এএসএম শরিফুল হাসান
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা পণ্যের উপর প্রায় দ্বিগুণ শুল্ক (ট্যারিফ) আরোপ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা বিশেষ করে চীন, বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম এবং ভারতের মতো দেশগুলোর উপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে, যারা আমেরিকার বাজারে পোশাক ও অন্যান্য পণ্য রপ্তানি করে।
এই শুল্ক আরোপের ফলে রপ্তানিকারক দেশগুলোর অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তবে বিশ্লেষণ দেখায় যে এটি আমেরিকার নিজের অর্থনীতি ও পোশাক বাজারে আরও বেশি প্রভাব ফেলতে পারে। নীচে কিছু কাওরন উল্লেখ করা হলোঃ
প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র তার পোশাক বাজারের বৃহৎ অংশ আউটসোর্সিংয়ের উপর নির্ভরশীল, বিশেষ করে চীন, বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম এবং ভারত থেকে। এই দেশগুলো সস্তা শ্রমবল এবং উৎপাদন খরচের কারণে আমেরিকার জন্য পোশাক রপ্তানি করার বড় সূত্র। তবে, নতুন শুল্কের ফলে এই দেশগুলোর রপ্তানি খরচ বৃদ্ধি পাবে, যা সরাসরি আমেরিকার পোশাক আমদানিকারকদের উপর বোঝা বাড়াবে। ফলে, পোশাক আমদানিকারকদেরকে আরও বেশি মূল্যে পণ্য কিনতে হবে, যা সর্বশেষে আমেরিকার ভোক্তাদের কাছে পোশাকের দাম বাড়িয়ে দেবে।
যদিও বাংলাদেশের বেশিরভাগ রপ্তানিকরক এফওবি (FOB) ভিত্তিতে পোশাক রপ্তানি করে। অর্থাৎ পোশাক উৎপাদন করে জাহাজ পর্যন্ত পৌছে দেয়া পর্যন্ত খরচ উৎপাদনকারীর। জাহাজের ভাড়া থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য খালাসের জন্য ডিউটি এন্ড ট্যাক্স এর খরচ আমদানিকারক বহন করে। এই অতিরিক্ত শুল্ক তাই যুক্তরাষ্ট্রের আমদানিকারককেই বহন করতে হবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, যা তাদের আমদানি পণ্যের খরচ বৃদ্ধি করবে এবং লাভ কে সংকুচিত করবে।
দ্বিতীয়ত, এই পারস্পরিক শুল্ক (reciprocal tariffs) রপ্তানিকারক দেশগুলোর উপরও প্রভাব ফেলবে। বাংলাদেশ, যেমন, তার পোশাক রপ্তানির উপর অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতার কারণে এই শুল্কের ফলে বড় ধাক্কা খাবে। যদি বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমে যায়, তবে তারা আমেরিকা বাজারে কম পণ্য সরবরাহ করবে, যা আমেরিকার পোশাক সরবরাহ শৃঙ্খলায় ব্যাঘাত সৃষ্টি করবে। ফলে, আমেরিকার পোশাক বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ার ফলে দাম আরও বাড়তে পারে, যা মাঝারি এবং নিম্ন আয়ের ভোক্তাদের জন্য চাপ সৃষ্টি করবে।
তৃতীয়ত, এই শুল্ক আমেরিকার নিজের পোশাক উৎপাদন শিল্পকে প্রভাবিত করবে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্থানীয় পোশাক উৎপাদন তুলনামূলকভাবে কম, কারণ আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে তারা সস্তা পণ্য পেয়ে থাকে। যদি আউটসোর্সিংয়ের খরচ বৃদ্ধি পায়, তবে কিছু কোম্পানি স্থানীয় উৎপাদন বাড়াতে চেষ্টা করতে পারে, কিন্তু এটি আরও ব্যয়বহুল হবে এবং সময় লাগবে। ফলে, শর্ট টার্মে আমেরিকার পোশাক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহের সমস্যা দেখা দেবে।
চতুর্থত, ভোক্তা আচরণে পরিবর্তন আসতে পারে। যদি পোশাকের দাম বাড়ে, তবে আমেরিকার ভোক্তারা কম পোশাক কিনতে বাধ্য হবে অথবা সস্তা বিকল্প খুঁজবে, যেমন ব্যবহৃত পোশাক বা চিলি, নিকারাগুয়া থেকে আমদানি করা সস্তা পণ্য, যার মান বাংলাদেশ বা চীনের থেকে তুলনামূলক ভাবে অনেক কম হবে।
অবশেষে, এই নতুন শুল্কের ফলে আমেরিকার পোশাক বাজারে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়তে পারে। কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন যে এটি স্থানীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে পারে, অথবা পোশাক বাজারজাত করা ব্র্যান্ডগুলোকে বিকল্প দেশ খুজতে হবে কম মূল্যে উতপাদনের জন্য, যা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।
কিন্তু শুরুতে খরচ বৃদ্ধি এবং ভোক্তাদের কাছে দাম বাড়ার ফলে পোশাক কোম্পানিগুলোর লাভ কমে যাবে। এছাড়া, রপ্তানিকারক দেশগুলোর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ার ফলে তাদের উৎপাদন ক্ষমতা কমে যেতে পারে, যা আমেরিকার পোশাক সরবরাহ শৃঙ্খলায় আরও জটিলতা সৃষ্টি করবে।
সংক্ষেপে, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক পদ্ধতি আমেরিকার পোশাক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহের সমস্যা এবং ভোক্তা আচরণে পরিবর্তন আনবে। যদিও উদ্দেশ্য হতে পারে আউটসোর্সিংয়ের উপর নির্ভরশীলতা কমানো, তবে শর্ট টার্মে এটি আমেরিকার নিজের অর্থনীতি এবং ভোক্তাদের উপর নেগেটিভ প্রভাব ফেলবে। দীর্ঘমেয়াদে, এই পদ্ধতি কীভাবে কাজ করে, তা নির্ভর করবে রপ্তানিকারক দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া এবং আমেরিকার নীতি পরিবর্তনের উপর।
