নিজস্ব প্রতিবেদক ::
হাওরে পাকা বোরো ধান দখিনা হাওয়ায় দোলছে। ম ম গন্ধে মাতোয়ারা চারপাশ। ক্ষেতের আইল ধরে হাটছেন কৃষক। ধান কাটা ও মাড়াইও চলছে সামান্য। ন’মৌজার সারিসারি কড়চগাছ গুলোও গ্রীষ্মের ভ্যপসা গরে শীতল বায়ু দিয়ে যাচ্ছিল। হাজার হাজার নারী পুরুষ গোল হয়ে চড়ক উৎসবকে ঘিরে জড়ো হয়েছিলেন। সনাতন ধর্মীরা শীব দেবতা ও পাবর্তীর নামে মন্ত্র জপছিলেন। পাগনার হাওরের চারপাশে যখন এই আবহ লক্ষ্যণীয় তখন বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন শেষ বিকেলে কৃষি ও ফসলকে ঘিরে বাঙালির আদি লোকাচার চৈত্র সংক্রান্তি উপলক্ষে ঐতিহ্যবাহী চড়ক উৎসব উদযাপিত হয়েছে হলো জামালগঞ্জের পাগনার হাওরের দুটি গ্রামে। ছয়হারা ও কুজারগাও গ্রামে গতকালের সনাতন ধর্মাবলম্বিদের উৎসবে অন্যান্য ধর্মাবলম্বিরাও যুক্ত হয়ে আনন্দ উদযাপন করেছেন। উৎসবকে কেন্দ্র করে সন্যাসব্রত গ্রহণকারী প্রায় তিন শতাধিক সন্যাসী ১৫ এপ্রিল ক্ষৌরকার দিয়ে পরিচ্ছন্ন হয়ে মাছ মাংস ভোজন করে গৃহে ফিরেছেন।
জামালগঞ্জ উপজেলার হাওর ঘেরা গ্রাম ছয়হারা। দোলতা ও কানাইখালী ঘেরা এই গ্রামটির চারদিকেই হাওর। গ্রামের কান্দায় প্রয় ৫শ বছর ধরে সনাতন ধর্মাবলম্বিরা চৈত্রসংক্রান্তির দিনে এই উৎসব পালন করেন। বাঙালির কৃষিভিত্তিক এই লোকাচারটি এখনো উৎসবের রূপে দেখা গেছে। এ উপলক্ষে গ্রামে হাওরের কান্দায় বসেছিল মেলাও। যেখানে খেলনা, প্রসাধনীসহ গৃহস্থালিজ পণ্যের পসরাও দেখা গেছে। একই চিত্র দেখা গেছে কুজারগাও গ্রামেও। এছাড়াও জেলার বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার বিশ্বম্ভরপুরেও চড়ক উৎসব পালিত হয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, চৈত্রসংক্রান্তির এই দিনে শত শত বছর ধরে গ্রামে এই চড়ক পূজার আয়োজন করা হয়। দিনে দিনে এটি উৎসবে রূপ নেয়। সাধারণ সনাতন ধর্মাবলম্বিদের পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মের মানুষজনও এতে অংশ নেন। ছয়হারা গ্রামবাসীর উদ্যোগে সন্যাসীরা পুজায় নানা আচারাদি পালন করেছেন। সনাতন ধর্মাবলম্বি নারী পুরুষ সন্যাসীদের ঘিরে আচারাদি পালনের পাশাপাশি স্বামী সন্তনের মঙ্গল কামনায় মানসিকও (দেবতার উদ্দেশ মানিত বস্তু বা উপকরণ) দেন। তারা ভোগ ও লুট বিতরণ করেন। সন্যাসীরা পুরো চৈত্রমাস গ্রাম থেকে বেড়িয়ে এলাকার প্রতিটি গ্রামে উৎসব উপলক্ষে মাধুকরি করে চৈত্রসংক্রান্তির আগের দিন ফিরে এসে পরের দিন চৈত্রসংক্রান্তি পুজার আয়োজন করেন। শিবের পাট বা আসন নিয়ে গ্রামগুলোতে গিয়ে, কালি নৃত্য, কৌতুক, গান ও ধর্মীয় সঙ্গীত পরিবেশন করেন তারা। ওই সময় প্রতিটি গ্রামের লোকজন ভিক্ষা হিসেবে সন্যাসীদের হাতে চাল, ডাল, নগদ টাকা, সোনাদানাও তুলে দেন। এগুলো সংগ্রহ করে চৈত্রসংক্রান্তির আগের দিন গ্রামে ফিরেন সন্যাসীর দল। পুরো মাধুকরিকালে সন্যাসীদের দলনেতা ও সহ দলনেতা অন্যান্য সন্যাসীদের পরিচালনা করেন।
