নেপালে রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি, রাজনৈতিক অস্থিরতার নতুন মোড়

নেপালে রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি, রাজনৈতিক অস্থিরতার নতুন মোড়
শেয়ার করুন
আন্তর্জাতিক

নেপালের রাজপথে বুধবার উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে, যখন হাজারো মানুষ রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে বিক্ষোভে অংশ নেন। ২০০৮ সালে রাজতন্ত্র বিলুপ্তির ১৭ বছর পর, ক্রমবর্ধমান দুর্নীতি, অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে জনগণের হতাশা রাজতন্ত্রপন্থী আন্দোলনকে নতুন করে উজ্জীবিত করেছে।

রোববার, কাঠমান্ডুর রাস্তায় ১০,০০০-এর বেশি মানুষ সাবেক রাজা জ্ঞানেন্দ্র শাহের ছবি হাতে মিছিল করেন এবং তার প্রত্যাবর্তনের দাবি জানান। আন্দোলনের আয়োজক রাষ্ট্রীয় প্রজাতন্ত্র পার্টি ও অন্যান্য রাজতন্ত্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোর মতে, রাজতন্ত্র পুনর্বহালই নেপালের স্থিতিশীলতার একমাত্র পথ।

এক বিক্ষোভকারী সুনীতা থাপা বলেন, “গণতন্ত্র আমাদের আশানুরূপ ফল দেয়নি। দুর্নীতি, বেকারত্ব ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি আমাদের কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।”

২০০৮ সালে এক দশকের মাওবাদী বিদ্রোহ, যেখানে ১৬,০০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটে, তার পরিণতিতে নেপালের ২৩৯ বছরের রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে এবং দেশটি ফেডারেল গণতন্ত্রে রূপান্তরিত হয়। কিন্তু গণতন্ত্রের প্রতিশ্রুত উন্নয়ন আজও বাস্তবায়িত হয়নি। একের পর এক সরকার পরিবর্তনের পরও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসেনি।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি, যিনি ২০২৪ সাল থেকে ক্ষমতায় আছেন, তাকে উন্নয়ন প্রকল্পের স্থবিরতা ও দুর্নীতির অভিযোগের মুখোমুখি হতে হচ্ছে, যা রাজতন্ত্রপন্থীদের আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করছে।

সাবেক রাজা জ্ঞানেন্দ্র শাহ, বর্তমানে ৭৭ বছর বয়সী, এই আন্দোলন নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে তাকে মাঝে মাঝে জনসাধারণের সামনে উপস্থিত হয়ে সমর্থকদের প্রতি হাত নাড়তে দেখা গেছে, যা তার প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন আলোচনা সৃষ্টি করেছে। ২০২০ সালের অনুরূপ আন্দোলনে তার নীরব সমর্থন ছিল, যা অনেকের কাছে তার রাজনীতিতে ফিরে আসার ইঙ্গিত হিসেবে ধরা হচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক বিমলা রাই পৌদেল বলেন, “এই আন্দোলন রাজনৈতিক অব্যবস্থাপনার প্রতি জনগণের হতাশার বহিঃপ্রকাশ, তবে রাজতন্ত্র পুরোপুরি ফিরে আসবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।”

সরকারের পক্ষ থেকে এই আন্দোলনকে গুরুত্বহীন বলে অভিহিত করা হয়েছে। বুধবার, সরকারের মুখপাত্র প্রদীপ গ্যাওয়ালি বলেন, “এটি কিছু মানুষের অবাস্তব আকাঙ্ক্ষা মাত্র।” তবে রাজতন্ত্রপন্থীদের বিক্ষোভ কাঠমান্ডু ছাড়িয়ে পূর্ব নেপালেও ছড়িয়ে পড়ছে, যেখানে প্রধানমন্ত্রী ওলির নিজস্ব রাজনৈতিক ঘাঁটিও রয়েছে।

নেপাল বর্তমানে প্রাকৃতিক দুর্যোগের চাপে রয়েছে। সম্প্রতি কাঠমান্ডুর কাছে ৬.১ মাত্রার ভূমিকম্প এবং বাগলুং ও মিয়াগদি অঞ্চলে পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সরকার ত্রাণ ও পুনর্গঠনের চাপে রয়েছে, যা জনসাধারণের অসন্তোষকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।

আন্তর্জাতিকভাবে, ভারত এই পরিস্থিতির ওপর গভীর নজর রাখছে। নেপালকে ভারত ও চীনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক সেতুবন্ধ হিসেবে দেখা হয়। ইতিমধ্যেই চীন নেপালের অবকাঠামো প্রকল্পে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে, যা এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

এই মুহূর্তে, নেপালের রাজনীতিতে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ দেখা দিচ্ছে। রাজপথে আবারও রাজতন্ত্রের পতাকা উড়ছে, যা দেশটির রাজনৈতিক গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে।

Visited 40 times, 1 visit(s) today