[মুক্তিযোদ্ধা আজিজুর রহমান আসাদ একদা সাম্যবাদী রাজনীতির সক্রিয় কর্মী ছিলেন। সে রাজনীতি থেকে সরে এলেও দ্বন্দ্ব নিরসনে মানুষের চিন্তার প্রসার ঘটাতে এখনও গ্রামে-গঞ্জে দেশে বিদেশে কাজ করে যাচ্ছেন। সামাজিক পরিবর্তন কোন্ দিকে যাচ্ছে বুঝতে তার সমাজ-বিশ্লেষণ চিন্তার খোরাক যোগায়। এই লেখাটি তার বিভিন্ন সময়ের সোশ্যাল মিডিয়ার আলাপ আলোচনা থেকে সংকলিত। জাহানারা নুরী।]
আজিজুর রহমান আসাদ
এক.
আগামীতে ‘রাজাকার আলবদর পরিবারের’সামরিক শাখা কিভাবে ‘জাকার্তা মেথড’বাস্তবায়ন করবে, নিচের লেখাটি তার একটি নমুনা।
একজন সেক্যুলার রাজনৈতিক নারীকর্মীর পরিবারের ঠিকানা ও ছবি দিয়ে পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে, ফাইনাল সল্যুশনের জন্য। এটি এমন একটি পদ্ধতি যাতে আমেরিকান বা পাকিস্তানী সৈন্য এসে হত্যাকাণ্ডের দরকার নেই, স্থানীয় স্লিপার সেল নিয়ন্ত্রিত ‘মব’দিয়েই কাজ হয়ে যাবে। এ পদ্ধতি কিভাবে কাজ করবে? ‘মব’যাবে চাপাতি নিয়ে, মবের পেছনে থাকবে প্রশিক্ষিত সশস্ত্র জ্বিহাদী জঙ্গিরা।

দুই.
বাংলাদেশে ‘জাকার্তা মেথড’বাস্তবায়নের জন্য ১৯৮০ দশক থেকে মার্কিন সিআইএ ও পাকিস্থানি আইএসআই কাজ করে চলেছে, স্থানীয় ‘অপারেটর’তৈরিতে। গতকালের পোস্টে বাংলাদেশে রাজাকার আলবদর পরিবারের ‘সামরিক শাখার’কর্মকাণ্ডের একটি টাইম লাইন দিয়েছি।
প্রথমত বাস্তবতা মেনে নিন, বাংলাদেশে ১৩৩ টি জঙ্গিগ্রুপ আছে, ২৪০ টির বেশি কিশোর গ্যাং আছে। এদের আন্তর্জাতিক মুরুব্বী আছে, দেশীয় অনুচর আছে। বিভ্রান্ত ‘অসচেতন বিশ্বাসঘাতক’আছে, প্রশাসনের ভেতরে ‘ক্যাডার’আছে। এরা সবাই মিলে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে চায়।
বাংলাদেশে যা চলছে, তা মার্কিন মিলিটারি স্ট্রাটেজিক পরিকল্পনায় চলছে।এখানে পদ্ধতিগত প্রতারণা একটি সামরিক কৌশল; ফলস ফ্ল্যাগ অপারেশন ও সাই-অপস চলছে। একটি ব্যাপার খেয়াল করুন, আওয়ামীলীগের বিরুদ্ধে যে ভাষা, তা বামপন্থীদের নয়, পুরোটাই নিও-লিবারেল, ‘আইনের শাসন ও মানবাধিকার লঙ্ঘন’বিষয়ক, মূলত NED (National Endowment for Democracy) এর পরিভাষা। যেমন ‘ফ্যাসিবাদ, দুঃশাসন হটাও, চরম দুর্নীতি, অমানবিক নির্যাতন নিপীড়ন’ইত্যাদি। এগুলো কিন্তু কোন শ্রেণী-বিশ্লেষণ না, কিংবা বাংলাদেশের জনগণতন্ত্র-সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কর্মসূচি নয়।রেজিমচেঞ্জের উদ্দেশ্যে উস্কানির ভাষা-কৌশল; শোষণ ও বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা টিকিয়ে রেখে ‘সুশাসনের’আওয়াজ তোলা।
তিন.
