মতামত।। রাখাইন করিডোর: বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার জন্য এক অনিশ্চিত জুয়া

মতামত।। রাখাইন করিডোর: বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার জন্য এক অনিশ্চিত জুয়া
শেয়ার করুন
বাংলাদেশ সরকারের সাম্প্রতিক সম্মতি দেয়া ‘রাখাইন করিডোর’—যা মিয়ানমারের সংঘাতপূর্ণ রাখাইন রাজ্যে মানবিক সহায়তা পাঠানোর উদ্দেশ্যে তৈরি করা হচ্ছে বলে বলা হচ্ছে—মানবিক বিবেচনায় একটি সহানুভূতিশীল উদ্যোগ বলে মনে হলেও, এর অন্তর্নিহিত রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত জটিলতা বাংলাদেশের জন্য এক গভীর সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বাস্তবে এই করিডোরের ভবিষ্যৎ যেমন অনিশ্চিত, তেমনি এর সম্ভাব্য পরিণতি দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক।
১. রাখাইন: একটি সক্রিয় যুদ্ধক্ষেত্র
রাখাইন রাজ্য বর্তমানে আরাকান আর্মি (AA) এবং মিয়ানমার সেনাবাহিনীর মধ্যে তীব্র সংঘর্ষে জর্জরিত। AA বর্তমানে রাখাইনের একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে, এবং তারা একটি কার্যত নিজস্ব প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলেছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে রাখাইন অঞ্চলে মানবিক করিডোর চালু করা মানে—সরাসরি একটি অনিরাপদ যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করা, যা স্বাভাবিক কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা চর্চার বাইরে।
এই করিডোরকে কেন্দ্র করে ভবিষ্যতে সীমান্ত দিয়ে মাদক, অস্ত্র, এবং সন্ত্রাসী অনুপ্রবেশ বাড়ার শঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্ত আগে থেকেই নিরাপত্তা-ঝুঁকিপূর্ণ; করিডোর চালু হলে তা আরও অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়তে পারে।
২. আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে ফাঁসার আশঙ্কা
রাখাইন করিডোর যে ভূখণ্ডে গঠিত হওয়ার কথা, তা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বড় শক্তিগুলোর কৌশলগত আগ্রহের কেন্দ্রে পড়ে। চীন ইতিমধ্যেই রাখাইনে কিয়াকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর ও তেল-গ্যাস পাইপলাইন স্থাপন করেছে, যা তাদের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর অংশ। অন্যদিকে, ভারত সেখানে কালাদান মাল্টিমোডাল প্রকল্পের মাধ্যমে মিজোরামের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করছে।
বাংলাদেশ যদি করিডোর স্থাপন করে, তবে এটি কার্যত একটি তৃতীয় পক্ষ হিসেবে চীন-ভারতের ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মাঝখানে পড়ে যাবে। বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতা এই দুই বৃহৎ শক্তির চাপ মোকাবেলায় কতটা প্রস্তুত, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
৩. রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনায় বাধা
মানবিক করিডোরের মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে সাহায্য হবে—এমন ধারণা আদৌ বাস্তবসম্মত নয়। বরং, এই উদ্যোগের ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমার সরকারের সম্পর্ক আরও অবনতি ঘটতে পারে। মিয়ানমার যদি এই উদ্যোগকে আরাকান আর্মির প্রতি বাংলাদেশের “আংশিক সহানুভূতি” হিসেবে ব্যাখ্যা করে, তবে ভবিষ্যতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়া আরও পিছিয়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে চীন, যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসছে, তারাও এই করিডোরকে মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান হিসেবে দেখতে পারে, যার ফলে বাংলাদেশের ওপর কূটনৈতিক চাপও বাড়তে পারে। সম্পর্কের অবনতি হবে চীনের সাথে।
