মতামত।। লীগ নিষিদ্ধের পাঁয়তারা, নির্বাচনকে অনিশ্চিত করাই কি মূল উদ্দেশ্য?

মতামত।। লীগ নিষিদ্ধের পাঁয়তারা, নির্বাচনকে অনিশ্চিত করাই কি মূল উদ্দেশ্য?
শেয়ার করুন

কবির য়াহমদ

আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করে দিতে সরকারে একটা প্রেস বিজ্ঞপ্তিই যথেষ্ট। তবু সরকার গত নয় মাসে সে পথে যায়নি। তবে এবার সে লক্ষ্যে তারা কাজ শুরু করে দিয়েছে।

আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করলে সরকারের লাভের জায়গা হচ্ছে তারা দলটির নেতাকর্মীদের বিনা কারণে গ্রেপ্তারের সুযোগ নেবে। গ্রেপ্তার এড়াতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এখনই প্রকাশ্যে সরকারবিরোধী কোন অবস্থান নিতে পারবে না।

এখন প্রতিদিন সারাদেশে যে ঝটিকা মিছিল করছে আওয়ামী লীগ, এটা এমনিতেই সরকারি বাধায় পড়ছে, গ্রেপ্তার হচ্ছেন প্রতিদিন দলটির নেতাকর্মী। এরপর এটা আরও জোরদার হবে। এতে গ্রেপ্তারবাণিজ্য যেমন বাড়বে, তেমনি বাড়বে সামাজিক বিশৃঙ্খলাও।

আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করেই কি শেষ হবে যাবে সরকারের কর্মসূচি?

না, শেষ হবে না।

এরপর তারা নামবে বিএনপির বিরুদ্ধে প্রকাশ্য কর্মসূচি নিয়ে। এতে নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। বিএনপি নির্বাচনের জোরাল দাবি করলেও এটা আদায় করে নেওয়ার মতো পরিস্থিতিতে যেতে পারেনি। আওয়ামী লীগের মতো দলকে নিষিদ্ধ করে দিলে বিএনপির প্রান্তিক পর্যায়েও এর প্রভাব পড়বে। সরকারের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে মাঠের কোন কর্মসূচি দিলে বিএনপির নেতাকর্মীরা মাঠে নামতে ভয় পাবে।

একটা বিষয় লক্ষণীয় যে, চার মাস পর দেশে ফিরেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। তিনি তাঁর দুই পুত্রবধূকে নিয়ে দেশে ফিরেছেন, কিন্তু বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে ফিরতে পারেননি।

আওয়ামী লীগের ক্ষমতাচ্যুতিতে বিএনপির জন্যে যে রাজনৈতিক পরিবেশ ধারণা করা হচ্ছিল, সেটা কি হয়েছে? আমার ধারণা, হয়নি। বিএনপি অনুকূল পরিবেশ পেলে এতদিনে তারেক রহমান দেশে ফিরে আসতেন।

কি, আসতেন না?

অর্থাৎ বাইরে যা দেখা যায়, ভেতরের অবস্থা ভিন্ন!

বেগম খালেদা জিয়া দেশে ফেরার পর তিনি কি রাজনীতি নিয়ে কোন কথা বলেছেন? বলেননি। এর অর্থ কী দাঁড়াচ্ছে?

দেশের দুইবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বিএনপির মতো একটা দলের চেয়ারপারসন রাজনীতি নিয়ে একটা শব্দও উচ্চারণ করছেন না; এটা কি সত্যি স্বাভাবিক কিছু? সত্যি স্বাভাবিক মনে হয়?

আওয়ামী লীগকে রেখে এনসিপিকে শক্তিশালী করার সরকারের যে পরিকল্পনা, সেটা ভেস্তে গেছে। নেতৃত্বের দুর্বলতা ও অযোগ্যতায় তারা ব্যর্থ হয়েছে। এবার শক্তিশালী করার দ্বিতীয় পথ বেছে নেওয়া হচ্ছে। এই পথ হচ্ছে–আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করে দিয়ে এরপর বিএনপিকে নিয়েও একই রাজনীতি।

এই পরিকল্পনায় ফের সামনে এসেছে সেই মব। মব দিয়ে কিছু লোক হাজির করে দিয়ে তাদেরকে সকল দলের, সকল মানুষের দাবি রূপে উপস্থাপনের চেষ্টা চলছে। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় যমুনার সামনে যেকোনো ধরনের সমাবেশ নিষিদ্ধের সরকারি ফরমান থাকলেও সেখানে কর্মসূচি পালিত হচ্ছে, সেখানে আসা লোকজনদের আরামে অবস্থানের জন্যে ঠান্ডা পানির স্প্রে করার ব্যবস্থা করেছে সরকারি প্রতিষ্ঠান সিটি করপোরেশন। এরপর প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধে ইঙ্গিতবহ একটা বার্তা দিয়েছে।

প্রতি পদক্ষেপ কি পরিকল্পনামাফিক মনে হচ্ছে না?

আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তারা যে আগামী কয়েক বছর ক্ষমতাকেন্দ্রের ধারেকাছেও যেতে পারবে না, গত নয় মাসে এটা দলটির নেতাকর্মীদের বিশ্বাসের অংশ হয়ে গেছে। তারা জানে নির্বাচন হলে সামনের নির্বাচন দিয়ে তাদের অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা কম, নির্বাচনে কোনোভাবে অংশ নিলেও তাদের জয়লাভের সম্ভাবনা নাই। এমন অবস্থায় তারা অপেক্ষার অবস্থানে চলেই গেছে।

আওয়ামী লীগ যখন অপেক্ষার অবস্থানে চলেই গেছে, সেখানে ক্ষমতার প্রধান দাবিদার মূলত বিএনপিই। কিন্তু ক্ষমতায় যেতে হলে যে নির্বাচনের দরকার, সে নির্বাচন নিয়েই আদতে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন এখন চলে গেছে আগামী জুনের মধ্যে নির্বাচনে। সে জুনেও নির্বাচন হবে কিনা, এটা নিয়েও খোদ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে প্রশ্নের দেখা দিয়েছে। ফলে বিএনপির ক্ষমতায় যাওয়ার কাল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘায়ত হতে চলেছে।

আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করে দিয়ে দেশে অস্থিরতা তৈরির একটা পরিকল্পনা চলছে। এই অস্থিরতা আওয়ামী লীগ নিজেরা করলে তো পোয়াবারো, আওয়ামী লীগ এতে অংশ না নিলেও বিভিন্ন এজেন্সিকে দিয়ে সেটা করার একটা পরিকল্পনা যে হচ্ছে না, সেটা কে বলবে? এমনটা হলেও দেশে নির্বাচনের কোন পরিবেশ থাকবে না। এরিমধ্যে কিন্তু ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলারকে দিয়ে কথিত সংস্কার নিয়ে একটা মন্তব্য আদায় করে নিতে পেরেছে সরকার। আগে যারা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের কথা জোর দিয়ে বলত, এখন তাদের মুখ দিয়ে নির্বাচনের চাইতে নির্বাচনবহির্ভূত কথা বলানো সম্ভব হয়েছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নয় মাস হয়ে গেছে। এই নয় মাসে তারা কেবল ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করেছে। শিগগির নিষিদ্ধ করবে বলে শোনা যাচ্ছে যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগকে। এ দুই সংগঠনকে নিষিদ্ধ করার পর আরও কিছুদিন সময় নেবে তারা। আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করতে অপেক্ষা করবে নির্বাচনের দাবি জোরাল হওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত। এরপর যদি দেশব্যাপী বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির তৈরি হয়, তবে নির্বাচনকে আরও দূরে ঠেলে দেওয়া যাবে।

নির্বাচন যত দূরে চলে যেতে থাকবে দল হিসেবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকবে বিএনপি। আওয়ামী লীগের লাভের কথা বলছি এই হিসেবে নির্বাচনের যত দেরি হবে, তত বেশি মানুষ বিশেষ করে বিএনপি নেতাকর্মীরা বিক্ষুব্ধ হবে সরকারের প্রতি। এখন সরকারের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ কিছু বললেও হতাশা-বঞ্চনার বিষয়কে পাশে রেখে বিএনপি নেতাকর্মীরা ইউনূস সরকারের পক্ষে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। বিএনপি যখন চূড়ান্ত রকমের হতাশাগ্রস্ত হওয়ার পথে পড়ে যাবে, তখন সরকারবিরোধিতার সকল কণ্ঠ এক হতে শুরু করবে। তখন আওয়ামী লীগের সরকারবিরোধিতাকে বিএনপি নেতাকর্মীরাও নিজেদের কণ্ঠ বলে ভাবতে শুরু করবে।

দ্বি-দলীয় ব্যবস্থা বাংলাদেশ থেকে কোনোদিনও বাতিল হয়ে যাবে না। এটা সরকার বুঝে গেছে। তারা বুঝতে পারছে এ-ব্যবস্থার অর্ধেকের নিশ্চিহ্নে কোন কাজ হবে না। আওয়ামী লীগ-বিএনপিকে একসঙ্গে মানুষ উচ্চারণ করে থাকে। একটা রেখে অন্যটা নিশ্চিহ্ন তাই অসম্ভব। তাই কঠিন কর্মযজ্ঞের অলআউট পরিকল্পনায় যেতে হচ্ছে তাদের।

আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করে দেওয়ার প্রাথমিক পদক্ষেপ এখন তাদের সামনে তাই! বাকিসব মূলত সময়ে আসতে যাওয়া ধারাবাহিকতা…!

Visited 147 times, 1 visit(s) today