১৯৬৫-৬৬ ইন্দোনেশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির (PKI) কর্মী-সমর্থকসহ প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ ‘মব’দিয়ে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ড মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অনুগত সামরিকবাহিনী, ইসলামী গ্রুপ ও স্থানীয় মিলিশিয়া ব্যবহার করে সংঘটিত করা হয়।
জাকার্তায় সাম্যবাদী ও দেশপ্রেমিক প্রগতিশীল মানুষদের যে পদ্ধতিতে হত্যা করা হয়েছে, তার মধ্যে ছিল তিনটি পদ্ধতি:
(১) আগে মুক্তিপণ আদায় করা, তারপর হত্যা করা;
(২) পরিবারের সম্পত্তি লিখিয়ে নিয়ে হত্যা করা, এবং
(৩) আগুন দিয়ে ভয় দেখিয়ে বাঁচিয়ে রাখার শর্তে নিয়মিত ‘চাঁদা আদায়’করা। চাঁদা দিতে ব্যার্থ হলে হত্যা করা।
সবশেষে আরেকটি উদাহরণ দেয়া যাক: “ছাত্র নামধারী জামাত শিবির ক্যাডার ও সমর্থকরা ১৩৮টি কিশোর গ্যাং তৈরি করে সমাজে দখল ও সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে, তাদের অত্যাচারের বিভৎসতা মানুষকে মূক করে দিয়েছে। এই সহিংসতার চরম বাস্তবতায় তাদের ওপর বারবার অমুকের তমুকে ওপর হামলা চালিয়েছে এমন গুজবও জনরব হিসেবে সোশ্যাল মিডিয়া প্লাবিত করেছে। অতীত সরকারের সময়ে যে সব অপরাধ ন্যূনতম পর্যায়ে সংঘটিত হয়েছে, যা আইনের অধীনে বিচারযোগ্য ছিল সেগুলোকেও ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে অতিরঞ্জিত করে গণহত্যার অপরাধের সমান করে তোলা হয়েছে, বিরোধীপক্ষকে দানবরূপে প্রচার করা হয়েছে জুলাই, ২০২৪ সাল থেকে।
পদ্ধতিগত ছক খেয়ালকরলে এসব অপকর্মের ভেতর দুইটি জটিল বিষয় একসাথে স্পষ্ট হয়:
১.শাসক দল বা তাদের ফ্রন্ট সংগঠনগুলো নিজেদের ‘বিরোধী মতাবলম্বী’, ‘প্রগতিশীল’, এমনকি ‘বৈষম্য বিরোধী’বলে চালাতে চেষ্টা করছে — কিন্তু বাস্তবে তারা ১৯৭১ এর পুরণো রাজণীতিটািই করছে, তাদের সাথে রয়েছে সশস্ত্র গ্যাং, ক্যাডার ও জিহাদী জঙ্গী যারা নিয়ন্ত্রণ করছে সহিংস শক্তিকে। জামাত-শিবির-লেজুড়বৃত্তিক বা সাম্প্রদায়িক শাখা, অথবা এনজিও-মুখো পেইড “সুশীল ছাত্র” ইমেজে মিডিয়ায় হাজির হওয়া মুখোশধারী গোষ্ঠী ও এদের অংশ বিশেষ, যারা রং চড়িয়ে জঙ্গীদের ভাষাতেই প্রচারে অংশ গ্রহণ করছে।
প্রয়োজন হলেই এরা”ভিকটিম”হিসেবে উপস্থাপন করছে নিজেদের ও সরকার তাদের রক্ষা করছে নানাভাবে। এসবই মূলতঃ একটি কৌশলগত প্রচারণা—যার লক্ষ্য হলো বাস্তব ক্ষমতা-কাঠামো আড়াল করা
২.বাংলাদেশেযা ঘটে চলেছে তা হলো“উল্টো অভিযোগের নাটক”
- তারা নিজেরা হামলা করে,ফ্যাসিস্ট আচরণের চূড়ান্ত ভূমিকায় তাদের দেখা যায়, কিন্ত তারপর তারা ভিকটিম সাজে,
- প্রশাসনের ওপর চাপ দিয়ে “তথাকথিত” তদন্তে নিজেদের দায় মুক্ত করে নেয় বা প্রশাসন নিজেই এগিয়ে এসে তাদের দায় মুক্তি দিয়ে দেয়, যেমন দেয়া হয়েছে কিশোর গ্যাংয়ের জুলাই অগাস্টের অপরাধের দায়মুক্তি।
এই প্রক্রিয়া আসলে জাকার্তা মেথডের “ভিকটিম রিভার্সাল” কৌশলের একটি কপি মাত্র।
এ পদ্ধতির মোটো হলো:“We attack, then cry victim, and silence the real victims.”(আমরা তাদের আক্রমণ করবো, তারপর ভিক্টিম ভূমিকায় অবতীর্ণ হবো, এবং সত্যিকারের ভিক্টিমের মুখ বন্ধ করে দেবো” এই হচ্ছে তাদের মূল কৌশল।
চার.
