খুলনা প্রতিনিধি
খুলনা, ৬ মে ২০২৫: খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুয়েট) ৭৪ দিনের বন্ধের পর ৪ মে থেকে একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হলেও শিক্ষকদের চলমান কর্মবিরতির কারণে শ্রেণিকক্ষ ফাঁকা পড়ে আছে। শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনায় অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত ক্লাস-পরীক্ষায় অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় শিক্ষক সমিতি। এতে ক্যাম্পাসে পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা কার্যক্রম কবে শুরু হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। ফলে, সাড়ে সাত হাজার শিক্ষার্থী সেশনজটের কারণে বিপাকে পড়েছেন, এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও উন্নয়ন কার্যক্রমও প্রায় স্থবির।
মঙ্গলবার (৬ মে) কুয়েট ক্যাম্পাসে গিয়ে দেখা যায়, শ্রেণিকক্ষ ও হলগুলোতে সুনসান নীরবতা। শিক্ষকরা ক্লাসে না আসায় বেশিরভাগ শিক্ষার্থী হলে অবস্থান করছেন বা ক্যাম্পাসের বাইরে রয়েছেন। কিছু শিক্ষার্থীকে হলের সামনে আড্ডা দিতে ও ক্যাম্পাসের সড়কে চলাচল করতে দেখা গেছে। প্রধান গেটে পুলিশ মোতায়েন থাকায় ক্যাম্পাসে প্রবেশ নিয়ন্ত্রিত।
অন্তর্বর্তীকালীন উপাচার্য অধ্যাপক মো. হযরত আলী শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করলেও এখনো কোনো ফলপ্রসূ সমাধান আসেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার প্রকৌশলী আনিসুর রহমান ভুঞা এবং ছাত্রকল্যাণ পরিচালক অধ্যাপক আব্দুল্লাহ ইলিয়াছ আক্তার জানান, “আমরা দ্রুত সংকট সমাধান করে ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছি।”
কুয়েট শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মো. ফারুক হোসেন বলেন, “গত ১৮ ফেব্রুয়ারি সংঘর্ষের সময় কিছু শিক্ষার্থী কয়েকজন শিক্ষককে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে। আমরা এর বিচার দাবি করেছি, কিন্তু প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। অভিযুক্তদের শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত আমরা ক্লাস-পরীক্ষায় অংশ নেব না।” তিনি আরও জানান, আগামী সাত দিনের মধ্যে শাস্তি কার্যকর না হলে শিক্ষকরা প্রশাসনিক কাজ থেকেও বিরত থাকবেন।
মঙ্গলবার শিক্ষক সমিতির এক সাধারণ সভায় এই সিদ্ধান্ত পুনর্ব্যক্ত করা হয়। শিক্ষকরা দাবি করছেন, লাঞ্ছনার ঘটনায় জড়িতদের শাস্তি দেওয়া না হলে ক্যাম্পাসে শৃঙ্খলা ও শিক্ষকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না।
অন্যদিকে, শিক্ষার্থীরা দুই দফায় শিক্ষকদের কাছে ক্ষমা চেয়েছে। শিক্ষার্থী রাহাতুল ইসলাম, মো. ওবায়দুল্লাহ, শেখ মুজাহিদ, গালিব রাহাত ও তৌফিক বলেন, “আমরা শিক্ষকদের সঙ্গে কোনো বিদ্বেষ চাই না। অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় ভুল হলে আমরা ক্ষমা চেয়েছি। আমরা চাই ক্লাস শুরু হোক, না হলে সেশনজট আরও বাড়বে।” কুয়েটে ইতিমধ্যে এক বছরেরও বেশি সেশনজট রয়েছে, এবং সাম্প্রতিক ৭৪ দিনের বন্ধ এটিকে আরও জটিল করেছে।
সংকটের সূত্রপাত গত ১৮ ফেব্রুয়ারি, যখন ছাত্ররাজনীতি বন্ধের দাবিতে ছাত্রদল ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন। পরদিন শিক্ষার্থীরা প্রশাসনিক ও একাডেমিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে দেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক কার্যক্রম বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়। প্রশাসন খানজাহান আলী থানায় অজ্ঞাত ৪০০-৫০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে।
২০ ফেব্রুয়ারি শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে রাজনৈতিক সংগঠনগুলোকে “লাল কার্ড” দেখিয়ে উপাচার্যের পদত্যাগ দাবি করেন। এরপর আবাসিক হল খোলার দাবিতে ১৩ এপ্রিল থেকে শিক্ষার্থীরা প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান নেন এবং ২১ এপ্রিল থেকে আমরণ অনশনে বসেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সি আর আবরার ১৮ এপ্রিল ক্যাম্পাসে এলেও অনশন ভাঙাতে ব্যর্থ হন।
পরে সিন্ডিকেট সভায় ৩৭ শিক্ষার্থীর বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার ও হল খোলার সিদ্ধান্ত হয়। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তদন্ত কমিটির হস্তক্ষেপে উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যের অপসারণের আশ্বাসে শিক্ষার্থীরা অনশন ভাঙেন। তবে, শিক্ষকদের দাবি পূরণ না হওয়ায় ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম এখনো স্বাভাবিক হয়নি।
সমর্থনকারী তথ্য
কুয়েট বাংলাদেশের শীর্ষ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি, যেখানে প্রায় ৭,৫০০ শিক্ষার্থী এবং ৩০০ শিক্ষক রয়েছেন। সাম্প্রতিক সংঘর্ষ ও শিক্ষক-শিক্ষার্থী দ্বন্দ্ব ক্যাম্পাসের একাডেমিক পরিবেশকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি সংকট সমাধানে হস্তক্ষেপ করলেও, শিক্ষকদের শাস্তির দাবি এবং শিক্ষার্থীদের ক্ষমা প্রার্থনার মধ্যে সমঝোতা এখনো অধরা। বিশ্লেষকরা মনে করেন, ছাত্ররাজনীতির প্রভাব এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের অভাব এই সংকটকে আরও জটিল করেছে।
সংকট নিরসনে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। অন্যথায়, কুয়েটের একাডেমিক খ্যাতি ও শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
