অর্থনীতিতে ভয়াবহ স্থবিরতা : ঋণপ্রবাহে ধ্বস, রপ্তানি’তে ধাক্কা

অর্থনীতিতে ভয়াবহ স্থবিরতা : ঋণপ্রবাহে ধ্বস, রপ্তানি’তে ধাক্কা
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক::

২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণপ্রবাহে ভয়াবহ স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এই সময় ঋণপ্রবাহ বেড়েছে মাত্র ২.৬৩ শতাংশ—যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় অর্ধেক এবং দুই দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। এটা অর্থনীতির জন্য অশুভ সঙ্কেত বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। এ থেকে উত্তরণে সঠিক পরিকল্পনাও নিচ্ছেনা ইউনূস সরকার। উল্টো ব্যবসায়ীদের নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে এমন অভিযোগ উঠেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, ব্যবসায়ীদের দমনপীড়ন, বিনিয়োগ পরিবেশের দুর্বলতা এবং উচ্চ সুদের হার নতুন উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করছে। ফলে প্রকৃত বিনিয়োগ না বাড়লেও সুদের হিসাবের কারণে কাগজে ঋণ অঙ্ক কিছুটা বেড়েছে। এই চাপে সবচেয়ে বেশি ভুগছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা।
অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম রায়হান মনে করেন, কঠোর মুদ্রানীতি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলেও বেসরকারি খাতের সংকট আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

উচ্চ সুদের কারণে ব্যাংকগুলো এখন ঝুঁকছে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে, যেখানে ১১.১৩ শতাংশ সুদে নিরাপদ আয় পাওয়া যাচ্ছে। এর ফলে বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণে আগ্রহ কমছে। আমদানি কমে উৎপাদনেও প্রভাব পড়েছে। মূলধনি যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। মার্চ পর্যন্ত এলসি খোলার তথ্য অনুযায়ী, যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে ২৬ শতাংশ, যা শিল্প উৎপাদনের জন্য বড় হুমকি। অনেক কারখানা এখন সক্ষমতার নিচে চলছে, কিছু বন্ধও হয়ে গেছে।
ঋণপ্রবাহে ধস, শিল্পে বিনিয়োগ স্থবির

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ব্যাংকিং খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬.৮২ শতাংশ—২০০৪ সালের পর সর্বনিম্ন। ৯ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত ঋণের সুদহার এবং বাজারের অনিশ্চয়তা নতুন বিনিয়োগের প্রধান বাধা হয়ে উঠেছে।

এছাড়া রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও বিদেশি বিনিয়োগে আস্থার ঘাটতি প্রবলতর হচ্ছে। ৫ আগস্ট আন্দোলনের পর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি। এই অনিশ্চয়তায় দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা অপেক্ষাকৃত নিষ্ক্রিয় অবস্থানে রয়েছেন। কর ব্যবস্থার জটিলতা ও ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ উন্নয়নে ধীরগতিও একটি বড় বাধা।

এদিকে কর্মসংস্থান ও জিডিপিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ২০২৪ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে দেশে বেকারের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬ লাখ ৬০ হাজারে। এক বছরে শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণকারী মানুষের সংখ্যা কমেছে প্রায় ২০ লাখ। প্রবৃদ্ধিও কমে দাঁড়িয়েছে ৪.২২ শতাংশে, যা সরকারের পূর্বাভাসের চেয়েও নিচে।

অন্যদিকে রপ্তানিতে ধাক্কা, তৈরি পোশাকেও অশনি সংকেত দেখা দিয়েছে। এপ্রিল মাসে রপ্তানি আয় কমে দাঁড়িয়েছে ৩.০১ বিলিয়ন ডলারে, যা চলতি অর্থবছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। তৈরি পোশাক খাতে ওভেন পণ্যের রপ্তানি কমেছে ৪.৬৫ শতাংশ, যদিও নিট পণ্যে কিছুটা প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থনীতিকে সচল রাখতে দ্রুত কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা, ব্যাংক খাত সংস্কার ও সুদের হার যৌক্তিক পর্যায়ে আনা, কর ও কাস্টমস ব্যবস্থার ডিজিটাল সংস্কার, জ্বালানি নিরাপত্তা ও সহজ ঋণ সুবিধা প্রদান, উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধিতে নীতিগত সহায়তা, এসব পদক্ষেপ দ্রুত বাস্তবায়ন না হলে শিল্পায়ন বাধাগ্রস্ত হবে এবং অর্থনীতির সামগ্রিক গতি আরও শ্লথ হয়ে পড়বে।

Visited 58 times, 1 visit(s) today