর্বোপরি, এই ঘটনা বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অস্থিরতার প্রতিচ্ছবি। রবীন্দ্রনাথকে বর্জন ও নজরুল বা ইউনুসকে জোর করে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা একটি সংকীর্ণ মনোভাবের পরিচয়। বাঙালি সংস্কৃতি বহুমুখী ও সহাবস্থানী, যা একজনের বা একটি দৃষ্টিকোণের ওপর নির্ভরশীল নয়। এই হামলা ও তার পেছনের উদ্দেশ্য বাংলাদেশকে একটি সংঘাতময় পরিচয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে, যদি তা সঠিকভাবে প্রতিরোধ করা না হয়।

লেখক পরিচিত: সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক সচেতন বাঙালি

Visited 10 times, 1 visit(s) today