সীমান্তে বাড়তে থাকা আরকান আর্মির আধিপত্যের মাঝে ‘মানবিক করিডর’ এর আড়ালে কি “প্রাণঘাতী মরণাস্ত্র” সরবরাহ হবে?

সীমান্তে বাড়তে থাকা আরকান আর্মির আধিপত্যের মাঝে ‘মানবিক করিডর’ এর আড়ালে কি “প্রাণঘাতী মরণাস্ত্র” সরবরাহ হবে?
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকা, ৩ মে ২০২৫: বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে আরাকান আর্মির ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং তাদের জন্য প্রস্তাবিত ‘মানবিক করিডর’ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। এই করিডরের আড়ালে কি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের নামে প্রাণঘাতী মরণাস্ত্র সরবরাহের পরিকল্পনা চলছে? রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে এই আশঙ্কা তীব্র হয়ে উঠেছে।

কয়েক বছর আগেও বান্দরবানের থানচি উপজেলার বোলিবাজার ছিল আরাকান আর্মির সৈন্যদের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার একটি কেন্দ্র। সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি) তখন তাদের চলাচলে কোনো বাধা দিত না। কিন্তু ২০২৩ সালের ২২ মার্চ বোলিবাজারে একটি বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ডে ৫২টি দোকান পুড়ে যায়, যার ক্ষতি প্রায় ৬০ কোটি টাকা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই আগুন ছিল দোকানদার ও আরাকান আর্মির মধ্যে স্বার্থের দ্বন্দ্বের ফলাফল। এরপর থেকে আরাকান আর্মি নাফ নদীর বাম তীরে বাংলাদেশের গ্রাম ও বাজারে অবাধে প্রবেশ শুরু করে।

বর্তমানে আরাকান আর্মি বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে সম্পূর্ণ আধিপত্য বিস্তার করেছে। তারা স্পিডবোটে নদী পেরিয়ে অবাধে চলাচল করে এবং মোহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ সমর্থনে বেশিরভাগ বাজার শহরে প্রবেশাধিকার পেয়েছে। সীমান্তে নতুন বিজিবি ব্যাটালিয়ন মোতায়েন সত্ত্বেও এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে থামানো যায়নি।

সম্প্রতি জোরপূর্বক নিয়োগের মাধ্যমে আরাকান আর্মির সৈন্যসংখ্যা ৪০,০০০ ছাড়িয়েছে। তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গোপন পরিকল্পনায় চিন ন্যাশনাল আর্মির সাথে জোট গঠন করে রাখাইনের সিটওয়ে, কিয়াউকফিউ এবং মানাউং শহর থেকে মিয়ানমারের জান্তা বাহিনীকে উৎখাত করতে চায়।

বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের নেতৃত্বে ইউনূস সরকার এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আগ্রাসীভাবে এগোচ্ছে। ১৩ এপ্রিল শীর্ষ কর্মকর্তাদের বৈঠকে নরওয়েজিয়ান কর্তৃপক্ষের সহযোগিতার প্রস্তাব সত্ত্বেও কোনো ঐকমত্য হয়নি। খলিলুর রহমান মার্কিন চার্জ ডি’অ্যাফেয়ার্স সুসান স্টিভেনসনের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন, তবে ‘মানবিক করিডর’ পরিকল্পনা ক্রমশ চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠছে।

রামু-ভিত্তিক বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১০ম পদাতিক ডিভিশন শীলখালি থেকে আরাকান আর্মির জন্য লজিস্টিক ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহের দায়িত্বে রয়েছে।

অনিশ্চিত রিপোর্টে দাবি করা হচ্ছে, গোপনে রাখাইনে সরবরাহ পৌঁছতে শুরু করেছে। তবে কুতুপালং ও নয়াপাড়ার মানবিক ক্যাম্পে বসবাসকারী লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর প্রত্যাবাসনের জন্য ‘মানবিক করিডর’ তৈরির পরিকল্পনা বাংলাদেশে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২রা মে একটি পাবলিক ফোরামে বলেন,

“ইউনূস সরকার বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব শেষ করে দিচ্ছে। করিডোরের নামে যা করছে, তা অমানবিক। এই করিডোর দিয়ে মরণাস্ত্র মিয়ানমারে যাবে, যা লাখো মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে পারে।” তিনি সতর্ক করে বলেন, “শহিদের রক্তে কেনা বাংলাদেশকে অন্য দেশের মানুষ হত্যায় ব্যবহার করা যায় না।”

বাহাউদ্দিন নাছিমের স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিবৃতিতে মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী এলাকায় করিডোর দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।  বিবৃতিতে বলা হয়ঃ

এ রকম জায়গায় করিডোর দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলে দিতে পারে এবং ঐ এলাকায় যেহেতু বিভিন্ন শক্তিশালী রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্বার্থ রয়েছে সেহেতু সে সকল রাষ্ট্রের মধ্যে স্বার্থগত দ্বন্দ্বও রয়েছে। সেই দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসলে বাংলাদেশ প্রক্সি যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একটি শান্তিকামী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এই সংঘাতময় পরিস্থিতিতে অংশ নিতে পারে না।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এই পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বিগ্ন, আদের ধারনা এই করিডোর আগামী মাসগুলোতে প্রাণঘাতী অস্ত্র সরবরাহের ‘আড়াল’ হতে পারে। বর্তমানে দেশে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল হিসাবেও, বিএনপির সাথে জাতীয় নিরাপত্তার এতো বড় সিন্ধান্ত নিয়ে সরকারের কেউ আলোচনা করে নাই। বিএনপির প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন

“দেশের করিডোর কেউ ব্যবহার করবে, জনগন জানবে না সেটা হতে পারে না। দেশ সবার, দেশের স্ব্বার্থ আমরা সবিয়া মিলে রক্ষা করবো”

একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন,

“বাংলাদেশ সেনাবাহিনী খলিলুর রহমানের কৌশলের অনিচ্ছুক অংশীদার হয়ে উঠেছে। রামু ক্যান্টনমেন্টের কর্মকর্তারা ক্ষুব্ধ।”

ঢাকার এক বিশ্লেষক সতর্ক করে বলেন,

“রোহিঙ্গারা আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মির নেতৃত্বে তারা এই পরিকল্পনা মেনে নেবে না।” গত কয়েক মাসে প্রায় ১,৩০,০০০ নতুন রোহিঙ্গা শরণার্থীর আগমন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

দিল্লির রোহিঙ্গা হিউম্যান রাইটস ইনিশিয়েটিভের একজন কর্মী বলেন,

“বুথিডাং ও মংডুতে রোহিঙ্গারা এখনও নিরাপদ নয়। ইউনূস সরকার কীভাবে প্রত্যাবাসিতদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে?”

বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে এই পরিকল্পনা কীভাবে এগোবে, তা নিয়ে সবার দৃষ্টি এখন সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।

Visited 118 times, 1 visit(s) today