জাকার্তা মেথডএকটি ‘ইনকাম জেনারেটিং’ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্পের মত। অর্থনৈতিক লাভের কারণে এত অল্প সময়ে ১০ লক্ষের অধিক মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। এটি কিন্তু রাষ্ট্রীয়বাহিনীর ‘বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’থেকে একেবারেই আলাদা। ‘মব’দিয়ে হত্যা অনেকটা একটি সমাজের দেহে দ্রুত বর্ধমান ক্যান্সারের মত। যা ঐ সমাজের বেঁচে থাকার প্রাণশক্তি ধ্বংস করে দেয়।
আজ(৩০ মে ২০২৫) তারিখে ফেসবুক খুলেই দেখি গাজীপুরে ‘অন্তর’নামে এক তরুণের ‘মবের’শিকার হওয়ার ঘটনা। ‘ছাত্রলীগ’করার অপরাধে তার পরিবারের কাছে ৩০ লাখ টাকা মুক্তিপণ চাওয়া হয়, এবং দুই লাখ টাকা পাওয়ার পরেও তাঁকে ছাড়া হয়না। ফেসবুক পোস্টে পুরো ঘটনার বর্ণনা না পেলেও আমরা ইতোমধ্যে জানি যে ‘মব’সন্ত্রাসের একটি রাজনৈতিক অর্থনীতি আছে।
বাংলাদেশের সেনাপ্রধান মব সহিংসতা বন্ধের প্রতিজ্ঞা ঘোষণা করলেও, আমার ব্যক্তিগত ধারণা’মব’সহিংসতা বন্ধ করা তার পক্ষে কঠিন হবে। কারণ যুব-বেকারত্ব প্রেক্ষিত থাকায় ‘মব’সন্ত্রাস ইতোমধ্যেই ‘কুটির শিল্প’হিসেবে বিকাশ ঘটেছে, এনসিপির কল্যাণে। আমি পেশাগতভাবে বিভিন্ন দেশে ‘দ্বন্দ্ব ও শান্তি’নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতায় জানি, এই ধরণের মব গ্রুপ হচ্ছে অনেকটা অ্যামিবা এর মত, অযৌন পদ্ধতিতে একটি শরীর ভেঙ্গে দুইটি শরীর জন্ম নেয়। উল্লেখ্য যে কনফ্লিক্ট জোনগুলোতে সশস্ত্র দল থেকে উপদল, উপদল থেকে আবার উপদল জন্মায়। যেমন, উত্তর পুর্ব ভারতে (সেভেন সিস্টারস) এক সময় ৩ টি গ্রুপ ছিল, এখন ৭০ টির অধিক গ্রুপ। বাংলাদেশেও ইসলামী জঙ্গি গ্রুপ ১৩৩ টির অধিক, যা প্রথমে ছিল মাত্র কয়েকটি।
পাঁচ.