এবার ছয়হারা, কুজারগাও ও বিশ্বম্ভরপুরে চড়কপুজায় প্রায় তিন শতাধিক সন্যাসী সন্যাসব্রত নিয়েছিলেন। চৈত্রসংক্রান্তিতে চড়ক পুজার দিনে পিটে বড়শি গেথে দুই সন্যাসীকে শিবদ-ীতে ঘুরোনা হয় বিকেলে। এর পাশাপাশি ভূমি শয্যা (ভূমিতে গর্ত করে মাটি চাপা), জ্বলন্ত আগুনের উপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া, দোরলপুজা ও জিহ্বায় ধারালো লোহার শলাকা গেথে হেটে যাওয়াসহ নানা লোকাচার পাণ করেছেন। এগুলো তান্ত্রিক পদ্দতি প্রয়োগ করে পালন করা হয় বলে জানান সন্যানীরা। কৃষি ও ফসলের মঙ্গলের জন্য বাঙালি সংস্কৃতির এই পুরনো লোকাচার পালিত হয় বলে জানান স্থানীয়রাও। এবারের তিনটি উৎসবে অন্তত ৩০ হাজার মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। সনাতন ধর্মী নারীরা মাঠে শিবদ-ীর নিচে শিবপাট নিয়ে বসে থাকা সন্যাসীদের ভক্তির মাধ্যমে মনোবাসনা পূরণের জন্য টাকা পয়সাসহ নানা উপকরণ দান করেন।
এদিকে সন্যাসীদের বিদায়ের মাধ্যমে মঙ্গলবার এই উৎসবটি শেষ হয়। এই দিন সন্যাসীরা মাধুকরির মাধ্যমে যে ভিক্ষা পেয়েছিলেন তা দিয়ে গ্রামবাসীকে ভোজন করিয়ে নিজেরাও মাছ মাংস খেয়ে সন্যাসব্রত ত্যাগ করে আবার নিজেদের গৃহে প্রবেশ করেন। স্থানীয় ক্ষৌরকাররা তাদের দাড়িমুছ ছেটে পরিচ্ছন্ন করেন।
কুজারগাও গ্রামের বাসিন্দা সুব্রত পুরকায়স্থ বলেন, আমাদের গ্রামে এবারও চড়ক পুজায় ভূমিশয্যা ও দোরলপুজাও হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ অংশ নিয়েছিলেন।
ছয়হারা চড়কপুজার প্রধান সন্যাসী বিভাষ তালুকদার বলেন, আমাদের গ্রামে শত শত বছর ধরে চড়কপুজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গৌরী ও শিব দেবতাকে আমরা সাধন ভজন করে কৃষি ও ফসলের জন্য এই লোকাচার পালন করি। আমরা ১৮ চৈত্র সন্যাসে বের হয়ে চৈত্রসংক্রান্তির আগের দিন গ্রামে ফিরেছি। চড়ক পুজা শেষে মঙ্গলবার ক্ষৌরকার দিয়ে পরিচ্ছন্ন হয়ে মাছ মাংসে ভোজন করে গৃহে প্রবেশ করেছি। আমরাসহ এবার জেলার বিভিন্ন স্থানে হওয়া চড়কপুজায় তিন শতাধিক সন্যাসী লোকাচার শেষে ঘরে ফিরেছেন। ছয়হারা গ্রামের বাসিন্দা লেখক ও আইনজীবী এডভোকেট কল্লোল তালুকদার চপল বলেন, চড়ক উৎসব একটি আদিম লোকাচার। কৃষিভিত্তিক সমাজে এখনো এই লোকাচারটি কিছু কিছু গ্রামে টিকে আছে। ফসলের মঙ্গল কামনায় বংশ পরম্পরায় এই লোকাচারটি আদি সংস্কৃতিরও জানান দেয়।

