সমন্বয়কদের সুপারিশে নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ছাড়াই মাঠে পুলিশের ‘অক্সিলারি ফোর্স’ ঘিরে জনমনে শঙ্কা

সমন্বয়কদের সুপারিশে নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ছাড়াই মাঠে পুলিশের ‘অক্সিলারি ফোর্স’ ঘিরে জনমনে শঙ্কা
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকা মহানগর পুলিশের অধীনে সম্প্রতি নিয়োগ পাওয়া ৪২৬ জন ‘সহায়ক পুলিশ কর্মকর্তা’কে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নিয়মিত নিয়োগবিজ্ঞপ্তি ছাড়াই অস্থায়ীভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত এ বাহিনীর সদস্যরা প্রশিক্ষণ ছাড়াই আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় মাঠে কাজ শুরু করেছেন। তাদের পুলিশের মতো একই রকম ক্ষমতা ও দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে উদ্বেগ যেমন বাড়ছে, তেমনি বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি আইনবহির্ভূত ও বিপজ্জনক এক নজির তৈরি করছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) বলছে, ঈদুল ফিতরের আগে শপিংমল ও জনসমাগমস্থলে অতিরিক্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘অক্সিলিয়ারি ফোর্স’ হিসেবে এ বাহিনী নিয়োগ দেওয়া হয়। তাদের দেওয়া হয়েছে আর্মব্যান্ড, নিয়োগপত্র এবং পুলিশের মতো ক্ষমতা প্রয়োগের অনুমতি। অথচ অধিকাংশ সদস্য জানেন না, তাদের দায়িত্ব কী, কর্তব্য কী, বা তারা কত দিনের জন্য নিয়োগ পেয়েছেন। কেউ কেউ বলেছেন, তাদের শুধু বলা হয়েছে, “বেশি কিছু না করতে, কিছু হলে থানায় জানাতে।”

এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার ঝড় উঠেছে। লেখক ও বিশ্লেষক সিরাজুল হোসেন ফেসবুকে একটি ভিডিও পোস্টে এ বাহিনীর কার্যক্রমকে সিআইএ’র কৌশলের সঙ্গে তুলনা করেন।

তিনি লিখেছেন, “সিআইএ কখনও সরাসরি অস্ত্র দেয় না। তারা আগে কিছু কিশোরকে মাথা ধোলাই করে, তারপর বিপ্লবের নামে মাঠে নামায়। বাংলাদেশে এই সহায়ক পুলিশ বাহিনীর মাধ্যমে সেই মডেল চালু করা হচ্ছে।”

তিনি সতর্ক করেন, এমনভাবে প্রশিক্ষণহীনভাবে মানুষকে অস্ত্র বা কর্তৃত্ব দিয়ে মাঠে নামানো হলে তা গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সিরাজুল হোসেনের মন্তব্যের সঙ্গে মিল খুঁজলে দেখা যায়, অতীতেও দমনমূলক উদ্দেশ্যে বেসরকারি বা আধা-সরকারি বাহিনী তৈরি করা হয়েছে। পাকিস্তানে বিখ্যাত ছিল আল-শামস-আল-বদর বাহিনী। আফগানিস্তানে মুজাহেদদের অস্ত্রধারী করে ব্যবহার করেছে আমেরিকা। অনেকে আশঙ্কা করছেন, বাংলাদেশেও এমন ‘সহায়ক বাহিনী’ ভবিষ্যতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হতে পারে।

এখন প্রশ্ন উঠেছে—এ বাহিনী কতদিন থাকবে? তারা কি শুধু ঈদ উপলক্ষে দায়িত্ব পালন করছে, না কি দীর্ঘমেয়াদে অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হবে?

নাগরিক সমাজ ও বিশ্লেষকদের মতে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় নাগরিকদের আস্থার সবচেয়ে বড় জায়গা হলো পুলিশ বাহিনী। সেখানে বাহিরের লোকজন এনে অস্থায়ী বাহিনী গঠন শুধু যে পেশাদারিত্বের অভাব, তা নয়—এটি আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপরও হুমকি তৈরি করছে।

এ সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলে নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা আমিনুল হক বলেন, অক্সিলিয়ারি ফোর্স নামের এই বাহিনী কারা তদারকি করছে? তাদের জবাবদিহিতার আওতায় কে রেখেছে? গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, অনেক ক্ষেত্রেই থানা পর্যায়ে মৌখিক নির্দেশ ছাড়া কোনো স্পষ্ট নীতিমালা নেই। নিয়োগপ্রাপ্ত অনেকে পূর্বে বিভিন্ন প্রাইভেট সিকিউরিটি কোম্পানিতে কাজ করতেন, কিন্তু পুলিশের কাজ সম্পর্কে তাদের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা বা প্রশিক্ষণ নেই।

এ সম্পর্কে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস. এন. মো. নজরুল ইসলাম বলেন, এ বাহিনী পুলিশের সহযোগী হিসেবে কাজ করবে এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতির সময় সহায়তা করবে। তিনি জানান, ঢাকা মহানগর পুলিশ অধ্যাদেশ, ১৯৭৬-এর ১০ ধারা অনুযায়ী এ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

Visited 335 times, 1 visit(s) today