বাঁচতে হলে প্রস্তূত হতে হবে। যা কিছু করার আপনাদের স্থানীয়ভাবেই করতে হবে।
এদের ‘মোড অফ অপারেশন’দেখেছেন:কিভাবে ‘মব’মোবিলাইজ করে, কিভাবে ভয় ও ত্রাসের সৃষ্টি করে, অগ্নিসংযোগ ও হত্যাকাণ্ড ঘটায়, আপনারা দেখেছেন। আপনাদের স্থানীয় প্রতিরোধ কৌশল প্রয়োজন। আপাতত লাঠি বাঁশি দিয়েই শুরু করেন। শ্রমজীবী জনগণকে সংগঠিত করেই এই নারী-কর্মীর জীবন বাঁচাতে পারবেন।
একই সাথে, স্থানীয়ভাবেই আপনাকেসমাজবিপ্লবের জন্য ব্যবস্থাবদলের রাজনীতিকে সংগঠিত করতে হবে। ঢাকার ‘বড়’নেতাদের দিকে না তাকিয়ে স্থানীয় শ্রমজীবী মানুষের জীবন-সংগ্রাম থেকে শিখুন। গণ-ক্ষমতার অবকাঠামো গড়ে তুলুন, যা গড়ে উঠলেই সাম্রাজ্যবাদ-নিয়ন্ত্রিত এই সহিংস ব্যবস্থা থেকে জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা অর্জন করা সম্ভব হবে।
কি করবেন আসুন সে বিষয়ে কিছু চিন্তা-ভাবনা করি ও পদক্ষেপ গ্রহণ করি:
যদি আপনার সন্দেহ হয় যে,আপনার সন্তান বা পরিবারের কেউ মবের টার্গেট হবেন,বা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে,তাহলে এটাও মনে রাখুন,ওরা শুধু আপনার সন্তানের বা প্রিয়জনের জীবন নেবেনা, আপনার সঞ্চয়, ব্যবসা ও জমি জমাও নিয়ে নেবে।
অন্তত: দুটি কাজ করুন:
(১) মানসিক ভাবে আত্মরক্ষার জন্য প্রস্ততি নিন। ‘যা কিছু করা দরকার সব কিছুই করবেন’, এই চিন্তা মাথায় নিন। আপনার এই সিদ্ধান্ত আপনার ভয় থেকে মুক্তির একমাত্র পথ। ওরা আপনার ভয়ের মনস্তত্ত্বের সুযোগ নেয়। যদি ধারণা দিতে পারেন, আপনিও ওদের জীবন নিতে প্রস্তুত, ওরা উল্টো ভয় পাবে।’মব’ঘাতকদের মুল সংগঠকদের চিহ্নিত করুন, প্রয়োজনে নাম প্রকাশ করুন। যারা এই ভয়ের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তাদের উন্মোচনে লিখতে হবে। স্পষ্ট করেই চলমান সংকটের কথা লিখতে হবে। ওদের ভয় দেখানো, ওদেরকে ফিরিয়ে দিতে হবে। পুলিশের এন্টি টেরর ইউনিটের কাছে ফেসবুক পোস্ট হুমকিদাতাকে অনুসন্ধান ও আইনের আওতায় আনার অনুরোধ করতে হবে। সেনাবাহিনীকে জানাতে হবে।
(২) ঢাকার ‘বড়’নেতা বা পুলিশের দিকে তাকিয়ে থেকে সময় নষ্ট করবেন না। স্থানীয় ‘গণউদ্যোগ’গড়ে তুলুন। সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ সবসময় শান্তির পক্ষে থাকে,সহিংসতার বিপক্ষে। এদের নিয়ে জরুরী ভিত্তিতে প্রতিরোধ পরিকল্পনা করুন। সিদ্ধান্ত নিন আপনার এলাকায় কোন ‘মব’সন্ত্রাস হতে দেবেন না। পুলিশকেও জানিয়ে রাখুন। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য বাজেট করুন। মব কে মুক্তিপণ দিয়ে পরিবারের কাউকে বাঁচাতে পারবেন না, বরঞ্চ সেই টাকা দিয়ে প্রতিরোধ-প্রস্তূতি সংগঠিত করুন।
এর বাইরে নিঃশব্দে যোগাযোগ করুন সমমনাদের ও বিশ্বস্তদের সাথে। আরো কি করা যায়, আলাপ করে ঠিক করুন। সবাই পরস্পরের নিরাপত্তা ঢাল হয়ে উঠুন।