৪. বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য একটি বড় হুমকি
এই করিডোরের সবচেয়ে গুরুতর ও দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি হলো সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। একবার যদি করিডোর চালু হয়, তবে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিদেশি শক্তিগুলোর নিয়মিত প্রবেশাধিকার প্রতিষ্ঠা পাবে বাংলাদেশের ভেতরে। এতে দেশের নিরাপত্তা বাহিনী ও প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়বে।
এছাড়া, যদি করিডোরটি আন্তর্জাতিকভাবে একটি ‘নিরপেক্ষ মানবিক অঞ্চল’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়, তবে সেটি বাংলাদেশের নীতিগত অবস্থান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষমতার ওপর সরাসরি আঘাত হানবে। বিদেশি মিডিয়া বা প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যদি দাবি তোলা হয়—“বাংলাদেশ বিদ্রোহীদের সহায়তা করছে”, তবে সেটি আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশকে এক জটিল ও অপ্রীতিকর অবস্থানে ঠেলে দিতে পারে।
৫. গৃহযুদ্ধের মতো অভ্যন্তরীণ সহিংসতার ঝুঁকি
রাখাইন করিডোরের মাধ্যমে যদি দেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে একটি আধা-নির্ভরশীল অঞ্চল তৈরি হয়, যেখানে বিদেশি সংস্থা, স্থানীয় বা আন্তর্জাতিক বিদ্রোহী গোষ্ঠী, এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনী ভিন্ন উদ্দেশ্যে সক্রিয় থাকে—তবে সেটি বাংলাদেশের জন্য এক ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে।
বাংলাদেশে আগে থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও সশস্ত্র উপাদানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি উত্তেজনার ইতিহাস আছে। রাখাইন করিডোর কার্যকর হলে সেখানে নতুন করে শক্তির ভারসাম্য বিনষ্ট হবে। এতে স্থানীয় ক্ষোভ, জাতিগত বৈষম্য, ভূমি দখল, এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের সম্ভাবনা বাড়বে।
এই পরিস্থিতিতে অস্ত্রের চোরাচালান এবং চরমপন্থী গোষ্ঠীর উত্থানও অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে, যদি কোন পক্ষ করিডোরকে সামরিক বা রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করে, তবে তা এক সময় দেশের ভেতরেই সশস্ত্র সংঘর্ষ বা গৃহযুদ্ধের রূপ নিতে পারে।
আর একবার যদি দেশের ভেতরে গৃহযুদ্ধের মতো সংঘাত শুরু হয়, তবে তা শুধুমাত্র সীমান্ত এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকবে না—বরং দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনীতি, এবং আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিও ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।
করিডোর নয়, কূটনৈতিক সমঝোতা চাই
রাখাইন করিডোর আপাতদৃষ্টিতে মানবিক উদ্দেশ্যে প্রণীত হলেও বাস্তবে এটি একটি বহুমাত্রিক রাজনৈতিক ও কৌশলগত ঝুঁকি বহন করছে। এটি যেমন রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে কোনো টেকসই সমাধান দেবে না, তেমনি সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক ভারসাম্যকেও বিঘ্নিত করবে।
বাংলাদেশের উচিত হবে এই ঝুঁকিপূর্ণ করিডোর পরিকল্পনা থেকে সরে এসে, বিকল্প কূটনৈতিক কৌশলের মাধ্যমে মিয়ানমারের সঙ্গে সমঝোতা তৈরি করা। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও রাখাইন সংকট সমাধানে একমাত্র কার্যকর পথ হচ্ছে আন্তর্জাতিক সংলাপ, আঞ্চলিক সহযোগিতা, এবং বহুপাক্ষিক কূটনীতি।
মার্কিনীদের খুশি করে দেশ বিক্রি করার অধিকার কাউকে দেয়া হয়নি। আমার দেশের একটি কণার ক্ষেত্রেও কোন বিদেশিদের সাথে আপস করা চলবে না।
সাইফুর রহমান
ব্লগার ও অনলাইন এক্টিভিস্ট
Visited 97 times, 1 visit(s) today